০১ অক্টোবর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৩:৩৪:১৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
নর’ইস্টারের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড নিউইয়র্কসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিউইয়র্কবাসীর ৬০ শতাংশ মামদানির পক্ষে অবৈধ জুয়ার অভিযোগে পলিমার্কেটের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের মামলা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই মার্কিন সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হওয়ার লড়াইয়ে আবদুল এল-সাইয়েদ নিউইয়র্কে স্থায়ী ‘জবস এনওয়াইসি’ কেন্দ্র চালু দ্বিতীয় বাড়ির কর নিয়ে মামদানির উদ্যোগে আদালতের বাধা লোয়ার ম্যানহাটনে প্রায় ১ হাজার নতুন সাশ্রয়ী ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা তৃতীয় দেশে নির্বাসনের পথ ফের খুলে দিল সুপ্রিম কোর্ট বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নে প্রাণান্ত চেষ্টায় তারেক রহমান


বুড়িগঙ্গার কি আসলেই অনেক সুন্দর
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ৩০-০৯-২০২৬
বুড়িগঙ্গার কি আসলেই অনেক সুন্দর নদী দিবসে র‌্যালি


বুড়িগঙ্গার পাড় শত শত পরিবেশ ও নদী প্রেমীদের ভীড়। আজ তারা রাজধানীর বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদী বর্তমান অবস্থান সরজমিনে দেখতে যাবে। তবে তার চেয়ে বড়ো কথা লঞ্চে করে এই দুই নদী ভ্রমণে অংশ নেওয়া।

দিনটি ছিরো শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর)। পরের দিন বিশ্ব নদী দিবস। যথারীতি সবাই লঞ্চে চেপে বসলো। সব বয়সের চোখ নদী দিকে। কিন্তু সবার চোখে মুখেই মোটামুখি একটা উচ্ছ্বাস ভাব। কারণ বুড়িগঙ্গার বুক বেয়ে লঞ্চে চড়ে এর আশ পার্শ্বের নয়নাভিরাম দৃশ্য নদী প্রেমী সবাইকে হতবাক করা দেয়। নদীর পানি মোটমুটি টলটলে না হলেও ঘোলা পানিও তারা মেনে নিয়েছে। তারা নদীর ঢেউ আর কোথাও কোথাও পাল তুলে বিভিন্ন ধরনের নৌযান দেখে বেশ উচ্ছ্বসিতই হচ্ছিল। কারো কারো মনে যেনো উদাস হয়ে যাচ্ছিল বুড়িগঙ্গা ঢেউ আর জলরাশি দেখে। তাদের মনে জেগে উঠলো যেনো নানান ধরনের খেয়াল। তারা আসলে পত্র পত্রিকায় যে বুড়িগঙ্গা ধলেশ্বরী নদীর কথা শুনেছিল-এমন তো তা দেখা যাচ্ছে না। আশে পাশে বর্জের স্তুপ নেই। বুড়িগঙ্গার পাড়ে হাসপাতালের রোগিদের নোংরা ময়লা কাপড় চোপড় পরিস্কারের কোনো দৃশ্য চোখে পড়ছে না। কিংবা বলা হতো যে নদীতে একেবারে পাইপ দিয়ে মনুষ্য পয় বর্জ্য ফেলা হতো তা আসলে কই? সরজমিনে এসব না দেখে নদী প্রেমীরা আসলে বুড়িগঙ্গা আর ধলেশ্বরী প্রকৃতি এক অপার সৃষ্টি হিসাবে গুণকীর্তনই করছিলো। সব বয়সের মানুষের মুখে এক কথা বুড়িগঙ্গার অনেক সুন্দর..। আসলেই কি ..

আসলেই কি বুড়িগঙ্গা এতো সুন্দর?

সবার মনে যখন এমন প্রশ্ন তখন সরজমিনের গিয়ে জানা গেলো অন্য তথ্য। আসলে বাংলাদেশে এখন আশ্বিনের মাঝামাঝি। বর্ষার আর মেঘের গর্জন এখনো বিলীন হয়ে যায়নি। তা-ই বুড়িগঙ্গা আর ধলেশ্বরীর দুই কূলে পানি থৈ থৈয়ে লুকিয়ে গেছে নদীর পাড়ে। পড়ে থাকা সর্বধরনের বর্জের স্তুপ। এমনকি নদীর পাড়ে পাড়ে ড্রেন আর পাইপগুলি দিয়ে কিভাবে যে এর তলদেশে ময়লা ফেলা হয় বা বাহিত হয় বুড়িগঙ্গা আর ধলেশ্বরী সে দৃশ্য কারো চোখেই পড়ে না। অথচ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) এক জরিপে ঢাকার আশপাশের নদনদীতে বর্জ্য নিঃসরণের ৪২৪টি উৎসমুখ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গায় আছে ১৬৬টি। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে এই উৎসমুখগুলো দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার টন তরল ও কঠিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে। যা কি-না বুড়িগঙ্গা আর ধলেশ্বরীর দুই কূলে থৈ থৈ পানিতে লুকিয়ে থাকায় নদী পরিদর্শনে যাওয়া সর্বস্তরের মানুষের চোখে পড়েনি।

