১৭ এপ্রিল ২০২৬, শুক্রবার, ০৪:১০:০৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
টাইম ম্যাগাজিনে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খালেদা জিয়া সহ দেশের ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ পদক প্রদান যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল নিয়ে জনমত বদলাচ্ছে টেক্সাসে পাঠ্যক্রমে ইসলাম ও সংখ্যালঘু ইতিহাস পরিবর্তন ঘিরে তীব্র বিতর্ক ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস : চার মিলিয়নের বেশি শিশু নিবন্ধিত নিউ ইয়র্কে ২-কে চাইল্ড কেয়ার হবে পূর্ণ দিবস ও বছরব্যাপী ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের ডিপোর্টেশন ঠেকানোর রায় দেওয়ায় দুই অভিবাসন বিচারককে বরখাস্তের অভিযোগ ইমিগ্রেশন আপিল বোর্ডে মাহমুদ খলিলের আপিল খারিজ লংআইল্যান্ডে মসজিদ সম্প্রসারণে প্রশাসনিক বাধা নাটক-সিনেমা দেখে কি বার্তা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী?


খালেদা-তারেককে গ্রেফতারে ২ সম্পাদকের চাপ
ওয়ান-ইলেভেনের ষড়যন্ত্রকারী ওরা ১১
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৫-০৪-২০২৬
ওয়ান-ইলেভেনের ষড়যন্ত্রকারী ওরা ১১ মাসুদ উদ্দিন ও মামুন খালেদ


ভয়ানক সব তথ্য বেড়িয়ে আসছে। আলোচিত ওয়ান-ইলেভেন চক্রান্ত বিশেষ কারণে প্রকাশ পায়নি এ দীর্ঘদিন। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই থলের সেই কালো বিড়াল বের হয়ে আসছে এক এক করে। মুখোশের আড়ালে যে ভয়ংকর সব চিত্র সেটা প্রকাশ পাচ্ছে ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ ও সাবেক জেনারেল মাসুদ উদ্দিনের জবানবন্দিতে। এতদিন সুশীলসমাজের যারা ছিলেন আয়না। সেটা যে ছিল শুধু তাদের মুখোশ, সে খোলস উন্মোচিত হচ্ছে এক এক করে। ওয়ান-ইলেভেনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জিয়া পরিবার। স্বাভাবিকভাবেই দেশের প্রধানমন্ত্রীর শপথ পড়ে আড়ালে পড়ে থাকা সেই ওয়ান-ইলেভেনের রূপ উন্মোচিত করার কাজে হাত দিয়েছেন আরো অনেক কিছুর সঙ্গে। দেশের মানুষ এখন জানতে পারছে, সে সময় কী কী হয়েছিল। কে বা কারা ছিল এসবের রূপকার এবং ওই মহানাটক মঞ্চস্থ করার রূপকার কে কে? যেটুকু এ পর্যন্ত বের হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের চোখ কপালে ওঠার অবস্থা। ব্রিগেডিয়ার (অব.) শাখাওয়াত হোসেন, বদিউজ্জামানসহ দুই শীর্ষ পত্রিকার সম্পাদককে মানুষ এ প্রকাশিত ঘটনার আগেও সমাজের দর্পণ ভাবতেন। 

আজ এক এক করে মুখোশ খুলে যাচ্ছে এসব ভয়ংকর মানুষের। সম্প্রতি বাংলাদেশের মিডিয়ায় প্রকাশিত এক খবরে দেখা গেছে ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ দুজন সম্পাদকসহ ১/১১-এর ১১ জন ষড়যন্ত্রকারীর নাম প্রকাশ করেছেন। টানা ১৫ দিন রিমান্ডের পর গত ৯ এপ্রিল তাকে আবারও তিনদিনের রিমান্ডে আনা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে মামুন খালেদ এক-এগারোর ষড়যন্ত্র, এর মূল পরিকল্পনাকারী ও লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিচ্ছেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মামুনের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করছেন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মামুন খালেদ এক-এগারোর সময় ক্ষমতাবান এগারোজনের নাম বলেছেন।

