বোর্ড সভায় কারিকুলাম সংশোধন প্রস্তাব নিয়ে জনমত শুনছেন টেক্সাস স্টেট বোর্ড অব এডুকেশনের চেয়ার অ্যারন কিনসি
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস স্টেটে স্কুল পর্যায়ের সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রাথমিক খসড়া অনুমোদনকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কিত বিতর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও প্রোটিনেড শুরু হয়েছে। নতুন এই পরিবর্তন ঘিরে ইসলাম ধর্ম, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক আমেরিকানদের ইতিহাস কীভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা হবে, তা নিয়ে রাজ্যের স্টেট বোর্ড অব এডুকেশনের মধ্যে গভীর বিভাজন দেখা গেছে। গত ১০ এপ্রিল টেক্সাস স্টেট বোর্ড অব এডুকেশন দীর্ঘ আলোচনার পর নতুন সামাজিক বিজ্ঞান মানদণ্ডের প্রাথমিক খসড়া অনুমোদন করে। রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন, অন্যদিকে বোর্ডের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে এর বিরোধিতা করেন। ৯ এপ্রিল শুরু হওয়া এই বৈঠক রাতভর চলতে থাকে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল ইসলামের ইতিহাস ও মুসলিম সভ্যতার অবদান পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সংশোধন। প্রাথমিক খসড়ায় মুসলিমদের গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানে অবদান শেখানোর বিষয় ছিল, যা পরবর্তী সময়ে বাদ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। কিছু রিপাবলিকান সদস্য শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কিত আরো বিস্তারিত ও বিতর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন। তবে এ প্রস্তাব মুসলিম সংগঠন ও নাগরিক অধিকার কর্মীদের তীব্র আপত্তির মুখে পড়ে। তারা বলেন, এ ধরনের উপস্থাপন ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ভুল ব্যাখ্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক আমেরিকানদের ইতিহাস নিয়েও বিতর্ক হয়। ডেমোক্র্যাট সদস্যরা পাঠ্যক্রমে এসব জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও অবদান আরো বিস্তৃতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। তবে রিপাবলিকান সদস্যরা কিছু অংশ সীমিত করার পক্ষে অবস্থান নেন। বৈঠকে ব্ল্যাক পাওয়ার আন্দোলন নিয়েও পরিবর্তন আনা হয়। প্রাথমিক প্রস্তাবে আন্দোলনের রাজনৈতিক দিক কমিয়ে শুধু সংস্কৃতি, শিল্প ও ফ্যাশনের উপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের জন্য আত্মসম্মান, আত্মনির্ভরতা এবং সাংস্কৃতিক গৌরব শেখানোর বিষয় যুক্ত করা হয়।
ডেমোক্র্যাট সদস্য টিফানি ক্লার্ক অভিযোগ করেন, নতুন প্রস্তাবে বারবার কৃষ্ণাঙ্গ ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ইতিহাসকে সীমিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে রিপাবলিকান সদস্য ব্র্যান্ডন হল বলেন, পাঠ্যক্রমকে রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে দূরে রাখা উচিত এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরপেক্ষ শিক্ষা নিশ্চিত করা দরকার। এদিকে পাঠ্যক্রম তৈরির প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ও বাইরের সংগঠনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু কনজারভেটিভ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান শিক্ষাক্রম নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করছে, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম।
মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনসের প্রতিনিধিদের শুনানিতে অংশগ্রহণ নিয়েও উত্তেজনা তৈরি হয়। কিছু রিপাবলিকান সদস্য স্টেট গভর্নরের আগের সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে সংগঠনটির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তবে সংগঠনটি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং এটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অংশ।সংগঠনটির প্রতিনিধি ও মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা দাবি করেন, ইসলাম সম্পর্কে পাঠ্যক্রমে সঠিক, নিরপেক্ষ ও শিক্ষাবান্ধব তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তাদের মতে, ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট উপস্থাপন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও বিভাজন তৈরি করতে পারে।
বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত টেক্সাসের সামাজিক বিজ্ঞান শিক্ষার ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করবে, যা ২০৩০-৩১ শিক্ষাবর্ষ থেকে স্টেটের স্কুলগুলোতে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এই বিতর্ক শুধু পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ম, ইতিহাস ও পরিচয় রাজনীতি নিয়ে চলমান বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সংঘাতেরই প্রতিফলন। তারা বলছেন, ভবিষ্যতে এই ইস্যু আরো রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।