ববিতা
অভিনয় জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি বারবার নিজেকে ভেঙেছেন, গড়েছেন। ১৩ বছর বয়সে জহির রায়হানের হাত ধরে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আজ রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত। সম্প্রতি একুশে পদক প্রাপ্তির ঘোষণা শোনার পর ববিতা নিজের ব্যক্তিগত জীবন, চলচ্চিত্র ভাবনা এবং সমসাময়িক নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত পাঠকপ্রিয় দেশ পত্রিকার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলমগীর কবির
প্রশ্ন: ব্যক্তিগত জীবনে আপনি তো একজন মা, একজন বোন। একুশে পদক পাওয়ার খবরটি শোনার পর পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
ববিতা: খবরটি শোনার পর প্রথম যে অনুভূতি কাজ করেছে তা হলো ভীষণ ভালো লাগা। আমার বড় বোন সুচন্দা আর ছোট বোন চম্পা তো খুশিতে আত্মহারা। তবে আমার প্রথম ইচ্ছে ছিল ছেলে অনিককে জানানো। ও এখন কাজের প্রয়োজনে সিয়াটলে আছে, তাই সরাসরি কথা হয়নি। ওকে টেক্সট করে রেখেছি। আসলে আমার পরিবার, আমার বোনরা আর আমার দর্শক-সবার ভালোবাসাতেই তো আমি আজকের ববিতা।
প্রশ্ন: আপনি যখন ক্যারিয়ারের তুঙ্গে ছিলেন, তখন তো আপনার ভীষণ ব্যস্ততা ছিল। ফিরে তাকালে কি কোনো অপূর্ণতা কাজ করে?
ববিতা: একটা বড় আক্ষেপ কিন্তু আছে। আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন সকাল ৮টায় বের হতাম আর ফিরতাম মাঝরাতে। তিন শিফটে কাজ করার ফলে কোনো ছুটি পেতাম না। সাধারণ মানুষ কত আনন্দ করে, ঘুরতে যায়, পিকনিক করে- এগুলো আমি একদমই পাইনি। মনে হতো কত কিছু আমার অজানা থেকে গেল। এখনো যখন নিজের সিনেমা দেখি, মনে হয় এই জায়গাটা আরেকটু ভালো হতে পারত। দর্শক হিসেবে নিজের ত্রুটিগুলো এখন চোখে পড়ে।
প্রশ্ন: আপনার শুরুর দিনগুলোর কথা যদি একটু বলেন, তখন অভিনয়ের অনুপ্রেরণা কী ছিল?
ববিতা: শ্রদ্ধেয় জহির রায়হান সাহেব আমাকে যখন নিয়ে এলেন, তখন বয়স ছিল মাত্র ১৩। সত্যি বলতে, তখন আমাদের কাছে টাকাটা বড় ছিল না। ছিল অভিনয়ের প্রতি তীব্র ক্ষুধা। আমরা চাইতাম শুধু ওপরে উঠতে আর ভালো কাজ উপহার দিতে। সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই আমাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
প্রশ্ন: আপনার ড্রয়িংরুমের দেয়াল তো পুরস্কারে ভরা আটবার জাতীয় পুরস্কার, আজীবন সম্মাননা। এই একুশে পদক কি আপনার কাছে স্রেফ একটি পুরস্কার, নাকি বড় কোনো স্মৃতি?
ববিতা: (দেয়ালের পুরস্কারগুলোর দিকে তাকিয়ে) এই ট্রফিগুলো আমার জীবনের অংশ। চরিত্র আর পুরস্কার-এই দুই মিলিয়েই তো আমি। কোনো একটিকে আলাদা করার উপায় নেই। তবে আমার মনে হয়, অনেক কালজয়ী ছবির জন্য আমি পুরস্কার পাইনি, যেমন শেখ নিয়ামত আলীর ‘দহন’। ছবিটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল। এই যে আজ আমি একুশে পদক পেলাম, এটি আমি আমার মেন্টর জহির রায়হানকে উৎসর্গ করছি। তিনি না থাকলে আমি এত দূর আসতে পারতাম না।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন আপনার চরিত্রগুলো মানুষের মনে দাগ কাটতে পেরেছে?
