১৩ মে ২০২৬, বুধবার, ০৭:৪৩:০৭ অপরাহ্ন


জ্বালানি রূপান্তরে বাংলাদেশের পরিকল্পনা আর নীতি অপ্রতুল
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৩-০৫-২০২৬
জ্বালানি রূপান্তরে বাংলাদেশের পরিকল্পনা আর নীতি অপ্রতুল প্রতীকী ছবি


ভূরাজনৈতিক সংকটে টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতি। জ্বালানি সংকট দুর্ভিক্ষের রূপ নিয়েছে। উন্নত, উন্নয়নশীল সব ধরনের দেশ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এমনকি খাদ্য সংকট চোখ রাঙাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি সামাল দেওয়া দুরূহ হয়ে পড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা বিএনপি জোট সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষত দ্রুত আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা পড়েছে মূল সংকটে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কিন্তু ফসিল ফুয়েল, তথা আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এবং পূর্ববর্তী সরকারগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভরতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েও অর্জন করেছে সামান্য নীতি সহায়তা আর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লাগসই কৌশলের অভাবে।

সেই যে কোবিড সংক্রমণ আর রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি সংকটের শুরু তখন থেকেই কিন্তু স্পষ্ট হয়েছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার সম্প্রসারণ করে জ্বালানি স্বাধীনতা অর্জন ছাড়া বিকল্প নেই। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের ফসিল ফুয়েল ভান্ডার সীমিত। নির্ভর করতে আমদানির ওপর। আর আমদানি বাজার নানা কারণে সংক্ষুব্ধ হয়ে জ্বালানি মূল্য আকাশ ছোঁয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জ্বালানি সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হয়, ঠিক যেমন এখন হয়েছে। বাংলাদেশ কিন্তু জ্বালানি পরিকল্পনায় দূরদর্শিতার অভাবে নিজেদের প্রাথমিক জ্বালানি মাটির নিচে রেখে ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত আমদানির দিকে হেঁটে এখন পড়েছে চতুর্মুখী সংকটে।

রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি ধাক্কার ফলে দেশে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে পৌঁছায় এবং তা এখনো স্থায়ী হয়ে আছে অর্থনীতিতে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমে যায় এবং দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটে। এসব সতর্কসংকেত সত্ত্বেও সরকার আমদানি করা জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে পারেনি।

যদি বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করতে পারত, যেমন পাকিস্তান ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৪৬ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ নিশ্চিত করতে পেরেছে, তাহলে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরো সক্ষম অবস্থানে থাকতে পারতো। কিন্তু বাস্তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে সরকারের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

আমেরিকা ও ইরানের চলমান উত্তেজনা এরই মধ্যেই মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন কমে যাচ্ছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। দেশজুড়ে লোডশেডিং বেড়েছে এবং আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ভর্তুকি বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরো কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশীয় মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্নতর। মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জ্বালানি বিদ্যুৎ চাহিদা থাকে তুঙ্গে। উষ্ণতা আর্দ্রতা যখন ঊর্ধ্বসীমায় পৌঁছে, তখন বিদ্যুৎ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। উৎপাদন ক্ষমতা কাগজকলমে ২৯ হাজার মেগাওয়াট থাকলেও জ্বালানির অভাব, সঞ্চালন বিপণন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বর্জ্যরে ১৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব হয়। অনেক কথা বলা বা উচ্চ আশার পরও নবায়নযোগ্য খাত থেকে ৪ শতাংশের বেশি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বলতে মূলত সৌরবিদ্যুৎ আর সীমিত পরিমাণ বায়ু বিদ্যুৎ। সরকারের আছে সাস্টেইনেবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (স্রেডা) আছে অর্থায়নের জন্য ইডকল। সরকার রিনিউঅ্যাবল পলিসি করেছে, নেট মিটারিং চালু করেছে। কিন্তু তার পরেও অর্জন সীমিত কেন সেটি কিন্তু নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান করে লাগসই কৌশল গ্রহণের অপরিহার্যতা সবাই অনুভব করছে।

এদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে প্রথম বাধা হলো সরকারের নীতিনির্ধারকদের মানসিকতার অভাব। ফসিল ফুয়েল সিন্ডেকেট নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাপনার আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ আছে। এদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে প্রধান বাধাগুলো হলো যন্ত্রপাতি আমদানিকৃত সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ইত্যাদির ওপর অত্যধিক আমদানি শুল্ক-কর, উদ্যোক্তাদের জন্য সুলভ অর্থায়ন, সঠিক ট্যারিফ নিশ্চিত করুন আর বিপিডিবি সিঙ্গেল বায়ার মডেল। সব উৎপাদিত বিদ্যুৎ কেন গ্রিডে সরবরাহ করতে হবে? কেন বাংলাদেশ লোড সেন্টারগুলোতে ডিস্ট্রিবিউটেড জেনারেশন পদ্ধতিকে প্রণোদনা দিচ্ছে না? একসময় সোলার হোম সিস্টেমে বাংলাদেশ পথিকৃৎ ছিল। ভুল কৌশলে সেটির অপমৃত্যু ঘটানো হয়েছে। সোলার মিনি গ্রিড, মাইক্রো গ্রিড সম্প্রসারিত হয়নি। 

বাংলাদেশে গ্রিড সংযুক্ত ইউটিলিটি স্কেল সোলার প্লান্টের জন্য ভূমির অপ্রতুলতা বিষয়টি সমর্থনযোগ্য না। প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি বা দুটি জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে যেখানে সোলার পার্ক স্থাপন করে উপজেলার বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব। বিস্তীর্ণ চর অঞ্চলেও এ সুবিধা স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এ স্থানগুলোতে যুগপৎভাবে বায়ু বিদ্যুৎ সহ হাইব্রিড ব্যাবস্থাও চালু হতে পারে।

আর প্রয়োজন স্রেডাকে শক্তিশালী করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চ্যাম্পিয়ন সংস্থা হিসাবে গড়ে তোলা। স্রেডাকে সিঙ্গেল পয়েন্ট কন্টাক্টে পরিণত করতে হবে। স্রেডা রেগুলেটরি সংস্থা হিসাবে সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোকে নীতি সহায়তা দিবে, ম্যান নিয়ন্ত্রণ করবে, গবেষণায় সহায়তা করবে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রাদান নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে যথাযথ প্রণোদনা দিতে হবে যেন উদ্যোক্তারা দেশেই সোলার প্যানেল, ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য কারখানা গড়ে তোলে। বাস্তবতার কারণেই শিল্প উদ্যোক্তারা কিন্তু রুফ টপ সোলারে ঝুঁকে পড়েছে। অস্তিত্বের জন্য এটি এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনে আশাও কিন্তু উৎসাহব্যাঞ্জক বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে।

আমি মনে করি সরকারের মাইন্ড সেট পরিবর্তন হলে এবং উপরের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হলে ২০৩০ নাগাদ নাগাদ ১০ হাজার মেগাওয়াট আর ২০৪০ নাগাদ ২০ হাজার মেগাওয়াট ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য খাত এবং ক্লিন এনার্জি থেকে সরবরাহ করা সম্ভব। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের বাস্তবতায় সেখানেই মুক্তির পথ।

শেয়ার করুন