এ ব্যাপারে বাপা’র সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির দেশ পত্রিকাকে নদী পরিদর্শন শেষে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, দেশের নদ-নদী ভালো নেই। নদীর কান্না আজ দুচোখে দেখলাম। নদী দখলকারী, নদীর বুকে শাহ সিমেন্ট, স্ক্যান সিমেন্টসহ বেশকিছু কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। সরাসরি নদীর বুকে তাদের মালামাল পরিবহনের জন্য জেটি নির্মাণ করা হয়েছে প্রসাশনের নাকের ডগায়। কিন্ত প্রসাশন নির্বিকার। আমরা এসমস্ত দখলদারদের উচ্ছেদ করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য দাবি জানাচ্ছি। ২৬ সেপ্টেম্বর শনিবার সকাল সাড়ে দশটায় মোহাম্মদপুরের বসিলা লঞ্চ ঘাট থেকে লঞ্চ যোগে ‘বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর দখল-দূষণ এর বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন’ যাওয়া হয় নদী দু’টির অবস্থা দেখতে। পরের দিন ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার বাংলাদেশে পালন করা হড বিশ্ব নদী দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা নানা কর্মসূচি পালন করে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নেতৃত্বে পরিবেশ ও নদী প্রেমী ২৩টি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে শনিবার সকাল সাড়ে দশটায় মোহাম্মদপুরের বসিলা লঞ্চ ঘাট থেকে লঞ্চ যোগে ‘বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর দখল-দূষণ এর বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

বাপা’র সহসভাপতি মহিদুল হক খান এর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির এর পরিচালনায় নদী পরিদর্শন কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন (এমপি)। আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা’র কোষাধ্যক্ষ মো. আমিনূর রসুল, সাংগঠনিক সম্পাদক, মিহির বিশ্বাস, যুগ্ম সম্পাদক, শাহজাহান মৃধা বেনু, হুমায়ুন কবির সুমন, ড. হালিমদাদ খান, নির্বাহী সদস্য ফরিদুল ইসলাম ফরিদ, বিআইডাব্লিউটিএর পরিচালক, মো. আলমগীর কবির, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট এর পরিচালক, গাউস পিয়ারী, সিডাব্লিউএফ এর চেয়ারম্যান শাহ্ ইশরাত আজমেরী, এএলআরডি এর সানজিদা খাতুন রিপা, বারসিক এর জাহাঙ্গীর হোসেনসহ বাপা অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং আয়োজক সংগঠনের অন্যান্য শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, এবং গ্রীন ভয়েস এর বিভিন্ন শাখার প্রতিনিধিবৃন্দ।

আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন (এমপি) বলেন, বাংলাদেশের প্রাণ হচ্ছে নদী। এই নদী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সকল ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রকৃতির সঙ্গে এবং প্রতিটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই নদী আজ হুমকির মুখে। যারা এই নদীকে গলা টিপে হত্যা করার চেষ্টা করছে, আমি মনে করি প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা উচিত। নদী দখলদার ও দূষণকারীদের তালিকা প্রকাশ ও তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের দাবি করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকায় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে যেভাবে ব্যবস্থা নিই, মাদকের বিরুদ্ধে যেভাবে অভিযান পরিচালনা করি এবং অপরাধীদের নাম যেভাবে থানায় লিপিবদ্ধ থাকে, আমি মনে করি পরিবেশ, নদী-খালের ক্ষতি করে যারা, তাদেরও এভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত। যারা খাল ভরাট করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, নিজেদের স্বার্থেই জন্য পরিবেশকে গলা টিপে হত্যা করে, পরিবেশের প্রত্যেকটি সেক্টরে যারা ক্ষতি করে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

বিআইডাব্লিউটিএর পরিচালক, মো. আলমগীর কবির বলেন, আমরা শুরুতেই নদী রক্ষার কথা বলে আসছি। কোন কোন জায়গায় আমাদের নদীগুলোকে রক্ষা করতে হবে, কী কী হুমকি আমাদের আছে, সেই বিষয়গুলো আমাদের অনেকটাই আমরা জানি। কিন্তু তারপরেও অনেক বিষয় আছে যেগুলো আমরা জানি না।

মিহির বিশ্বাস বলেন, নদীগুলোকে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বয়ের মাধ্যমেই রক্ষা করতে হবে। কারণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যে আমরা সমন্বয়ের অভাবগুলো দেখছি, সেই জায়গাগুলোকে আমাদের সমন্বয় করতে হবে। আন্তঃমন্ত্রণালয়গুলো যদি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে, তবেই আমাদের নদীগুলো রক্ষা হবে।

শাহ ইশরাতে আজমেরী বলেন, আমাদের নদীগুলো দূষণমুক্ত করতে হবে। জীববৈচিত্র রক্ষা করার জন্য আমাদেরকে সচেতন হতে হবে এবং এর পাশাপাশি যারা দখল করছে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং সকল জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের এই নদী নিয়ে কাজ করতে হবে বলে জানান তিনি।

হুমায়ুন কবির সুমন বলেন, নদীর সাথে সম্পর্কিত মৎস্য, প্রাণবৈচিত্র্য, জীববৈচিত্র। আমাদের সকলে মিলে যেন একটা সুন্দর বাংলাদেশে গড়তে পারি সেই লক্ষে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

গাউস পিয়ারী বলেন, আমাদের নিজ জায়গা থেকে যেন নদী রক্ষায় কাজ করতে হবে।

সানজিদা খাতুন রিপা বলেন, দূষণের জন্য দায়ী ব্যক্তি সংস্থা গুলোকে শাস্তি— নিশ্চিত না করা পর্যন্ত দখল দূষণ কমবে না।

শেয়ার করুন