ববিতা: অবশ্যই। যেমন ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবির সংলাপগুলো কিন্তু মানুষের মুখে মুখে ফিরত। আজও অনেকে ‘আমাদের কোনো কেলাস নাইক্কা’ সংলাপটি বলে। আবার ‘আলোর মিছিল’ করার সময় অনেকেই আমাকে মানা করেছিল রাজ্জাক সাহেবের ভাগনি হতে, কারণ তখন আমরা রোমান্টিক জুটি। কিন্তু আমি ঝুঁকি নিয়েছিলাম এবং দর্শক তা দারুণভাবে গ্রহণ করেছিল।
প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘ এক দশক ধরে বড় পর্দায় নেই। শিল্পী হিসেবে কি নিজেকে আড়ালে মনে হয়?
ববিতা: একজন শিল্পী কখনোই হারিয়ে যান না। বরং বিরতির এই সময়টা একজন শিল্পীকে ভেতরে ভেতরে আরও পরিণত আর শক্ত করে তোলে। মনের মধ্যে একটা ক্ষুধা তৈরি হয় আরও ভালো কিছু করার।
প্রশ্ন: এখনকার নির্মাতারা যদি আপনাকে কোনো চরিত্র অফার করেন, তবে আপনার চাওয়া কী থাকবে?
ববিতা: দেখুন, ভারতে অমিতাভ বচ্চন বা রেখাদের কেন্দ্র করে আলাদা গল্প লেখা হয়। আমাদের এখানে সেটা হয় না। এখানে শুধু ‘ববিতা’ নামটা ব্যবহারের জন্য মা বা খালার চরিত্রে অফার আসে। আমি নামকাওয়াস্তে কোনো কাজ করতে চাই না। যদি কোনো পরিচালক বাস্তবধর্মী এবং বলিষ্ঠ কোনো চরিত্র নিয়ে আসেন, তবেই আমি ফিরব। আমার পৌনে তিন শ’ ছবির যে মর্যাদা, তা আমি নষ্ট করতে চাই না।
প্রশ্ন: নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের জন্য আপনার বিশেষ কোনো পরামর্শ আছে কি?
ববিতা: আমার একটাই কথা শুধু টাকার পেছনে ছুটলে শিল্পী হওয়া যায় না। অভিনয়ের প্রতি একাগ্রতা থাকতে হবে। এখন দেখি গ্রামের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করছে অথচ চোখে কন্টাক্ট লেন্স! এটা তো বাস্তবসম্মত নয়। নিখুঁত শিল্পী হতে হলে ছোট ছোট ডিটেইল নিয়ে ভাবতে হবে।
প্রশ্ন: ইদানীং অনেক শিল্পীই রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ববিতা: আমি মনে করি শিল্পীদের রাজনীতিতে জড়ানো একদম উচিত নয়। একজন শিল্পী যখন রাজনীতিতে নামেন, তখন তার দীর্ঘদিনের অর্জন আর সম্মান অনেক ক্ষেত্রে ম্লান হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় দর্শক তাদের তালির বদলে গালি দিচ্ছে। রাজনীতি অনিশ্চিত জায়গা, আজ যা আছে কাল তা নাও থাকতে পারে। ফলে অনেক সময় শিল্পীর আসল পরিচয়টাই মানুষ ভুলে যায়।
প্রশ্ন: কেউ কেউ মনে করেন রাজনীতি করলে ক্ষমতা বাড়ে। আপনার কি তা মনে হয়?
ববিতা: এটা ভুল ধারণা। একজন রাজনীতিকের ক্ষমতা দল ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত। কিন্তু একজন সত্যিকারের শিল্পীর ক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা দল-মতনির্বিশেষে আজীবন থাকে। শিল্পীর মর্যাদা রাজনীতিকের চেয়ে অনেক বেশি উঁচুতে। তাই আমি সবসময়ই রাজনীতির প্রস্তাব থেকে নিজেকে দূরে রেখেছি।
প্রশ্ন: দেশের এই নতুন পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে আপনার কোনো বিশেষ প্রত্যাশা আছে?
ববিতা: আমি চাই দেশটা সুন্দরভাবে এগিয়ে যাক, যেন কোনো দুর্নীতি না থাকে। আমরা শিল্পীরা যেন নিরাপদে শিল্পচর্চা করতে পারি। এছাড়া এফডিসিকে গতিশীল করা এবং সিনেমা হলের সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে।