২৬ মার্চ ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৪:৪১:৫৫ পূর্বাহ্ন


ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলব জেনারেল মাসুদ রিমান্ডে : আতঙ্কে অনেকে
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৫-০৩-২০২৬
ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলব জেনারেল মাসুদ রিমান্ডে : আতঙ্কে অনেকে আদালতে নেয়ার পথে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গায়ে ময়লা পানি নিক্ষেপ


বাংলাদেশে প্রায় ১৯ বছর আগে বহুল আলোচিত ওয়ান ইলেভেনের সময় প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে ব্যাপক আলোচিত অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গত ২৩ মার্চ সোমবার রাতে তাকে তার বারিধারার বাসা থেকে আটকের পর ঢাকার পল্টন থানায় মানবপাচারের একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে উপস্থাপন করা হয় বলে জানিয়েছেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মোঃ শফিকুল ইসলাম। মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেফতারের পর ১/১১ এর সাথে আরো যারা জড়িত তাদের মধ্যে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে যারা রয়েছেন তারা আত্মগোপনে চলে গিয়েছেন। আর আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশে যারা অবস্থান করছেন তাদের মধ্যেও অস্বস্তি বিরাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ১/১১ এর ঘটনা ভুলে যাননি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেফতারই তার প্রমাণ। যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি চান না। কিন্তু যারা অন্যায় করেছে, আইন ভঙ্গ করেছে, সংবিধান লংঘন করেছেন তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় নিয়ে আসবেন। যেই কথা সেই কাজ। একটি সূত্র জানায়, ১/১১ কুশীলবদের মধ্যে মাসুদ উদ্দিন গ্রেফতার হলেও তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজি ফজলুল বারী বর্তমানে আমেরিকায় রয়েছেন ও তখনকার ডিজিএফআইয়ের আরেকজন কর্মকর্তা পরবর্তীতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এটিএম আমিন বর্তমানে দুবাই রয়েছেন। আমেরিকায় রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ফখরুদ্দীন আহমেদ, সেনা প্রধান ম ইউ আহমেদ আমেরিকায় রয়েছেন। জানা গেছে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেফতারে আমেরিকায় যারা রয়েছেন তারা বিচলিত। অন্যদিকে ১/১১ এর সাথে জড়িত ২০ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তা বর্তমানে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। ফেঁসে যেতে পারে অনেকেই। যে কারণে অনেকের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে। কারণ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী রিমান্ডে কার কার বলে দেন, সেটাই দেখার বিষয়।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ফেনীতে ছয়টি ও ঢাকায় পাঁচটি মামলার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে ফেনীতে তিনটি মামলা বিচারাধীন। উনি পলাতক থাকায় আদালত সেখানে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করেছে। অন্য মামলাগুলোরও আমরা তদন্ত করছি- জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

এদিকে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আটক হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থক থেকে শুরু করে অনেকেই ওয়ান ইলেভেন ইস্যু সামনে এনে সামাজিক মাধ্যমে সরব হয়েছেন। তাদের অনেকেই এখনকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ওই সময়ে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ করে সেজন্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেই দায়ী করছেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারিতে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়টিই ওয়ান ইলেভেন হিসেবে পরিচিত।

এই গ্রেফতার গুরুত্বপূর্ণ কেন?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ওয়ান-ইলেভেন সংক্রান্ত বই এক-এগারো’র লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, ওয়ান ইলেভেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওই সময় যে কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা খুবই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি। আর বিএনপি নিজেকে ওয়ান ইলেভেনের ভিকটিম মনে করে। এ কারণেই অনেকে মাসুদ চৌধুরীর গ্রেফতারকে প্রতিশোধ মনে করতে পারেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ আছে এবং সেগুলো আনা হতে পারে।

তখন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার কথা থাকলেও তাকে ঘিরেই রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। এক পর্যায়ে বিচারপতি হাসান নিজেই দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানানোর পর আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মধ্যেই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এরপর বিরোধী দলগুলো এর প্রতিবাদে একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করলে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা দেখা দেয়। এর এক পর্যায়ে সশস্ত্রবাহিনীর হস্তক্ষেপে পদত্যাগ করে জরুরি অবস্থা জারি করেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। দায়িত্ব নেয় ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার।

ওই সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন দিয়েছিল এবং সেই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় গিয়েছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। তবে, ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে তখনকার প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমদের প্রধান উপদেষ্টার পদ এবং তার উপদেষ্টা পরিষদ সদস্যদের পদত্যাগের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। ওই সময় আরও তিনজন সেনাকর্মকর্তা ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন। তারা হলেন- তখনকার নাইন ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, তখনকার ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজি ফজলুল বারী ও তখনকার ডিজিএফআইয়ের আরেকজন কর্মকর্তা পরবর্তীতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এটিএম আমিন। এর মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছাড়া অন্যদের কেউই দীর্ঘকাল ধরে দেশে নেই।

