১৩ মে ২০২৬, বুধবার, ০৭:৪২:১৫ অপরাহ্ন


২০৩০ সালের মধ্যে ক্যানসার ভ্যাকসিন
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৩-০৫-২০২৬
২০৩০ সালের মধ্যে ক্যানসার ভ্যাকসিন বায়োএনটেকের ক্যানসার ভ্যাকসিন


বিশ্বজুড়ে ক্যানসার চিকিৎসায় এক নতুন সম্ভাবনার আলো তৈরি হয়েছে এমআরএনএ প্রযুক্তি ঘিরে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল, সে এমআরএনএ প্রযুক্তিই এখন ক্যানসার চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। জার্মান বায়োটেক প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তুর্কি বংশোদ্ভূত অধ্যাপক উগুর শাহিন ও অধ্যাপক ওজলেম তুরেচি সম্প্রতি ঘোষণা করেন, ২০৩০ সালের আগেই ক্যানসার ভ্যাকসিন বাস্তবে রোগীদের জন্য ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। তাদের ভাষায়, ক্যানসার চিকিৎসার ভবিষ্যৎ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে রোগ নিরাময় কিংবা রোগীদের জীবনমান নাটকীয়ভাবে উন্নত করার সম্ভাবনা এখন হাতের নাগালে। এ মন্তব্য বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণা মহলে নতুন করে আশাবাদ তৈরি করেছে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন ক্যানসার এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী রোগ।

এমআরএনএ বা মেসেঞ্জার আরএনএ হলো এমন একটি জেনেটিক নির্দেশনা ব্যবস্থা, যা শরীরের কোষকে নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরি করতে নির্দেশ দেয়। কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন তৈরি করানো হয়েছিল, যাতে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসকে চিনে আক্রমণ করতে পারে। ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এখানে লক্ষ্য ভাইরাস নয়, বরং ক্যানসার কোষের বিশেষ প্রোটিন বা অ্যান্টিজেন।

অধ্যাপক ওজলেম তুরেচি বলেন, এমআরএনএ এক ধরনের ব্লুপ্রিন্ট, যা শরীরকে শত্রুকে শনাক্ত করতে শেখায়। কিন্তু ক্যানসারের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটি আরো জটিল, কারণ ক্যানসার শরীরের নিজস্ব কোষ থেকেই তৈরি হয়। ফলে শরীরকে নিজেরই পরিবর্তিত কোষকে শনাক্ত করে ধ্বংস করতে শেখানো সহজ নয়।

বায়োএনটেক মূলত ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ক্যানসার ইমিউনোথেরাপি উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে। তবে ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি শুরু হলে প্রতিষ্ঠানটি ফাইজারের সঙ্গে যৌথভাবে এমআরএনএভিত্তিক কোভিড ভ্যাকসিন তৈরি করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। সে অভিজ্ঞতাই এখন তাদের ক্যানসার গবেষণাকে আরো দ্রুত এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে।

বর্তমানে গবেষকরা ব্যক্তিগতকৃত ক্যানসার ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছেন। এ পদ্ধতিতে রোগীর টিউমার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তার জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর সে নির্দিষ্ট রোগীর জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয় একটি কাস্টম এমআরএনএ ভ্যাকসিন। এ ভ্যাকসিন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে তা নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষকে শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে। তবে এ প্রক্রিয়া এখনো অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা ভ্যাকসিন তৈরি করতে হয় বলে এটি সময়সাপেক্ষও। বিজ্ঞানীরা এখন এ প্রযুক্তিকে আরো দ্রুত ও কম খরচে কার্যকর করার চেষ্টা করছেন।

এরই মধ্যে প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের মতো কঠিন রোগের ক্ষেত্রেও কিছু রোগীর মধ্যে ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি কমেছে বলে দেখা গেছে। যদিও গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনো এ গবেষণা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং বড় পরিসরের ট্রায়াল ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

বিশ্বজুড়ে আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। মার্কিন কোম্পানি মডার্না ইতোমধ্যে মেলানোমা, ফুসফুস ক্যানসার, ব্লাডার ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের বিরুদ্ধে এমআরএনএভিত্তিক ভ্যাকসিনের বড় আকারের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এমআরএনএ ভ্যাকসিন ও ইমিউনোথেরাপি একসঙ্গে ব্যবহার করলে রোগীর বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

