০৩ জুন ২০২৬, বুধবার, ০২:১৫:৪৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
গ্রিনকার্ডের আবেদন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অপব্যাখ্যার পর পুনঃব্যাখ্যা, মামলার প্রস্তুতি বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে আবারো বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ভিসা : দুইবারের বেশি দূতাবাসে যেতে হবে না অনলাইন জুয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বড়রা এ প্রজন্মকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে খালেদা জিয়ার নামে নামকরণ : তারেক রহমানের ‘না’ সাক্ষাৎকার ছাড়াই দ্রুত আশ্রয় আবেদন বাতিলের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের নিউ জার্সির আইস ডিটেনশন সেন্টারে অমানবিক আচরণের অভিযোগ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আজ ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী অ্যাডভান্সড প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী অগ্রগতি


১০০ দিন না যেতেই তারেক রহমানের এমন বার্তার নেপথ্যে কী
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৩-০৬-২০২৬
১০০ দিন না যেতেই তারেক রহমানের এমন বার্তার নেপথ্যে কী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান


চারিদিকে একধরনের অস্বস্তি ভাব সবার চোখে পড়ছে। আছে একধরনের অস্থিরতা, কিন্তু তা-র মাত্রা খুব একটা অতিক্রম করেনি। মাত্র-তো তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ১০০ দিন হয়েছে। সময়টা হিসাবে কারো কারো মতে বেশিদিন না। তা-ই হয়তো সমালোচনা খুরধার লেখনী এখনই দেখা যাচ্ছে না। কিন্ত এরই মধ্যে আমজনতা বাদ দিয়ে নেতাকর্মী-সমর্থকদের কাছেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সহযোগিতা চেয়ে বসলেন কেনো? তিনি কি আবদার করেছেন খোদ তার দলের নেতাকর্মীদের কাছে? তার এমন আহবান নিয়ে নানা জলপনা-কল্পনা বাতাসে..।

নেতা-কর্মীর কি অসহযোগিতা করছে?

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পরে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর-ই মধ্যে সামনে অত্যন্ত কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ সময় অপেক্ষা করছে উল্লেখ করে সরকারকে সফল করতে নেতাকর্মী-সমর্থকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এমন বক্তব্যে সর্বপ্রথম যে প্রশ্নটি রাজনৈতিক অঙ্গনে ভেসে বেড়াচ্ছে তা হলো প্রধানমন্ত্রী কি তার প্রিয় দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে এই একশ’ দিনেই সহযোগিতার না পাওয়ার নমুনা পেয়েছেন?

কি ধরনের সহযোগিতা চাইলেন?

এরপরে আসে তিনি কি ধরনের সহযোগিতা চাইলেন? তারেক রহমান কি ধরনের সহযোগিতা চাইলেন তার ইঙ্গিত দেননি। তা না দিলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন দলের ভেতরে একটি অংশ সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের সর্বক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করছে। এনিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনেক ক্ষেত্রে দিন দিন অসহায়ত্ব ফুটে উঠছে। আর এতে করে সাধারণা জনগণ ধুকে ধুকে ভুগছে, তাদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। অভিযোগ উঠেছে, দেশের জন্য কাজ বাদ দিয়ে সারা দেশে বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের কিছু নেতা কর্মী মামলা বাণিজ্য দেদারসে চাঁদা কামাচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে মিথ্যা বা গায়েবি মামলা দিচ্ছে। আবার মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার নামে চাঁদাবাজি করছে। যদিও নিজ দলের শীর্ষ নেতারাও বিষয়টিকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। কিন্তু তারপরেও অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু নেতাকর্মী পুলিশের সাথে সরাসরি যোগসাজশ করে মামলা বাণিজ্য করছে। মামলাগুলোতে কতজনকে এবং কীভাবে আসামি করা হবে, তা ঠিক করে তারা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বিস্তর বিভিন্ন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। আর এধরনের কাজে প্রতিবাদে এখন আর কেউ মুখও খুলছে না। কেননা এই মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ স্থানীয় বিএনপি নেতা ও আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্যদের মধ্যে ভাগাভাগি হয় বলে অভিযোগের পাল্লা ভারী হচ্ছে। বলা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে অনেক সাধারণ মানুষকেও এসব মামলায় আসামি করা হচ্ছে। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই এমন দিনমজুর ও ব্যবসায়ীরাও এই চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। যদিও দলের অবস্থান পরিস্কার করে করা হচ্ছে। কিন্তু শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ে এখনও অনেকেই এই অনৈতিক ও চাঁদাবাজির সাথে জড়িত সব বিষয় নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে চরম ক্ষোভ হতাশা বিরাজ করছে। 

সর্বশেষ কুমিল্লার একটি ঘটনা সর্বমহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কুমিল্লার শাসনগাছা বাস টার্মিনালে পরিবহন শ্রমিক ও চালকদের অভিযোগ ছিল, নিয়মের চেয়ে বহুগুণ বেশি চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এর প্রতিবাদে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করেন। কিন্তু চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে পুলিশ আটক করলেও, পরে দলের নেতাদের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে পরিস্কার হয়ে গেছে পরিবহণ ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি বিএনপি কার্যত ব্যর্থ হতে চলেছে নিজ দলেরই নেতাকর্মীদের সহগযোগিতার অভাবে। প্রশ্ন হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী কি তাহলে দলের চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীদের বয়কট করে তাদেরকে আইনে হাতে সোর্পদ করার ব্যাপারে সহযোগিতা চাইলেন?

স্কুল-কলেজ মসজিদ কমিটি নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি

এদিকে স্কুল, কলেজ ও মসজিদ কমিটি নিয়ে সারাদেশে দলবাজির অভিযোগ উঠেছে। এসব সেক্টরে বিএনপি তাদের সমর্থনপুষ্ট অথচ অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও গায়ের দলীয় প্রভার খাটিয়ে কমিটিতে ঢুকে পড়ছে। দেশের বেসরকারি-স্কুল কলেজে ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি নির্বাচন নিয়ে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। অথচ এসব ক্ষেত্রে সৃষ্ট বিরোধ ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি নিরসনে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছ নির্বাচন এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়াই যাচ্ছে না। কারণ প্রশাসন এক্ষেত্রে দলের অনেক পর্যায় থেকে চাপের মুখে থাকে বলে মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে এ ধরনের কমিটি গঠন ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নানা উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে বিএনপি সম্পর্কে শুধু নেতিবাচকই না বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়ে গেছে। ফলে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মানববন্ধনসহ নানা প্রতিবাদি কর্মসূচিও পালন হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে এমন বাড়াবাড়ি যারা করছে তাদেরকে এসব কাজে নিবৃত্ত থাকতেই কি প্রধানমন্ত্রী আবেদন জানালেন?

না-কি ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটের কথা জানালেন

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দেশের সামনে অত্যন্ত কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ সময় অপেক্ষা করছে। এই সময়কে গুরুত্ব না দিয়ে হেলাফেলায় পার করে দিলে তার ক্ষতি দেশের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর পড়বে। বিএনপির চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘ক্ষতি আপনার হয়তো হবে না, ক্ষতি হবে দেশের, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।’ প্রশ্ন হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী কি এক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক কিছু ইঙ্গিত করেছেন? কেননা সৌহার্দ ও সম্পর্কোন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে বিজেপি সরকারের নানা সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে তিক্ততা বেড়েই চলেছেন। অন্যদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও সংকট সমাধানে কার্যত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ কমে যাওয়া, মিয়ানমারের টালবাহানা এবং ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার কারণে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে প্রক্রিয়া একপ্রকার স্থবির হয়ে আছে। এরই মধ্যে ক্ষমতা গ্রহণের পর মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং এর প্রথম বিদেশ সফর হচ্ছে ভারত। পাঁচ দিনের এই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয় বলে শোনা যায়। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ সফরকে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বিশারদদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এতে তারেক রহমানের সরকারকে একধরনের অস্বস্তিতে ফেলে দিযেছে। অন্যদিকে সম্প্রতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে ট্রাম্প একটি চমকপ্রদ ফোনে যুক্ত হয়ে মোদির প্রতি তার গভীর সমর্থনের কথা জানান। সেখানে তিনি মোদিকে ‘মহান বন্ধু’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ভারত যা চাইবে, তাই পাবে এবং ভারত ১০০ ভাগ আমার ওপর নির্ভর করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে,বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে এসব ঘটনা ঘটনা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এরই মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে আগামী জুনের শেষ সপ্তাহে (সম্ভাব্য তারিখ ২৩ থেকে ২৬ জুন) চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেইজিংয়ে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার জন্য উভয় দেশের তরফেই ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্রের পুরো জনগোষ্ঠির একধরনে সহযোগিতা সমর্থন থাকা বেশ জরুরি। কারো কারো মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হয়ত এসব বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে সামনে অত্যন্ত কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ সময় অপেক্ষা করছে বলে আগে নেতাকর্মী-সমর্থকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছেন।

শেষ কথা

২০২৪ সাথে শেখ হাসিনা দেশে ছেড়ে পালিয়ে ভারতের আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একধরনের প্রতিশোধ নেওয়ার লক্ষণ দেখা গিয়েছিলো। ঠিক সেই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও সে সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানে অহিংস নীতি সারা দুনিয়া চমক সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তার দলেরই এক শ্রেণীর নেতকর্মীরা রাজনৈতিক, সামাজিক এমনকি প্রশাসনে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করছে, যা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে হয়তবা সামনের দিকে পা ফেলতে পদে পদে ভোগাচ্ছে। আর তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তারেক রহমান ওই মন্তব্য এবং অন্যদিকে এই মন্তব্যের পরপরেই পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের হঠাৎ পদত্যাগ কি-না তা সময় বলে দেবে।

শেয়ার করুন