২৮ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৪:৫৯:৩৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
অ্যাডভান্সড প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী অগ্রগতি ইসলামবিদ্বেষী গ্রাফিতি ঘিরে মুসলিম কম্যুনিটিতে আতঙ্ক যুক্তরাষ্ট্রে মর্টগেজ সুদের হার ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ইসরায়েল ডে প্যারেড বর্জনের ঘোষণা জোহরান মামদানির ওজনপার্ক মসজিদ আল-আমানের নতুন কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতেই চলবে ভিসা ও অভিবাসন ব্যবস্থা, বললেন রুবিও নিউইয়র্কে ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য এক্সেলসিয়র স্কলারশিপ আবেদন শুরু ৪ লাখ সাশ্রয়ী আবাসনের পরিকল্পনা ঘোষণা মেয়রের উপকূলের ১৯ জেলার প্রাণ-প্রকৃতি ঝুঁকিতে মাহমুদ খলিলকে ডিপোর্ট ঠেকাতে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি


সান ডিয়েগোর মসজিদে হামলায় নিহতদের জানাজায় হাজারো মানুষ
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৮-০৫-২০২৬
সান ডিয়েগোর মসজিদে হামলায় নিহতদের জানাজায় হাজারো মানুষ ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগোয় ভয়াবহ বন্দুক হামলায় নিহত নিরাপত্তাকর্মী আমিন আবদুল্লাহ, স্বেচ্ছাসেবক ও রাঁধুনি মনসুর কাজিহা এবং নাদির আওয়াদ


যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো শহরে অবস্থিত ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগোয় ভয়াবহ বন্দুক হামলায় নিহত তিন মুসলিমকে স্মরণ করতে গত ২১ মে হাজারো মানুষ এক আবেগঘন জানাজায় অংশ নেন। নিহতরা হলেন-নিরাপত্তাকর্মী আমিন আবদুল্লাহ (৫১), মসজিদের দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাসেবক ও রাঁধুনি মনসুর কাজিহা (৭৮) এবং নাদির আওয়াদ (৫৭)। মিশন ভ্যালি রিভার পার্কে অনুষ্ঠিত জানাজার নামাজে ক্যালিফোর্নিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়াও খ্রিস্টান, ইহুদি, শিখ ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা যোগ দেন। স্থানীয় রাজনীতিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন আন্তধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। হাজারো মানুষ দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে জানাজার নামাজ আদায় করেন। নিহতদের কফিন সাদা কাপড় ও নামাজের জায়নামাজে ঢেকে রাখা হয়। পুরো পার্কজুড়ে কান্না, দোয়া এবং ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। পরে তিনজনকে পাশাপাশি একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়। 

গত ১৮ মে দুই কিশোর বন্দুকধারী ইসলামিক সেন্টারে ঢুকে গুলি চালায়। হামলার সময় মসজিদ কমপ্লেক্সে নামাজ, কমিউনিটি কার্যক্রম এবং শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম চলছিল। পুলিশের মতে, হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিল ব্যাপক প্রাণহানি ঘটানো। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, হামলাকারীরা নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার আদলে হামলার পরিকল্পনা করেছিল। তাদের অনলাইন পোস্ট, ভিডিও এবং লেখালেখিতে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী মতাদর্শ ও মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। 

উগ্রবাদ বিশ্লেষক জ্যারেড হল্ট বলেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনলাইনে দীর্ঘদিন ধরে ছড়িয়ে পড়া উগ্র ডানপন্থী প্রচারণা তরুণদের সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণামূলক কনটেন্ট এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তরুণদের দ্রুত চরমপন্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মসজিদের স্বেচ্ছাসেবক হানিফ মোহেবি বলেন, এটিকে কেবল ‘হেট ক্রাইম’ বললে কম বলা হবে। এটি সন্ত্রাসবাদ। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাকে স্বাভাবিক করে তোলার ফল আমরা এখন দেখছি। 

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাকর্মী আমিন আবদুল্লাহ হামলাকারীদের প্রথম প্রতিরোধ করেন। গুলির মধ্যেও তিনি ওয়াকি-টকির মাধ্যমে জরুরি লকডাউন চালু করেন। এতে মসজিদসংলগ্ন স্কুলের প্রায় ১৪০ শিক্ষার্থী নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে থাকতে সক্ষম হয়। অনেকে ক্লাসরুম, আলমারি ও স্টোররুমে আশ্রয় নেয়। শিশুদের জীবনরক্ষা করেই তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। অন্যদিকে মনসুর কাজিহা ও নাদির আওয়াদ গুলির শব্দ শুনে পালিয়ে না গিয়ে অন্যদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। আহতদের সরিয়ে নেওয়া এবং মানুষকে নিরাপদ স্থানে যেতে সহায়তা করার সময় তারাও হামলাকারীদের গুলিতে নিহত হন। 

একজন শোকাহত মুসল্লি বলেন, তারা নিজেদের জীবন বাঁচানোর কথা ভাবেননি। তারা অন্যদের বাঁচাতে জীবন দিয়েছেন। এ কারণেই পুরো সম্প্রদায় তাদের শহীদ ও বীর হিসেবে দেখছে। জানাজায় অংশ নেওয়া আন্তঃধর্মীয় কর্মী সেটচে কোয়ামু-ম্যান বলেন, আজ আমরা শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়াইনি, আমরা ঘৃণা ও শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। ইমাম তাহা হাসানে বক্তব্যে বলেন, ভয় দেখিয়ে আমাদের থামানো যাবে না। এই ট্র‍্যাজেডির মধ্যেও আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব, আমাদের সন্তানদের নিরাপদ রাখব এবং ঘৃণার বিরুদ্ধে মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দেব। 

এদিকে হামলার পর সান ডিয়েগো ও আশপাশের এলাকায় মসজিদগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অনেক মুসলিম পরিবার বলছে, তারা আতঙ্কের মধ্যে থাকলেও নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মুসলিম সংগঠনগুলো এ হামলার পর ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ, ঘৃণামূলক অপরাধ দমনে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং অনলাইনে উগ্রবাদী প্রচারণা ঠেকাতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা দাবি করেছে। 

নিহত আমিন আবদুল্লাহর ছেলে খালেদ আবদুল্লাহ বলেন, আমার বাবা সব সময় মানুষকে রক্ষা করার কথা বলতেন। তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেটাই করেছেন। শিশুদের বাঁচাতে গিয়ে তিনি জীবন দিয়েছেন, এটাই আমাদের গর্ব। জানাজা শেষে অনেক মানুষ নীরবে কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন, কেউ অশ্রুসিক্ত চোখে প্রার্থনা করছিলেন। শোকের ভারী পরিবেশের মধ্যেও একটি অনুভূতি স্পষ্ট ছিল যে ঘৃণা যত বড়ই হোক, মানবতা ও ঐক্যের শক্তি এখনো আরো বড়। 

শেয়ার করুন