ক্যানসার রিসার্চ ইউকের বিশেষজ্ঞদের মতে, এমআরএনএ প্রযুক্তি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জাগিয়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম। ভবিষ্যতে এটি শুধু চিকিৎসাই নয়, ক্যানসার প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, এই প্রযুক্তির সামনে এখনো বড় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ক্যানসার কোষের বৈচিত্র‍্য তার মধ্যে অন্যতম। একটি টিউমারের মধ্যেই একাধিক ধরনের কোষ থাকতে পারে, যা ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া সুস্থ কোষের ক্ষতি না করে শুধু ক্যানসার কোষকে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি প্রক্রিয়া।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও কম নয়। ব্যক্তিগতকৃত ভ্যাকসিন তৈরির জন্য উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক গবেষণাগার এবং দ্রুত জিন বিশ্লেষণ সুবিধা প্রয়োজন, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে গবেষকদের আশা, প্রযুক্তি আরো উন্নত হলে উৎপাদন খরচ ধীরে ধীরে কমে আসবে। কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন দ্রুত অনুমোদনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে ক্যানসার ভ্যাকসিন অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া গবেষণাকে আরো এগিয়ে নিতে পারে। অধ্যাপক উগুর শাহিন বলেন, আমরা কখনোই ক্যানসারের সম্পূর্ণ নিরাময়ের নিশ্চয়তা দিতে চাই না। তবে আমরা এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছি, যেখানে কিছু ধরনের ক্যানসার দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।

অধ্যাপক তুরেচির মতে, কোভিড মহামারির অভিজ্ঞতা তাদের গবেষণাকে নতুন গতি দিয়েছে। দ্রুত ভ্যাকসিন তৈরি, বৈশ্বিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া, এসবই ক্যানসার গবেষণায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এ প্রযুক্তি সফলভাবে কার্যকর হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ক্যানসার আর মৃত্যুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়া ক্যানসারের ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

এদিকে বায়োএনটেক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের এমআরএনএ ভ্যাকসিন ট্রায়াল বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিশেষ আলোচনায় রয়েছে। এই গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডা. ভিনোদ বালাচান্দ্রন। প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করছে বায়োএনটেক এবং জেনেনটেক। এ ফেজ-১ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অটোজিন সেভুমেরান (বিএনটি১২২) নামে একটি ব্যক্তিগতকৃত এমআরএনএ ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হচ্ছে। রোগীর টিউমারের জেনেটিক তথ্য বিশ্লেষণ করে আলাদাভাবে ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়, যাতে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করতে পারে।

২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, এ ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ১৬ জন অগ্ন্যাশয় ক্যানসার রোগীর মধ্যে আশাব্যঞ্জক ফল দেখা গেছে। অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের এ ভ্যাকসিন দেওয়া হয় এবং এর সঙ্গে ইমিউনোথেরাপি ও কেমোথেরাপিও যুক্ত ছিল।

দীর্ঘ ছয় বছরের ফলোআপে দেখা গেছে, যেসব রোগীর শরীরে শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তাদের মধ্যে আটজনের সাতজন এখনো জীবিত। অন্যদিকে যাদের শরীরে সে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়নি, তাদের মধ্যে মাত্র দুজন জীবিত আছেন। অগ্ন্যাশয় ক্যানসার অত্যন্ত প্রাণঘাতী একটি রোগ। সাধারণভাবে এ রোগে আক্রান্তদের পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার প্রায় ১৩ শতাংশ। সেখানে এ ট্রায়ালের ফলাফল গবেষকদের কাছে বড় ধরনের অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, এ ভ্যাকসিন শরীরে দীর্ঘস্থায়ী টিউমার-নির্দিষ্ট টি-সেল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এ টি-সেল বহু বছর সক্রিয় থেকে ক্যানসার কোষকে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এ ধরনের ইমিউন মেমোরি ভবিষ্যতে ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসা ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে গবেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, এটি এখনো ছোট পরিসরের প্রাথমিক গবেষণা। মাত্র ১৬ জন রোগীর তথ্যের ভিত্তিতে একে চূড়ান্ত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বর্তমানে বড় আকারের ফেজ-২ ট্রায়াল বিভিন্ন দেশে চলমান রয়েছে। মডার্নাসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই ধরনের এমআরএনএ ক্যানসার ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি একাধিক ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

সব মিলিয়ে, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্যকর ক্যানসার ভ্যাকসিন বাস্তবে রূপ পেলে তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে। যদিও এখনো অনেক পথ বাকি, তবুও গবেষণার বর্তমান অগ্রগতি বিজ্ঞানীদের নতুন করে আশাবাদী করে তুলছে।

শেয়ার করুন