০৩ জুন ২০২৬, বুধবার, ০৬:০৪:০৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
আরবি ভাষা ও শিক্ষা যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হচ্ছে গ্রিনকার্ডের আবেদন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অপব্যাখ্যার পর পুনঃব্যাখ্যা, মামলার প্রস্তুতি বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে আবারো বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ভিসা : দুইবারের বেশি দূতাবাসে যেতে হবে না অনলাইন জুয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বড়রা এ প্রজন্মকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে খালেদা জিয়ার নামে নামকরণ : তারেক রহমানের ‘না’ সাক্ষাৎকার ছাড়াই দ্রুত আশ্রয় আবেদন বাতিলের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের নিউ জার্সির আইস ডিটেনশন সেন্টারে অমানবিক আচরণের অভিযোগ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আজ ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী


আরবি ভাষা ও শিক্ষা যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হচ্ছে
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৩-০৬-২০২৬
আরবি ভাষা ও শিক্ষা যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হচ্ছে কোরআন ব্লসমসের শিক্ষার্থীরা আরবি বর্ণমালা, কোরআন তেলাওয়াত ও হিফজে অর্জন উদযাপনে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে বার্ষিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে


যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যে সন্তানদের ধর্মীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক শেকড় এবং ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত রাখার প্রবণতা দিনদিন বাড়ছে। সেই লক্ষ্যেই অনেক পরিবার এখন বেছে নিচ্ছে আরবি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সম্পূর্ণ আরবি ভাষার পরিবেশে শিক্ষা দেওয়া হয়। শিকাগোর দক্ষিণ-পশ্চিম উপশহর ব্রিজভিউয়ে অবস্থিত ‘মাস কোরআন ব্লসমস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এ প্রবণতার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে।

লিটল প্যালেস্টাইন নামে পরিচিত ব্রিজভিউ এলাকার হারলেম অ্যাভিনিউতে অবস্থিত স্কুলটি বাইরে থেকে সাধারণ একটি ভবন মনে হলেও মুসলিম পরিবারগুলোর কাছে এটি একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন সকালে স্কুলের দরজায় দাঁড়িয়ে শিশুদের স্বাগত জানান ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত শিক্ষিকা মুয়াল্লিমা আজিজাহ তাহা। প্রায় ১৪ বছর ধরে তিনি একই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার মতে, শিশুরা যখন বাবা-মায়ের কাছ থেকে স্কুলে আসে, তখন তাদের প্রথম প্রয়োজন নিরাপত্তা ও ভালোবাসা অনুভব করা।

স্কুলটির বিশেষত্ব হলো, এখানে শ্রেণিকক্ষে ইংরেজির পরিবর্তে পুরো শিক্ষাক্রম পরিচালিত হয় আরবি ভাষায়। তিন, চার ও পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা আরবি বর্ণমালা, কোরআন তেলাওয়াত, ইসলামী দোয়া, নাশিদ, ক্যালিগ্রাফি এবং মৌলিক একাডেমিক বিষয়গুলো আরবিতেই শেখে। ফলে শিশুরা ভাষাটি শুধু বইয়ের বিষয় হিসেবে নয়, বরং দৈনন্দিন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শেখে।

স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, কিন্ডারগার্টেনে যাওয়ার আগেই অনেক শিক্ষার্থী কোরআনের ৩০তম পারা জুজ আম্মা সম্পূর্ণ মুখস্থ করে ফেলে। এতে রয়েছে ৩৭টি সূরা ও ২ হাজার ৪২৩টি শব্দ। ২০২৬ সালে স্কুলটির ৪২ জন শিক্ষার্থী এই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছে।

কেন বাড়ছে আগ্রহ?

অনেক পরিবার প্রতিদিন ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টারও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সন্তানদের এই স্কুলে নিয়ে আসে। অভিভাবকদের মতে, বর্তমান আমেরিকান সমাজে মুসলিম পরিচয়কে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ করতে হলে শিশুদের শৈশব থেকেই ইসলামের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করা জরুরি। এ প্রবণতার পেছনে সাম্প্রতিক সামাজিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রাখছে।

ব্রিজভিউ সম্প্রদায়ও এ পরিস্থিতির বাইরে নয়। সম্প্রতি দুই ব্যক্তি ওয়েলকাম টু লিটল প্যালেস্টাইন সাইনবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য করে ভিডিও প্রকাশ করলে স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। অনেক অভিভাবক মনে করেন, এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

শুধু আরবদের জন্য নয়

স্কুলটিতে অধ্যয়নরত শিশুদের পরিবার শুধু আরব নয়; বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, ভারতীয়, তুর্কি, আফ্রিকান ও অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরাও রয়েছেন। তাদের অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের আমেরিকান। পণ্য ব্যবস্থাপক ওমর ফারুক, যিনি নিজে আরব নন, বলেন, আরবি কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। এটি বিশ্বের সব মুসলমানের আধ্যাত্মিক ভাষা। ইসলামের ইতিহাসে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন জাতির মুসলমানদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল আরবি।

