০৮ মে ২০২৬, শুক্রবার, ০৭:২০:২৯ অপরাহ্ন


চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণ কঠোরতার শুরুতেই হোঁচট
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৬-০৫-২০২৬
চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণ কঠোরতার শুরুতেই হোঁচট চাঁদাবাজ


চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণে কঠোরতায় হোঁচট খাচ্ছে সরকার। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। এক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে দল ও দীর্ঘদিনের ত্যাগ স্বীকারের দোহাই। যেনো রাজনৈতিক জীবনে জেল জুলুমের পুরস্কার হিসাবে নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজির অধিকার দিতে হবে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনায় এমন পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি চাঁদাবাজ রুখে দিতে সরকারেরও অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। 

ঘটনাস্থল কুমিল্লা

সম্প্রতি কুমিল্লায় বিএনপির একজন শীর্ষ নেতাকে আটকের ঘটনায় পুরো প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে গোয়েন্দা বিভাগের ব্যাপক খবরাখবরের পর কঠোর পদক্ষেপ নিতে গিয়ে মহাবিপদে পড়ে গেছে পুরো প্রশাসন। জানা গেছে, কুমিল্লায় বাস টার্মিনালে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে আটক করা হয়েছিল কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে। কিন্তু এতেই সেখানে বাস টার্মিনাল হতে শুরু করে পুরো কুমিল্লার প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা দেয় অচালবস্থা। তার আটকের পরপরই বিক্ষুব্দ নেতাকর্মীদের তৎপরতায় কুমিল্লার শাসনগাছা বাস টার্মিনালে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে থানার সামনে অবস্থান নেন বিএনপি নেতা-কর্মী ও তাঁর সমর্থকেরা। কয়েক শ’ নেতা-কর্মী দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন এবং মুক্তির দাবিতে পুরো এলাকায় এক ভয়ার্ত পরিবেশের সৃষ্টি করে। কিন্তু শেষমেষ আটকের ১২ ঘণ্টা পর দলটির নেতাদের জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। মধ্যরাতে ছাড়া পাওয়ার পর তাঁর অনুসারীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস করতেও দেখা যায়। 

আটক ও ছাড়া পাওয়া নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন

আটকের ১২ ঘণ্টা পর দলটির নেতাদের জিম্মায় বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বলা হচ্ছে আটকের ১২ ঘণ্টা পর মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে রেজাউল কাইয়ুমকে। কিন্তু আটকের আগে তাঁর বিরুদ্ধে কুমিল্লার অভিযোগ ছিল শাসনগাছা বাস টার্মিনালসহ একই এলাকায় সিএনজি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের। গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও উঠে আসে শাসনগাছা টার্মিনালসহ বিভিন্ন পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে তাঁর সম্পৃক্ততার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু বাস টার্মিনালই নয়, শাসনগাছাসহ আশপাশের এলাকায় কেউ বাড়ি নির্মাণ বা সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় করতে গেলেও রেজাউলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা চাওয়া হয়। কিন্তু ভয়ে কেউ এসব নিয়ে মুখ খুলতে চান না। কারণ, পুরো এলাকায় রেজাউল ও তাঁর পরিবার বেশ প্রভাবশালী। কিন্তু তারপরেও তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বলা হচ্ছে অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সফিউল আলম রায়হানসহ নেতাদের জিম্মায় রেজাউলকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

কেনো ছেড়ে দেওয়া হলো?

রেজাউল কাইয়ুমকে ছেড়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ তিনি ‘বিএনপি নেতা’। বলা হচ্ছে বিএনপি করার কারণে আওয়ামী লীগ আমলে তার অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ত্যাগি নেতাকে ফাঁসাতের তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়েছে। তা-ই একটি মহল তাকে ফাঁসাতে তার বিরুদ্ধে উপরের মহলকে ক্ষেপিয়ে দিয়েছে। একারণে আটকের পর ছাড়তে হয়েছে, কেননা তার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ দিতেও আসেনি। 

শেষ কথা

চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে বলে বলা হচ্ছে। অভিযান শুরুর একদিনের মাথাতেই একজনকে আটক ও পরে প্রতিবাদ প্রতিরোধের মুখে ছেড়ে দেগওয়া হলো। প্রশ্ন তাকে ছেড়ে দিতে কি সাধারণ মানুষ আকুতি জানিয়েছিল? যাদের মুখে ম্লোগান তারা-তো বিএনপির নেতাকর্মী। সাধারণ জনগণ নয়। আরও প্রশ্ন হচ্ছে এমন নেতাদের বিরুদ্ধে আটকের সময়ে এসে থানায় কে মুখ খুলবে? ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্তদের প্রভাবশালী এই নেতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কে অভিযোগ আনবে? সে বিষয়টি আমলে আনেনি কেউ। অথচ তাকে আটকের আগে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সহজসরল মনে অনেকেই নানা অভিযোগ আনে, নামে রাস্তায়। মিছিল মিটিং করে এই আশায় ছিল যে বিএনপি ক্ষমতায় আছে তা-ই চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছরের শেষের দিকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে যশোরের অভয়নগর উপজেলার আলোচিত বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান জনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে নির্যাতন ও হত্যার হুমকি দিয়ে চার কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আনা হয়। একইসঙ্গে তার সহযোগী চলিশিয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য তুহিনকে আটক করেছে করা হয়েছে। তখন তাকে ছাড়িয়ে নিতে বিএনপি মাঠে নামেনি। কিন্তু কুমিল্লার এই ঘটনায় আটকের পর ছেড়ে দেওয়া নিয়ে নানান ধরনের প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র। প্রশ্ন হচ্ছে বিএনপি কি চাঁদাবাজকে বিরুদ্ধে আওয়ামী স্টাইলে মোকাবেলা করবে? প্রশ্ন দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেই চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলে আটককে ১২ ঘন্টার মধ্যে ছেড়ে দেওয়াকে কি বলা যায়? এটা কি চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি না পিছুটান না হোঁচট?

শেয়ার করুন