সাবেক এ সেনা কর্মকর্তা দাবি করেন, তিনি এক-এগারোর ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন না, ছিলেন একজন বাস্তবায়নকারী। তিনি সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ডের কথা উল্লেখ করে বলেন, ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার কমান্ড মান্য করার কোনো বিকল্প নেই সেনাবাহিনীতে। মামুন দাবি করেন, তাকে ডিজিএফআইয়ে বদলি করা হয় এক-এগারোর মাঝামাঝি সময়ে। প্রথমে তিনি সেখানে পরিচালক মিডিয়া হিসেবে যোগদান করেন। পরে ফখরুদ্দীন সরকার যখন নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করে, তখন তাকে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। মামুন খালেদ বলেন, ফখরুদ্দীন সরকারে প্রধান উপদেষ্টাসহ বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা ছিলেন নামমাত্র। তারা পুতুল ছিলেন। তিনি দাবি করেন, মিডিয়া পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদের নেতৃত্বে একটি কোর গ্রুপ এক-এগারোর সরকার পরিচালনা করতো। মঈন সেনাসদরে তাদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈঠক করতেন বলেও দাবি করেন মামুন। তার মতে, সরকার কীভাবে চলবে, কাকে গ্রেফতার করা হবে, কার বিরুদ্ধে নিউজ করা হবে ইত্যাদি খুঁটিনাটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো এ বৈঠকে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। 

এ কোর কমিটিতে কারা ছিলেন-গোয়েন্দাদের এমন প্রশ্নের উত্তরে মামুন যাদের নাম উল্লেখ করেন তারা হলেন জেনারেল মঈন উ আহমেদ, জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার বারী, ব্রিগেডিয়ার আমিন, দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী, তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন, তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, সুজনের নির্বাহী পরিচালক বদিউল আলম মজুমদার, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের প্রেস সচিব ফাহিম মুনায়েম (২০১৬ সালে মৃত)। 

উল্লেখ্য, ফাহিম মুনায়েম প্রেস সচিব হওয়ার আগে ডেইলি স্টারের ম্যানেজিং এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মামুন জানান, কোন রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে কখন কী লেখা হবে, তা ঠিক করে দিতেন প্রয়াত ফাহিম।

মামুন জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, ওই বৈঠকগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে তার ধারণা হয়েছে, এক-এগারোর পুরো পরিকল্পনা কোর কমিটির দুই সম্পাদকের তৈরি। কীভাবে তার এ ধারণা হলো-এমন প্রশ্নের জবাবে মামুন গোয়েন্দাদের বলেন, তিনি যে কটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, তার সবকটিই মঈন প্রথমেই এ দুই সম্পাদককে বলতেন, আপনারা বলুন আমাদের করণীয় কী। এমন একটি বৈঠকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মামুন বলেন, তারেক রহমান এবং দুই নেত্রীকে গ্রেফতারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন বাংলা দৈনিকের সম্পাদক। তার সঙ্গে সম্মতি জানিয়েছিলেন ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক। মামুন দাবি করেন, কোর কমিটির অধিকাংশ সদস্যই এ গ্রেফতারের বিরোধিতা করেছিলেন। অনেকেই বলেছিলেন, এ তিনজনকে গ্রেফতার করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। কিন্তু মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম তাদের গ্রেফতারের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। তারা দুজনই দাবি করেন, এ তিনজনকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে না পারলে, বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়। মামুন দাবি করেন, ওই বৈঠকে দুই নেত্রী এবং তারেক রহমানকে গ্রেফতারের আগে জনমত তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। জনমত তৈরির জন্য দুই সম্পাদক এবং তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের প্রেস সচিব দায়িত্ব নেন। এরপরই প্রথম আলোর সম্পাদক তার নিজের নামে প্রথম পাতায় ‘দুই নেত্রীকে সরে যেতে হবে’ শিরোনামে মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেন।

মামুন দাবি করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির পরিকল্পনাও দুই সম্পাদকের। তার মতে, বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে মতিউর রহমানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। দুজনই বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেই সুবাদে মান্নান ভূঁইয়াকে সংস্কারের পক্ষে রাজি করাতে ভূমিকা রাখেন মতিউর রহমান। এক-এগারোর পরপরই প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার বিএনপিতে খালেদা জিয়ার বিরোধীদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে তাদের লাইমলাইটে আনার চেষ্টা করেন। মামুনের মতে, আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর সঙ্গেও মঈনের যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন মতিউর রহমান। সে সময় তারাও সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

