আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস (International Day of Action for Rivers) ২০২৬ উপলক্ষে বুড়িগঙ্গা নদীর প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর উদ্যোগে ১৪ মার্চ ঢাকার বসিলা থেকে হাইক্কার খাল পর্যন্ত একটি গণপদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯৭ সালে ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরে অনুষ্ঠিত International Meeting of People Affected by Dams সম্মেলনে নদী ও নদীনির্ভর জনগোষ্ঠী রক্ষার দাবিতে এ দিবস ঘোষিত হয়। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবাদী সংগঠন ও নদীরক্ষা আন্দোলনের কর্মীরা নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করে আসছেন।
ঢাকার প্রাণ হিসেবে পরিচিত বুড়িগঙ্গা নদী বর্তমানে মারাত্মক সংকটে রয়েছে। শিল্পকারখানা, ট্যানারি, ডাইং, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি বর্জ্যের কারণে নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে নদীর পানি কালো হয়ে গেছে এবং তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। নদীর তলদেশে পলি ও বর্জ্য জমে নাব্য কমে যাচ্ছে এবং নদীর তীর ও ভেতরে অবৈধ দখল বেড়েই চলেছে। ফলে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ নদী ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে।
গণপদযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ধরার সদস্য সচিব শরীফ জামিলের সভাপতিত্বে এবং রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি ও উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও ধরার উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার। উদ্বোধনের পর ধরা ও বাংলা মাউন্টেরিং ও ট্রেকিং ক্লাবের সদস্য মাসফিকুল হাসান টনির নেতৃত্বে গণপদযাত্রায় অংশ নেয় প্রায় শতাধিক পরিবেশকর্মী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত থেকে সংক্ষিপ্ত সংহতি বক্তব্য রাখেন-অতিরিক্ত সচিব (অব.) মামুনুর রহমান খলিলি এবং হাওর অঞ্চলবাসীর সমন্বয়ক জাকিয়া শিশির, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, রিভারাইন পিপলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র, গর্জন সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবদুল মাবুদ, এনভায়রনমেন্ট রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের নির্বাহী পরিচালক মনির হোসেন, রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ফাইন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক গোলাম মোস্তফা, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের ম্যানেজার ইকবাল ফারুক, ব্রাইটার্সের সদস্য যুবাইয়ের ইসলাম, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ারের অপারেশন লিড যুবায়ের ইসলাম, অর্গানাইজেশন ফর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট কনজারভেশনের নির্বাহী পরিচালক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, ইয়াং ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক যুধিষ্টির চন্দ্র বিশ্বাস, ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের নির্বাহী পরিচালক রবিউল ইসলাম, বুড়িগঙ্গা নদী মোর্চার আমজাদ আলী লাল, উম্মে সালমা, মোমতাজ উদ্দিন এবং ইশরাত জাহান লতা।
বক্তারা বলেন, দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, আজ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবসে আমাদের নদীগুলোর জন্য সত্যিকার অর্থে কিছু করতে হলে যারা নদী ধ্বংস করেছে এবং যেসব কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে উদাসীন, তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। বাংলাদেশের নদী বাঁচাতে হলে জুলাই আন্দোলনের চেয়েও বড় গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
শরীফ জামিল বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের পূর্বে বুড়িগঙ্গা নদীর প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। আজকের এ গণপদযাত্রার মাধ্যমে আমরা তাকে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। একই সঙ্গে আমরা বলতে চাই, শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কোটি টাকার বাজেট করার জন্য ব্যবসায়িক বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরিকল্পনা না করে আদালতের রায় যথাযথভাবে অনুসরণ করতে এবং নদীপাড়ের স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বক্তারা আরো বলেন, বাংলাদেশের হাইকোর্ট ২০০৯ সালে নদী দখলমুক্ত করার নির্দেশ এবং ২০১৯ সালে নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু এখনো সেই রায়গুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বুড়িগঙ্গা নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করার দাবি জানানো হয়।
আয়োজকরা জানান, আজকের গণ-পদযাত্রা একটি প্রতীকী কর্মসূচি হলেও এটি বুড়িগঙ্গা রক্ষায় ধারাবাহিক আন্দোলনের সূচনা। যতদিন না বুড়িগঙ্গা নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণ ফিরে পাবে, ততদিন এই আন্দোলন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে চলমান থাকবে।
এ কর্মসূচিতে বারসিক, ব্রাইটার্স, বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল, বুড়িগঙ্গা রিভারকিপার, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ার, এনভায়রনমেন্ট রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট।