১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, শনিবার, ০৫:০৪:৫৭ পূর্বাহ্ন


অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য ব্যর্থতার খতিয়ান
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ১১-০২-২০২৬
অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য ব্যর্থতার খতিয়ান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস


দুর্নীতিগ্রস্ত, কুশাসন ক্লিষ্ট একটি দেশে সরকারকে মেটিকুলাস ডিজাইনে ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছর সময়ে সব কিছু পাল্টে দিবে সেটি চিন্তার অবকাশ নেই। কিন্তু শুভ পরিবর্তনের যে আকাশচুম্বী আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সাধারণ জনগণ আশায় বুক বেড়েছিল তার ছিটেফোঁটাও অর্জিত হয়েছে দাবি করা যাবে না। বরং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ জাতীয় নির্বাচনের পর বিজয়ী রাজনৈতিক নতুন সরকারের জন্য চতুর্মুখী সংকট রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। ভঙ্গুর অর্থনীতি, নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদী আমলাতন্ত্র, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, মুদ্রাস্ফীতি, আগুন লাগা নিত্যপণ্যের বাজার এবং সর্বোপরি প্রভাবশালী প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক। 

বহুল প্রচারিত ঘোষণা ছিল সরকার যুগপৎভাবে জুলাই হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিচার, প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংস্কার এবং অবাধ নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। ১৮ মাস সময়ে পূর্ববর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সাংসদদের বিরুদ্ধে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কিছু বিচার, সংস্কারের নামে কিছু প্রবাসী তথাকথিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিতর্কিত জুলাই সনদ প্রণয়ন ছাড়া সরকারের অর্জন খুব দৃশ্যমান নয়।

সরকার অবশ্য ব্যাংকিং খাতে সংস্কার করেছে, ধ্বংসের পথে ধাবমান কয়েকটি ব্যাংক অপমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে, মূলত রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টেনে ধরেছে। কিন্তু বিনিয়োগ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এবং শিল্পে বিদ্যুৎ জ্বালানি সংকটে বৈদেশিক বাণিজ্যে ধস নেমেছে। জুলাই আগস্ট ২০২৬ আন্দোলনে বিপর্যস্ত পুলিশ বাহিনীর আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে নি, উপরন্তু সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর মব সন্ত্রাস সমাজ জীবনে বিভীষিকা সৃষ্টি করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ কোনো সেক্টরেই ন্যূনতম সংস্কার হয়নি। সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা হতাশা প্রকাশ করে আমলাতন্ত্রকে দায়ী করেছে ব্যর্থতার অজুহাত হিসেবে।

অনেক ব্যর্থতার মধ্যেও সরকারের কিছু সাফল্য উল্লেখ করতে হয়। এ সময়ে বাংলাদেশ বিমান লাভ করতে শুরু করেছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা বেড়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর লাভ করেছে, বিডা এবং বার্ক শক্তিশালী হয়েছে, রেমিট্যান্স বেড়েছে।

জ্বালানি বিদ্যুৎক্ষেত্র উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক কোনো অগ্রগতি হয়নি। গ্যাস অনুসন্ধানে গতানুগতিক ধারা বজায় থাকায় এবং এলএনজি আমদানি চ্যালেঞ্জ থাকায় গ্যাস সংকট ঘনীভূত হয়েছে। সিন্ডিকেটের আগ্রাসনে এলপিজি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসান বেড়েছে। এবারের গ্রীষ্মকালে লোডশেডিং মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। সরকার ব্যর্থ হয়েছে রূপপুর আণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শেষ করতে। জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট এবং বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জের কারণে অনেক মিলকারখানা বন্ধ হয়ে গাছে। বেকার সমস্যা প্রকট হয়েছে। রফতানি বাণিজ্যেও অগ্রগতি শ্লথ হয়ে আসছে। সরকার সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান বিষয়ে সচেতনভাবেই কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন বিষেয়ও সরকারের কার্যক্রম সীমিত ছিল।

অবকাঠামো খাতেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে ঢাকা বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু করতে, মেট্রো ট্রেনের মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশ শেষ করতে, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ের অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে, এয়ারপোর্ট থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত রাস্তার অবশিষ্ট কাজ প্রায় যুগ পেরিয়ে গেলেও অসম্পন্ন রেখে আওয়ামী লীগের চলে যাবার পর এ সরকার বাকি কাজ সম্পন্ন করত্যে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে বাইপাস রোডের কিছু অগ্রগতি হলেও সেটাও দেড় বছরে অনেক কাজ বিশেষ করে পূর্বাচল অঞ্চলের কাজ এখনো অসম্পন্ন পড়ে আছে। সরকারের বিদ্যুৎ জ্বালানি খনিজসম্পদ, সড়ক, সেতু এবং রেল মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা স্বীকার করেছেন আমলাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে।

পরিবেশ উপদেষ্টা সেন্ট মার্টিন বিষয়ে কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করে ভালো কাজ সম্পূর্ণ করতে পারেননি। পলিথিন নিষিদ্ধ কার্যক্রম ১০ ভাগও সফল হয়নি। ঢাকা মহানগরীর বাতাস এখনো বিশ্বের সবচেয়ে দূষিততম। ঢাকার চারপাশের নদীগুলো এবং ঢাকার খালগুলোর দখল-দূষণ মুক্তি মেলেনি। বিগত সরকারের সময় যে অবস্থা, এখনো তাই। 

সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েও সরকার সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনের জন্য জুলাই সনদ প্রণয়ন করেছে। সংবিধানের সংস্থানের সঙ্গে সংঘাত ঘটিয়ে নির্বাচন এবং গণভোট করতে চলেছে।

সার্বিকভাবে চতুর্মুখী সংকটে রেখে সরকার বিদায় নিচ্ছে। পরিণতি নানা ধরনের হতে পারে। সাংবিধানিক শূন্যতার সৃষ্টি হতে পারে। একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে নির্বাচনের বাইরে রাখায় গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটতে পারে। তাছাড়া অনুমান করা যাচ্ছে কাজের চেয়ে কথা বেশি বলা সরকার জেনে বুঝে হয়তো কোনো ভূরাজনীতির খপ্পড়ে পড়েছে।

শেয়ার করুন