মামুন দাবি করেন, ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এ দুই সম্পাদক। তার মতে, মঈন সে সময় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন না নেওয়ার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এই দুই সম্পাদক শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করে মিটিংয়ে আসতেন। দুই সম্পাদকই সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের তালিকা তৈরি করেছিলেন বলে মামুন জানিয়েছেন। মামুন বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক্সিট প্ল্যান নিয়ে মঈনের সঙ্গে বারী ও আমিনের বিরোধ হয়। 

খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে গ্রেফতারের চাপ দেন দুই সম্পাদক

এক-এগারোর অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী মুখ খুলেছেন। গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এক-এগারোতে তার ভূমিকা, তার সঙ্গে তৎকালীন সেনাপ্রধানের মতবিরোধ এবং এক্সিট প্ল্যান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। একাধিক গোয়েন্দা সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেছেন, সেনাবাহিনী খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে গ্রেফতারের পক্ষে ছিল না। কিন্তু সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিশেষ করে, দুই সম্পাদক তাদের গ্রেফতারের জন্য রীতিমতো চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমঝোতার ভিত্তিতে।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এ সমঝোতার কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তাকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে বহাল রাখে। ব্রিগেডিয়ার বারী এবং আমিনকে বিদেশে যেতে দেওয়া হয়, সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল মঈনকে বহাল রাখা হয়। উল্লেখ্য, গত ২৩ মার্চ রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসা থেকে মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ২৪ মার্চ পল্টন মডেল থানার মামলায় তার পাঁচদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয় আদালত। পরবর্তী সময়ে গত ২৯ মার্চ দ্বিতীয় দফায় তার ফের ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

গত ৪ এপ্রিল তৃতীয় দফায় আরো তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। সবশেষ গত ৭ এপ্রিল পল্টন মডেল থানার মামলায় তিন দফায় ১৪ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। ওইদিন দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে চারদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

গত ১১ এপ্রিল এক-এগারোর আলোচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ফের চারদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাকে মূলত ২০০৭ সালের এক-এগারোর ষড়যন্ত্র নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

সেনাপ্রধান হতে না পারার ক্ষোভ থেকেই বিএনপি বিরোধী অবস্থান 

প্রায় তিন সপ্তাহের জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং এক-এগারোর ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ এস্কান্দার, মঈন উ আহমেদ এবং তিনি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে একসঙ্গে কমিশন করেন। এটা ছিল বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম ব্যাচ। কমিশনের পর তিনি (জেনারেল মাসুদ) কিছুদিন রক্ষীবাহিনীতে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছিল। অনেক সেনাসদস্যকে রক্ষীবাহিনীতে সংযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটাই তার পেশাগত জীবনে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়ায় বলে দাবি করেন জেনারেল মাসুদ। তিনি বলেন, ২০০৫ সালের মে মাসে নতুন সেনাপ্রধান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তিনি বলেন, সেনাপ্রধান হওয়ার জন্য আমিই ছিলাম সবচেয়ে যোগ্য। কিন্তু বিএনপি সরকার তার বদলে সাতজনকে টপকে জেনারেল মঈন উ আহমেদকে সেনাপ্রধান করে। মাসুদ এটা মেনে নিতে পারেননি। এখান থেকেই তার মধ্যে বিএনপির প্রতি ক্ষোভ শুরু হয়। মাসুদ সুযোগ খুঁজতে থাকেন।

একটি টেলিফোন পাল্টে দেয় সবকিছু 

মাসুদ উদ্দিন বলেন, ২০০৬ সালের শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। তখন তিনি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশন অর্থাৎ নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি। নানা কারণেই এ ডিভিশনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ ডিভিশনকে বলা হয়, সেনাবাহিনীর অন্যতম স্তম্ভ। মাসুদ বলেন, এ সময়ে তিনি একজন সম্মানিত সম্পাদকের ফোন পান। ইংরেজি দৈনিকের এ সম্পাদক তার সঙ্গে একান্তে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মাসুদ বলেন, সাভার সেনানিবাসে তাকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি রাজি হননি। তিনি আমাকে গুলশানের একটি বাসায় নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। আমি তার প্রস্তাব গ্রহণ করি। মাসুদ বলেন, ২০০৬-এর অক্টোবরে গুলশানে একজন শিল্পপতির বাসায় আমি সস্ত্রীক যাই। ওই শিল্পপতি দুটি প্রভাবশালী সংবাদপত্রের মালিক। সেখানে আমি আরো কয়েকজন সুশীলসমাজের প্রতিনিধির সঙ্গে পরিচিত হই। তাদের মধ্যে বাংলা দৈনিকের সম্পাদক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, লেখক এবং বুদ্ধিজীবী ছিলেন। সেখানে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। নৈশভোজের ফাঁকে দুই সম্পাদক এবং একজন স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী আমার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় অংশ নেন। মাসুদ দাবি করেন, এ আলোচনায় রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। জেনারেল মাসুদ গোয়েন্দাদের কাছে দাবি করেছেন, আমি তিনজনকেই বলি সেনাবাহিনী চলে চেইন অব কমান্ডে, তাই এ বিষয়ে সেনাপ্রধানের সঙ্গে তাদের আলোচনা করা উচিত। তারা মাসুদকে জানান, সেনাপ্রধানের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। তিনি আপনার ভূমিকা নিয়ে নিশ্চিত নন। মাসুদ বলেন, এ সময় আমি বলি সেনাপ্রধান সেনাবাহিনী এবং দেশের স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নেবে আমি তা পালন করবো।

সেনাপ্রধানের ফোন 

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ওই নৈশভোজের একদিন পরই সেনাপ্রধান আমাকে ফোন করেন এবং জরুরি বৈঠকের জন্য সেনাসদরে আসতে বলেন। মাসুদ বলেন, মঈন তার ভালো বন্ধু হলেও সেনাপ্রধান হওয়ার পর তার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে সেনা সদরের বৈঠকে তাদের দূরত্ব কমে যায়। ওই বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। মঈন তাকে জানান যে, আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করবে না। মাসুদ এ তথ্য বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেন, ২২ জানুয়ারির নির্বাচন যদি আওয়ামী লীগ বর্জন করে তাহলে সেনাপ্রধান যে সিদ্ধান্ত নেবে তা আমি মেনে নেবো। মাসুদ বলেন, এরপর দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। রিমান্ডে তিনি বলেন, ৮ জানুয়ারি সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে আমরা ইয়াজউদ্দিনের সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করি। মাসুদ দাবি করেন, সেনাবাহিনীতে তিনি সেনাপ্রধানের চেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন। এজন্য এক-এগারোর সময় তাকে সামনে রেখে মঈন সবকিছু করেছিলেন।

সুশীলদের চাপে খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত 

রিমান্ডে মাসুদ উদ্দিন দাবি করেন যে, তিনি নিজে বা সেনাবাহিনী বেগম জিয়ার পরিবারকে গ্রেফতার করার পক্ষে ছিলেন না। কোর কমান্ডের বৈঠকে তাদের গৃহবন্দি অথবা বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা বিশেষ করে, দুই সম্পাদক তাদের গ্রেফতারের জন্য রীতিমতো চাপ সৃষ্টি করে। মাসুদ দাবি করেন, আমি তাদের বলেছিলাম, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তাকে আপামর সেনাসদস্যরা শ্রদ্ধা করে। জিয়া পরিবারকে গ্রেফতার করা হলে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু সুশীলসমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়, দুই নেত্রীকে না সরালে দেশে রাজনৈতিক সংস্কার অসম্ভব। মাসুদ বলেন, আমি তখন দুই সম্পাদকে এ বিষয়ে জনমত তৈরি করতে বলেছিলাম। এরপর দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে দুটি সংবাদপত্র একাধিক সংবাদ প্রকাশ করে।

মঈনের সঙ্গে আবার বিরোধ 

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ দাবি করেছেন, রাজনৈতিক দল গঠন নিয়ে সেনাপ্রধানের সঙ্গে তার মতবিরোধ দেখা দেয়। এক-এগারোর মাঝামাঝি সময়ে মঈন এরশাদের মতো রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতা দখল করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। এজন্য তিনি ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর নেতৃত্বে একটি কিংস পার্টি গঠন করেন। মাসুদ গোয়েন্দাদের বলেছেন, কখনোই আমি রাজনৈতিক দল গঠনের পক্ষে ছিলাম না। এর পরই তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন বলে জানান।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা 

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন দাবি করেছেন, ২০০৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনি এক-এগারোর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তারপর তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন। এরপর তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পান।

শেয়ার করুন