তিনি জানান, বর্তমানে তিনি নিজেও মসজিদে আরবি শিখছেন এবং প্রায়ই নিজের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ের কাছে শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করতে হয়। অনেক সময় আমি মেয়েকে জিজ্ঞেস করি-ন্যাপকিন আরবিতে কী বলে? কিংবা পাতা শব্দটা কী? তখন সে আমাকে শিখিয়ে দেয়, বলেন তিনি।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বাবরুল হোসেন বলেন, তার মেয়ে মাত্র ১৮ মাস বয়সে স্কুলটিতে ভর্তি হয়েছিল। এখন পাঁচ বছর বয়সী মেয়েটি কোরআনের বহু সুরা মুখস্থ করেছে, আল্লাহর ৯৯টি নাম বলতে পারে এবং নিজে থেকেই সাহরি ও ফজরের সময় ঘুম থেকে উঠতে চায়। তিনি বলেন, আমার মেয়ের আরবি হোমওয়ার্ক বুঝতে গুগল ট্রান্সলেট ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু যখন দেখি সে এতো কিছু শিখেছে, তখন বুঝি আমাদের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।

গবেষণা কী বলছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিভাষিক বা বহুভাষিক শিক্ষা শিশুদের জ্ঞানীয় বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দুই বা ততোধিক ভাষা শেখা শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখা, সমস্যা সমাধান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। কিছু গবেষণায় এমনও দেখা গেছে যে সাত মাস বয়স থেকেই দ্বিভাষিক শিশুদের মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

তবে এ স্কুলের অভিভাবকদের কাছে আরবি শেখার গুরুত্ব কেবল ভাষাগত বা অ্যাকাডেমিক নয়; এটি ধর্মীয় ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

নিউরোলজিস্ট ডা. সাবা সাঈদ বলেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিচয়বোধ তৈরি করা প্রয়োজন। যদি শুরু থেকেই সেই ভিত্তি তৈরি না হয়, তাহলে পরবর্তীতে উদ্বেগ, হতাশা ও আত্মপরিচয়ের সংকট দেখা দিতে পারে। শক্তিশালী ইসলামী পরিচয় মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি সুরক্ষামূলক উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে।

একই মত প্রকাশ করেন স্কুল সাইকোলজিস্ট ইমানি এলদাবলি। তিনি বলেন, শক্তিশালী পরিচয়বোধ থাকা শিশুরা সাধারণত চাপ, বৈষম্য বা সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখেও বেশি দৃঢ় থাকে। তারা জানে তারা কারা এবং কী মূল্যবোধে বিশ্বাস করে।

স্কুলটির অধ্যক্ষ আবির জাবের ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। পাঁচ সন্তানের মা জাবের শিক্ষক হিসেবে ১৩ বছর কাজ করার পর গত সাত বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে স্কুলটি একটি ছোট প্রি-স্কুল থেকে ১১৫ শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং এখন দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

জাবের জানান, আরবি ভাষা, কোরআন, তাজবিদ, ইসলামি শিক্ষা, ক্যালিগ্রাফি ও নাশিদকে সমন্বিত করে স্কুলটির পাঠ্যক্রম তৈরি করতে সাত থেকে আট বছর সময় লেগেছে। বর্তমানে ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে শিক্ষিকা আজিজাহ তাহা মনে করেন, শিশুদের শিক্ষা দেওয়া মানে শুধু তথ্য শেখানো নয়, বরং তাদের হৃদয়ে বিশ্বাস ও ভালোবাসার বীজ বপন করা। তিনি বলেন, প্রথমে আমি তাদের আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা শেখাতে চাই। যখন তারা ভালোবাসা অনুভব করে, তখন শেখার পথ সহজ হয়ে যায়।

তিনি শিশুদের উর্বর মাটির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ধৈর্য, আমানতদারি ও ভালোবাসা একসঙ্গে মিশিয়ে দিলে একটি সুন্দর গাছ জন্ম নেয়। আজ যে বীজ আমরা রোপণ করছি, আগামী দিনে সেটিই ফুল ও ফল দেবে।

মুসলিম অভিভাবকদের মতে, এই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের সন্তানদের কেবল কোরআন মুখস্থ করাচ্ছে না; বরং এমন একটি আত্মপরিচয় গড়ে তুলছে, যা তাদের একই সঙ্গে মুসলিম ও আমেরিকান পরিচয়কে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ করতে সহায়তা করবে। প্রতিদিন ক্লাস শেষে যখন শিশুরা বাড়ি ফেরে, তখনও অনেককে গাড়ির পেছনের আসনে বসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোরআন তেলাওয়াত করতে দেখা যায় যা অভিভাবকদের কাছে এই শিক্ষার সবচেয়ে বড় সাফল্যের প্রতীক।

শেয়ার করুন