০৮ মে ২০২৬, শুক্রবার, ০৫:৫৮:৪১ অপরাহ্ন


প্রথম সংসদ অধিবেশন : জাতীয় অর্জন কতটুকু?
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৬-০৫-২০২৬
প্রথম সংসদ অধিবেশন : জাতীয় অর্জন কতটুকু? জাতীয় সংসদ ভবন


১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলো বিএনপি জোট। বিরোধী দলে জামায়াত এনসিপি জোট। গত ৩০ এপ্রিল শেষ হলো প্রথম সংসদ অধিবেশন। জনমনে প্রশ্ন কতটুকু জাতীয় স্বার্থ উন্নয়ন হলো নির্বাচিত সরকারের অধীনে প্রথম সংসদ অধিবেশনে?

অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের অধিকারের বাইরে অসংবিধানিকভাবে ১৩৭টি অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল। প্রথম অধিবেশনে অধিকাংশ অর্ডিন্যান্স বিল আকারে পাস হয়েছে যার অধিকাংশই জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কি না, সংশয় আছে। কিন্তু সবচেয়ে বিতর্কিত হলো স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ আর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত রাখার আইনি ভিত্তি দান। আইন করে কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনীতি স্থগিত রাখার বিধান নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ। আর এ কাজটি করে নতুন সংসদ তথা সরকার অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির পরিবেশ সংকুচিত করেছে, তার সর্বনাশা প্রতিক্রিয়া সমাজকে বিক্ষুব্ধ করতে পারে অচিরেই।

সরকার ইতিমধ্যে কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে। দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী বিএনপির বিরুদ্ধে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় আসার দাবি করেছে। সেখান থেকেই ২০০১-২০০৬ জোট সঙ্গীদের মধ্যে বিভাজন। এরপর আসে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণ ভোট বিষয়ে বিভাজন। সম্মত জুলাই সনদের বেশ কিছু বিষয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের নোট অব ডিসেন্ট ছিল। নির্বাচনে জয়ী বিএনপির নিজস্ব ইশতেহার ছিল। এমতাবস্থায় সরকার কিছুতেই তাদের দলের ইশতেহারের বাইরে কোনো কিছুতে ব্যবস্থা গ্রহণে সম্মত হয়নি।

ফলশ্রুতিতে ভেস্তে যায় জুলাই সনদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন, দুদক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়া, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। শুরু থেকেই বিরোধী দল নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিষয়ে নেতিবাচক থাকলেও এ বিষয়ে সরকার নীরব থাকে। এ সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা কেলেঙ্কারির জন্য হাম মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল কর্তৃক ইরান আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে দেশে জ্বালানি বিদ্যুৎ হাহাকার সৃষ্টি হলেও সংসদে শুরুতে আলাপ হয়নি। শেষদিকে অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার আলাপ করতে বাধ্য হয়। একটি সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়। দেশে কিন্তু এখনো তীব্র বিদ্যুৎ জ্বালানি সংকট চলছে।

শুরু থেকেই বিরোধী দল ১৯৭২ সংবিধান সংস্কারের নামে খোল নলচে পাল্টে ফেলার উদ্দেশে চাপ সৃষ্টি করে এসেছিল। এখানে ধন্যবাদ দিতে হবে সরকারকে মহান মুক্তিযুদ্ধের ফসল ১৯৭২ সংবিধান সংশোধন করতে সম্মত হলেও সংস্কার করতে সম্মত হয়নি সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের মাত্র কয়েকদিন আগে অবৈধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে. পার্লামেন্টে সেই চুক্তি আলোচনার দাবি এলেও সরকার সম্মত হয়নি। বরং চুক্তি অনুযায়ী সরকার মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ১৪ বিমান সংগ্রহের চুক্তি স্বাক্ষর করে। সুধীসমাজ এবং কয়েকটি রাজনৈতিক দল কিন্তু চুক্তি বাতিলের জন্য দাবি তুলেছে। পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাণিজ্য চুক্তি পুনঃআলোচনার মাধ্যমে সংশোধন বা বাতিল করতে হবে।

যাহোক এভাবেই শেষ হয়েছে প্রথম অধিবেশন। মুক্তি যুদ্ধ নিয়ে নানা বয়ান শোনা গেছে। সংসদে রাজাকার, আল বদর আওয়াজ শোনা গেছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার আমলে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে মব সন্ত্রাস এবং অবমূল্যায়ন বিষয়ে সরকার সংসদে আলোচনা করেনি।

বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দাবি তুলে সংসদের বাইরে আন্দোলন করার ঘোষণা দিয়েছে। আগামী অধিবেশন হবে গুরুত্বপূর্ণ বাজেট অধিবেশন। আবহাওয়া দফতর মারাত্মক হিট ওয়েব, পাহাড়ি ঢল আর অতিবর্ষণে বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধকল সামলানো সহজ হবে না। এর পাশাপাশি সরকারের ওপর দেশ-বিদেশ থেকে ঈস্খঢ়ণ্ড চাপ আছে, রাজনৈতিক অঙ্গনে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার। মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাস খুবই নাজুক সময় যাবে সরকারের। হঠকারিতার কোনো সুযোগ থাকবে না। দেখা যাক, তারেক জিয়া সরকার কীভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে। 

শেয়ার করুন