২৬ মার্চ ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৪:৪৫:০৫ পূর্বাহ্ন


ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা ঘিরে উত্তাল জর্জিয়া
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাবিলা
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৫-০৩-২০২৬
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাবিলা দ্বিতীয়বারের মতো শপথ নিচ্ছেন জর্জিয়া স্টেট সিনেটর নাবিলা পার্কেস, সঙ্গে ছিলেন তার স্বামী ও শিশুপুত্র


যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের রাজনীতি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন এক বিতর্কে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রচারণায় একটি ইসলামবিদ্বেষী ভিডিওকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডেমোক্রে‍টিক রাজনীতিক, স্টেট সিনেটর নাবিলা পার্কস তার রিপাবলিকান সহকর্মী, সিনেটর গ্রেগ ডোলেজালের বিরুদ্ধে সরাসরি লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি শুধু নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তে থাকা ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক বক্তব্য ও সামাজিক উত্তেজনার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় ৩০ সেকেন্ডের একটি প্রচার ভিডিও থেকে, যা ডোলেজাল তার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে প্রার্থিতার অংশ হিসেবে প্রকাশ করেন। ভিডিওটিতে মুসলিমদের সহিংস ও ভীতিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়। ভিডিওর শেষাংশে জর্জিয়াকে শরিয়া আইনমুক্ত রাখো বার্তাটি দেখানো হয়, যেখানে শরিয়া বলতে ইসলামি আইনব্যবস্থাকে বোঝানো হয়েছে।

ভিডিওটির সঙ্গে যুক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টেও উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা হয়। সেখানে ইউরোপ ও আমেরিকাকে আক্রমণের শিকার হিসেবে দেখানো হয় এবং বলা হয়, অভিবাসীরা আমেরিকার উদারতাকে লুট করছে। অনেকের কাছে এটি কেবল রাজনৈতিক প্রচারণা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে ধরা হয়েছে।

নাবিলা পার্কেস জানান, তিনি ভিডিওটি প্রথম দেখেন জর্জিয়া স্টেট সিনেটের ভেতরে বসে। ভিডিওটি দেখার পর তিনি সরাসরি ডোলেজালের কাছে গিয়ে জবাবদিহি চান। তার ভাষায়, আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এটা কী?’ কিন্তু তিনি আমার দিকে তাকাননি, মাথা নিচু করে ছিলেন যেন লজ্জিত। পার্কেস আরো বলেন, ভিডিওটি এতটাই বিদ্বেষপূর্ণ ছিল যে পরদিন ডোলেজাল তার কাছে এসে বলেন, তুমি চাইলে আমাকেও আক্রমণ করতে পারো। এ ঘটনাই তাকে সরাসরি রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানানোর সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে।

ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যেই পার্কেস তার সিনেট পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নর নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই ধরনের ঘৃণা, ইসলামবিদ্বেষ এবং বর্ণবাদ রাজনীতিতে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি তিনি নির্বাচনে জয়ী হন, তবে তিনিই হবেন জর্জিয়ার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম লেফটেন্যান্ট গভর্নর, যা একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। ডেমোক্রে‍টিক দলে তার সঙ্গে আরো প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন জশ ম্যাকলরিন ও রিচার্ড রাইট। অন্যদিকে রিপাবলিকান দলে ডোলেজালসহ মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

তার পদত্যাগপত্রে পার্কেস জর্জিয়া সিনেটকে ভালো ধারণার মৃত্যুস্থান হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন আইনসভা এমন নীতি গ্রহণ করছে যা নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসী এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, এ আইনগুলো আমাদের অভিবাসী সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে তৈরি, তাদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে এবং এগুলো অত্যন্ত জেনোফোবিক। নাবিলা পার্কেসের মতে, সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই, যার ফলে একতরফাভাবে নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু রিপাবলিকান রাজনীতিকের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করেছে। যেমন, অ্যান্ডি ওগলস প্রকাশ্যে বলেছেন, মুসলিমদের আমেরিকান সমাজে থাকা উচিত নয়। একইভাবে টমি টাবারভিল সামাজিক মাধ্যমে ৯/১১ হামলার ছবি ব্যবহার করে মুসলিমদের ভেতরের শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর আগেও তিনি ইসলামকে ডেথ কাল্ট বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং মুসলিমদের দেশ থেকে বহিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এছাড়া টেক্সাসের কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা শরিয়ামুক্ত আমেরিকা ককাস গঠন করেছেন, যা নিয়ে সমালোচনা চলছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পরও ইসলামবিদ্বেষ দেখা গিয়েছিল, তবে তখনকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিল। সাবেক সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সেই সময়ে মুসলিমদের প্রতি সহনশীলতা ও সম্মানের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘মুসলিমরা আমাদের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা ডাক্তার, আইনজীবী, উদ্যোক্তা, পরিবারপ্রধান-তাদের সম্মান করা উচিত।’ বর্তমান পরিস্থিতিতে সে ধরনের ঐক্যের বার্তা তুলনামূলকভাবে কম শোনা যাচ্ছে।

কিছু রাজনীতিক দাবি করছেন, ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রে নতুন একটি ধর্ম। তবে গবেষকরা বলছেন, ইসলাম আমেরিকায় অনেক আগে থেকেই উপস্থিত ছিল, সম্ভবত দাসপ্রথার সময় থেকেই। ধারণা করা হয়, আফ্রিকা থেকে আনা দাসদের মধ্যে ১০ থেকে ৪০ শতাংশ মুসলিম ছিলেন। এ তথ্য ইসলামকে বিদেশি বা নতুন হুমকি হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা প্রশ্নবিদ্ধ করে।

নাবিলা পার্কেস, যিনি জর্জিয়ার মাত্র দুইজন মুসলিম সিনেটরের একজন এবং একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান, দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের পক্ষে কাজ করে আসছেন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যদি পুরো একটি সম্প্রদায়কে বলি দিতে হয়, তাহলে সেটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমি এ রাজ্যের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হতে চাই। তার মতে, জর্জিয়া একটি বৈচিত্র‍্যময় রাজ্য, যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষ মিলেই সমাজ গড়ে তুলেছে। পার্কেস বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মুসলিম শিক্ষার্থীদের নিয়ে। তার মতে, এখন অনেক মুসলিম ছাত্রছাত্রী স্কুলে হয়রানির শিকার হচ্ছে, তাদের সন্ত্রাসী বলা হচ্ছে এবং তারা ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তিনি বলেন, “শিশু অবস্থায় আমি এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি। কিন্তু এখন আমার আত্মীয়রা স্কুলে এসবের শিকার হচ্ছে, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

বিশেষ করে মুসলিম নারীরা, যারা হিজাব বা বোরকা পরেন, তারা সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। পার্কেস বলেন, তার নিজের পরিবারেও এমন সদস্য রয়েছেন, যাদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি অনুযায়ী, জর্জিয়ার জনসংখ্যা ক্রমশ বৈচিত্র‍্যময় হয়ে উঠছে। ২০১০ সালে যেখানে প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষ শ্বেতাঙ্গ ছিল, ২০২২ সালে তা কমে প্রায় ৫০ শতাংশে। এছাড়া ২০২৪ সালে প্রতি ৮ জনে একজন অভিবাসী। এ পরিবর্তন রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। পার্কেসের মতো প্রার্থীরা এ নতুন বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করছেন।

জর্জিয়ার এ নির্বাচনী লড়াই এখন শুধু দুই প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৃহত্তর একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে-যুক্তরাষ্ট্র কি বহুত্ববাদ ও সহনশীলতার পথে এগোবে, নাকি বিভাজন ও বিদ্বেষের রাজনীতি আরো শক্তিশালী হবে? নাবিলা পার্কেসের প্রার্থিতা সে প্রশ্নেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শেয়ার করুন