অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস
সংসদ নির্বাচনের আগে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি থেকে সরকার সরে এসেছে। অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটও স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। তার পরও অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে এরই মধ্যে। এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অচলাবস্থা নিয়ে আবারও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স (ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ)। তাদের মতে, এ পরিস্থিতির কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে এবং রপ্তানি কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সরবরাহ শৃঙ্খলের নির্ভরশীলতা নিয়ে আস্থা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ধর্মঘট চলাকালে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ১৮৫টি জাহাজ ও ২১টি ডিপোতে আটকা পড়েছিল প্রায় ৬০ লাখ টন পণ্য। এর মধ্যে ১৫ কনটেইনার জাহাজে আছে খেজুর, ফলমূলসহ শিল্পের কাঁচামাল। অন্য জাহাজে আছে চিনি, তেল, গম, ডালসহ ১৩ ধরনের পণ্য।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ কর্মসূচির আপাতত বিরতি বটে। তবে এনিয়ে অন্যরকম টেনশন ছিল রাজনৈতিক মাঠে।
একদিকে বন্দরের অবনতিকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে না পেতে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি ঘিরে গত ৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের দুই দফা সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পালটাধাওয়া হয়েছে। ওইদিন বিকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে ও রাতে শাহবাগ মোড়ে এ সংঘর্ষে অন্তত ৬৫ জন আহত হন। এর মধ্যে ছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও ঢাকা-১৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনি। এর মধ্যে রটে যায় আবদুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এসব ঘটনা নিয়ে নানান ধরণের সন্দেহ দেখা দেয়। কারো কারো মতে, বন্দরের ঘটনা যেমন ভূ-রাজনৈতিক, তেমনিভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বেশ রহস্য ঠেকেছে অনেকের কাছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে যে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকালে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়াল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা নেই বলে জানাতে হয়েছে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
অন্যদিকে জাতিসংঘের অধীনে শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চে সঙ্গে সংর্ঘষের পর আবদুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। পরে রাত ৯টায় ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজে লাইভে এসে আবদুল্লাহ আল জাবের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। জাবের জানান, জাতিসংঘের অধীনে শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো ছাড়া ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য তাদের ছিল না। এর মধ্যে ষড়যন্ত্রকারীরা পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নিতে এই হামলা চালিয়েছে। তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তিনি। যথাসময়েই নির্বাচন হবে আশা করে জাবের অনুরোধ করেন, সরকার যে চিঠি জাতিসংঘে পাঠাবে তা যেন ইনকিলাব মঞ্চকে দেখিয়ে নেয়। এ সময় আম্মারসহ আহত তিনজন তার পাশে ছিলেন। এর ঘণ্টাখানেক পর মঞ্চের নেতাকর্মীরা শাহবাগ ছাড়েন।
কারো কারো নির্বাচনের আগে পরে নানান ধরণের ঘটনায় বোঝা যায় যে, পরিস্থিতি সরকারের যেমন অনুকুলে রাখার চেষ্টা আছে তেমনি দ্রুত তা অন্যদিকে মোড় নিতেও সময় নিচ্ছে। সম্ভবত একারণেই সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ওই রকম মন্তব্য করে ফেলেন। তিনি বলেছেন, ‘তাদের যতটুকু সংস্কার করার সুযোগ ছিল, যেটুকু সংস্কার করার জায়গা ছিল, যেটুকু বিচার করার জায়গা ছিল-ওনাদের দম ফুরিয়ে গেছে।’
ভোট কেন্দ্র পাহারা দিত হবে কেনো?
কিন্তু বন্দর পরিস্থিতি চুকে গেলো অন্যদিকে ইনকিলাব মঞ্চে সঙ্গে সংর্ঘষেরও পরিসমাপ্তি হলো। তা-হলে কেনো মাঠে উভয় পক্ষ ভোট কেন্দ্র পাহারার কথা বলছেন। তিনি গত ৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার বলেছেন, এখন থেকেই ভোটের পাহারাদারি শুরু করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘কোনো জালিয়াত, ভোটচোর, অবৈধ ইঞ্জিনিয়ার যেন জনগণের কপাল নিয়ে খেলতে না পারে, তা রুখে দিতে হবে। এখন থেকে পাহারাদারি শুরু করতে হবে। বিজয়ের মালা গলে পরিয়ে দিয়ে তারপর আপনারা ঘরে ফিরবেন।’
অন্যদিকে বিএনপি-ও কম না। সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রতিপক্ষ বট বাহিনী সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যাচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করে, বেহেশতের টিকিট বিক্রি করে, মানুষের এনআইডি কার্ড ও বিকাশ নম্বর নিয়ে যায়। এখন আবার সিল ধরা পড়ছে। এগুলো তো সমস্যা। তাই আমাদের চোখ–কান খোলা রাখতে হবে। এখন থেকে শুরু করে ১২ তারিখ ভোটের ফলাফল না আসা পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবে।’
যেখানে সকলকে আশ্বস্থ করা হচ্ছে নির্বাচনে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের সব কেন্দ্র ইতোমধ্যে গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। ২৫ হাজার ৭০০ বডি ওর্ন ক্যামেরা ইতোমধ্যে সেট করা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য থাকবেন। এর মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর (সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী) ১ লাখ ৮ হাজার ৮২৫ জন মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়াও ১ হাজার ২১০টি প্লাটুনে বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন মোতায়েন করা হয়েছে। উপকূলীয় ১০টি জেলার ১৭টি আসনের ২০টি উপজেলায় ৩ হাজার ৫৮৫ জন কোস্টগার্ড সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এবার পুলিশ মোতায়েন করা হবে ১ লাখ ৫৭ হাজার। এটি এখনো মোতায়েন করা হয়নি। সবশেষে অর্থাৎ ১১ তারিখে পুলিশ মোতায়েন করা হবে। আনসার বাহিনীর সদস্য থাকবেন ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৬৬ জন। এছাড়াও নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপস চালু হয়েছে। কোনো কেন্দ্রে গন্ডগোল হলে এই অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে পূজার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের একটি অ্যাপ খুব কাজে দিয়েছে। তাহলে কেন্দ্র নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ভোট কেন্দ্র পাহারা দিতেম হবে?
সংঘর্ষ বাড়ছেই
এবারে মূলত বিএনপি এবয় জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাডি লড়াই হচ্ছে। এবং বলা চলে দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতের সাথে প্রতিদ্বন্দিতা তীব্রই হচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিনই দলদুটির মধ্যে কোথাও না কোথাও ভয়াবহ সংর্ঘষ বেধে যাচ্ছে। সর্বশেষ পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে নির্বাচনি প্রচারণার মধ্যেই বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ বেধে যায়। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। প্রশ্ন হচ্ছে এই দ্বি-দলীয় নির্বাজনের মধ্যে আবার কে বাগড়া দিতে যাচ্ছে ? এরা কারা?
সীমান্তে প্রচুর বিজিবি মোতায়েন কেনো?
এদিকে উপদেষ্টা জানিয়েছেন এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন খুব শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হবে। নির্বাচনে ভোট কারচুপির কোনো ধরনের শঙ্কা নেই। কিন্তু তাহলে কিসের আতঙ্কে তিনি বললেন যে, নির্বাচনের সময় সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ভারতীয় সীমান্ত এলাকাগুলোতে প্রচুর সংখ্যক বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সীমান্তের ৮ কিলোমিটার এলাকায় সেনাবাহিনী যায় না। তবে প্রয়োজন হলে আমরা সেনাবাহিনী পাঠাব। তাহলে কি তাদের কাছে অন্য কোনো খবর আছে? কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেনো এতো কড়াকড়ি ?
তাহলে কি সরকারের কাছে নির্বাচনের আগে পরে অঘটনের কোনো শক্ত বার্তা আছে? তা না হলে কি বলা যায় বড়ো ধরণের শঙ্কা নিয়ে নির্বাচনী তরী বাইতে হচ্ছে অন্তবর্তী সরকারকে? কেনোনা ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভারী হয়ে উঠছে। কারো কারো বিশ্লেষণ নির্বাচন হয়ে গেলোও তা হবে ঝুলন্ত সংসদ। কারো কারো আশঙ্কা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আশাবাদীরা সহজেই সরকার গঠনের সুযোগ পাচ্ছে না। গুজব ছড়ানো হচ্ছে নির্বাচনে ভয়াবহ সংর্ঘষ হবে। আর এতে নির্বাচনী তরী বেয়ে নিতে ড. ইউনূসের সরকার বেহাল অবস্থায় পড়বে? কাজেই দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচন হলেও বড়ো ধরণের আশঙ্কা নিয়ে নির্বাচনী তরী বাইতে হচ্ছে অন্তবর্তী সরকারকে।