০৪ মার্চ ২০২৬, বুধবার, ০৪:৬:৫৪ অপরাহ্ন


অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যেসব কথা না বললেই নয়
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৪-০৩-২০২৬
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যেসব কথা না বললেই নয় জন্মদিনের অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যান্য উপদেষ্টারা


বাংলাদেশে ৮ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ডক্টর এম ইউনুস নেতৃত্বের অনির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। এই সময়ে অনেক কার্যক্রম নিয়েই সংবিধান লংঘনের অভিযোগ উঠছে যেগুলোর সমাধান আদালতে হওয়া প্রয়োজন। ছাত্র জনতার নিরীহ আন্দোলনকে গণ আন্দোলন অবহিত করে একটি মহল মেটিকুলাস পরিকল্পনায় শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিলেও আন্দোলনকে বিপ্লব বলা যাবে না। বা বিপ্লবী কোনো সরকারও গঠিত হয়নি। ফলে জরুরি আইন জারি, সামরিক শাসন বা বিপ্লবী সরকার কিছুই গঠিত হয় নি। দেশে প্রচলিত সংবিধানের আওতায় সুপ্রিম কোর্টের কথিত রেফারেন্স নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রপতির কাছে সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়। এই সরকার গঠন নিয়েও বিতর্ক আছে।

পালিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পদত্যাগ পত্র রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হয়নি। সেনাবাহিনী প্রধানের মৌখিক বক্তব্যকেই সঠিক ধরে নিয়ে রাষ্ট্রপতি উচ্চ আদালতের রেফারেন্সের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ করিয়েছেন। কথিত আছে ওই সময়ে সেনা হেফাজতে থাকা প্রধান বিচারপ্রতি এবং আপিলেট ডিভিশনের একজন জ্যৈষ্ঠ বিচারপতি রেফারেন্স দলিলে স্বাক্ষর করেননি। এমতাবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং প্রচলিত সংবিধানের অধীনে শপথ পুরোটা বিষয়েই গোড়ায় গলদ রয়েছে। বিদ্যমান সংবিধানে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা কেয়ার টেকার সরকারের কোন বিধান নেই। 

বলা হয় ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং একটি অবাধ নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের জন্য ন্যূনতম সংস্কার শেষে নির্বাচন অনুষ্ঠান করাই ছিলো অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ সরকারের প্রধান দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী বিদেশে, পার্লামেন্ট নেই, স্পিকার পদত্যাগ করেছেন, ডেপুটি স্পিকার কারাগারে। একমাত্র রাষ্ট্রপতি ছিলেন সংবিধান সম্মত প্রতিষ্ঠান। অনির্বাচিত সরকার পুরো সময়ে রাষ্ট্রপতিকে একরকম গৃহবন্ধী রেখে সকল কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখে। দেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল দারিত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন মহল দাবি দাওয়া নিয়ে যখন তখন সড়ক অবরোধ করে জন জীবন অতিষ্ঠ্য করে তোলে। সরকারি আদেশে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

আদালতে প্রমাণিত না হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ছাত্র লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকার সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও অনেক বিদেশী নাগরিককে দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন করে। তড়িঘড়ি করে আইসিটি আইন সংশোধন করে একজন বিতর্কিত ব্যাক্তিকে চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয়া হয়। বিগত সরকার আমলে ঘুষ, দুর্নীতি, অর্থপাচারের অনেক অভিযোগ থাকলেও তড়িঘড়ি করে বিতর্কিতভাবে মন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কয়েকজন মন্ত্রী, সেনা বাহিনী এবং পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তদের বিচার কাজ শেষ করে দন্ড প্রদান করা হয়। সরকার বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়ে সংবিধান বিরোধী জুলাই সনদ বিষয়ে কিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর জুলাই সনদ প্রণয়ন করে। এই সনদের অনেক কিছুই বিদ্যমান সংবিধানের সঙ্গে সংঘাত পূর্ণ হলেও সরকার নির্বাচনের দিনেই জুলাই সনদ বিষয়ে গণভোটের আয়োজন করে। উল্লেখ্য যে প্রচলিত সংবিধানে গণ ভোটের সংস্থান নেই।

অন্তর্বর্তী সরকার আমলে ১৩৩ টি অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়। সাধারণত নির্বাচিত সরকারের কার্যকালে সংসদ অধিবেশনের বিরতিতে জরুরি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অর্ডিন্যান্স জারির নজির আছে। এগুলো পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে পেশ করে অনুমোদন করাতে হয়। তবে এমন বিষয় যেগুলো সংবিধানের সঙ্গে সংঘাত পূর্ণ সেই বিষয়গুলো নিয়ে অর্ডিন্যান্স জারি করার অধিকার কারো নেই। অভিযোগ আছে ইউনুস সরকার জারি করা অনেক অর্ডিন্যান্স সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নতুন নির্বাচিত সরকারের আমলে এগুলো আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি ঢাকার একটি দৈনিকে সাক্ষাতকার দিয়ে জানিয়েছেন ইউনুস সরকার তাকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে সাংবিধানিক অধিকার অন্যায়ভাবে বঞ্চিত রেখেছে। তবুও শুধুমাত্র সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য তিনি স্বপদে বহাল থেকেছেন। সরকারি মদদে অশুভ মহল তাকে অপসারণের নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও সেনাবহিনী এবং অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি রাষ্ট্রপতির পক্ষে থাকায় তাকে অপসারণ করতে ব্যর্থ হয় সরকার।

সকল মহলের সহযোগিতায় ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচন এবং গণভোটে যুগপতভাবে অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। বিরোধী দলে আছে জামাতে ইসলাম জোট। শপথ গ্রহণ নিয়েও জট বেঁধেছে। নির্বাচনে জয়ী জোট সংবিধান বিরোধী বিধায় সংবিধান পরিষদ সদস্য হিসাবে শপথ নেয় নি। তবে জামাত জোট দুটি শপথ নিয়েছে। দ্বিতীয় শপথ নেয়ার পর প্রথম শপথের কার্যকারিতা থাকে কিনা সেটি নিয়েও বিতর্ক আছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের দায়িত্বের বাইরে কয়েকটি দেশের সঙ্গে স্পর্শকাতর বিষয়ে বাণিজ্যিক এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। বন্দর দীর্ঘস্থায়ী লিজ দিয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাউর। এগুলো সব কিছুই ইউনুস সরকার দেশবাসী এমনকি রাষ্ট্রপতিকে অন্ধকারে রেখে সম্পাদন করেছে। নতুন সংসদে এগুলো অবস্যই আলোচিত হবে। সরকারের সময়ে সংগঠিত মব সন্ত্রাস, হত্যাকান্ড, দুর্নীতি বিষয়েও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য।

যা হোক নতুন সরকার মন্ত্রী সভা গঠন করে সরকার পরিচালনা শুরু করেছে। ১৩ মার্চ নতুন জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হবে।

শেয়ার করুন