যদিও ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালেই ২০০৮ সালের জুনেই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার করে পাঠানো হয়। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে দুই বার তার মেয়াদ বৃদ্ধি করেছিল। যদিও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়ে দেশ ছাড়ার আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটকে ভূমিকা রেখে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন।

গুরুতর অপরাধ দমন অভিযান সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন

২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি শপথ নেওয়া ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার সে বছরের আটই মার্চ তখনকার উপদেষ্টা এম এ মতিনকে চেয়ারম্যান এবং জেনারেল মাসুদ চৌধুরীকে প্রধান সমন্বয়কারী করে গুরুতর অপরাধ দমন অভিযান সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করেছিল। এই কমিটির সিদ্ধান্তেই শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিককে তখন গ্রেফতার করা হয়েছিল। এমনকি তখন সারাদেশে যৌথ বাহিনীর কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে এই কমিটিও নির্দেশনাতেই। তবে তারও আগে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনেও জেনারেল মাসুদ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে তখনকার সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ তার শান্তির স্বপ্নে বইয়ে উল্লেখ করেছেন।

বইয়ের এক অংশে তিনি লিখেছেন যে তারা তখন প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার জন্য শুরুতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রস্তাব দিলেও তিনি তাতে রাজি হননি। ড. ইউনূস অস্বীকৃতি জানানোর পর ড. ফখরুদ্দীনের নাম উঠে আসে। মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ড. ফখরুদ্দীনের বাসায় যান এবং রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তখন গভীর রাত। আমি ড. ফখরুদ্দীনের বাসায় ফোন করলাম। তিনি সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আমিও তাকে প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে আমন্ত্রণ জানালাম। এই লেখায় মইন ইউ আহমেদ নিজেই জানিয়েছেন যে, ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি নাটকীয়তা, অনিশ্চয়তা ও ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে ঘটনাবহুল একটি দিন শেষ হয়েছিল। যাকে আমি নাইন ইলেভেনের অনুকরণে নাম দিয়েছি ওয়ান ইলেভেন, লিখেছেন সেনা প্রধান আহমেদ। প্রসঙ্গত, নাইন ইলেভেনে যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল, যা পুরো বিশ্বকে ঝাঁকুনি দিয়েছিল।

এই বইতে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভূমিকা প্রসঙ্গে তখনকার সেনাপ্রধান লিখেছেন, ..এ সময়ে দেশের গোয়েন্দা বিভাগ ও সাভার ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী উপদেষ্টা পরিষদ গঠনে সর্বাত্মক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। সাভার ডিভিশনের জিওসি দীর্ঘদিন ডিজিএফআইতে কর্মরত থাকার সুবাধে তার মতামত এ পরিষদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তখন বিএনপি সরকারের সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার গঠন করা হয়, এবং সেই সরকারের সময়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ বিএনপির বহু নেতাকে আটক করা এবং সর্বোপরি সেই সরকারের সময়ে হওয়া নির্বাচনে বিএনপির শোচনীয় পরাজয় হয়েছিল।

দলটির নেতাকর্মীরা মনে করেন, ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির যে নির্বাচন বিএনপির সমর্থনে ইয়াজউদ্দিন আহমদের সরকার করতে চেয়েছিল সেটি এই ওয়ান ইলেভেনের কারণেই বাতিল হয়েছিল। এর ১৯ বছর পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছে। যদিও এই নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আটকের ঘটনার পর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ২৪ মার্চ মঙ্গলবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে ধন্যবাদ। ১/১১’তে গণতন্ত্র হত্যাকারীদের গ্রেফতার শুরু করার জন্য। বিএনপি নেত্রীকে আটক ছাড়াও তারেক রহমানকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। দলটির নেতাকর্মীরা তো মনে করেন এর পেছনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভূমিকা ছিল। সেজন্যই তার গ্রেফতারের পর বিএনপির লোকজন তার বিচার দাবি করছে কিংবা গ্রেফতারকে সমর্থন করছে। সব মিলিয়েই তার এই গ্রেফতার বেশ গুরুত্ব বহন করে, বলছিলেন লেখক মহিউদ্দিন আহমদ।

বিস্তারিত নিচের লিঙ্কে :

https://deshusa.com/m/48725/69c4086baec9a

শেয়ার করুন