২০ মে ২০২৬, বুধবার, ০২:১৯:২৩ অপরাহ্ন


পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প : শুভ উদ্যোগ
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০-০৫-২০২৬
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প : শুভ উদ্যোগ পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প


বিএনপি জোট সরকারের প্রথম মেগা প্রকল্প পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ উদ্যোগকে শুভ কামনা জানাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ১৩ মে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রাক্কলিত ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যায়ের প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট নিরসনে এটিই হচ্ছে সরকারের বড় উদ্যোগ। প্রকল্পটি বাধাহীনভাবে সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হলে উত্তর এবং দক্ষিণ বাংলাদেশ অঞ্চলের ব্যাপক জনগোষ্ঠী নানাভাবে উপকৃত হবে। রক্ষা পাবে বিস্তীর্ণ এলাকা নদীর উজানে থাকা ভারতের ফারাক্কা বাঁধের অশুভ প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট মরুকরণ থেকে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী-এ পাঁচটি নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা হবে। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রথম ধাপে ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ গড়াই-মধুমতী নদী এবং ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার হিসনা নদীব্যবস্থার ড্রেজিং ও পুনঃখননের কাজও করা হবে।

প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১৫টি স্পিলওয়েসহ গড়াই অফটেক, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক ও ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। পাশাপাশি চন্দনা অফটেকে চারটি স্পিলওয়ে, হিসনা অফটেকে পাঁচটি স্পিলওয়ে এবং ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

প্রথম ধাপ বাস্তবায়িত হলে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের অন্তত ১৯টি জেলা ও ১২০টি উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে।

দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।

পদ্মা ব্যারাজের মোট প্রকল্প এলাকা বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা দেশের চারটি বিভাগের ২৬টি জেলার ১৬৩টি উপজেলায় বিস্তৃত। প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১৯টি জেলায় এর প্রভাব পড়বে। 

জেলাগুলো হলো: খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা, ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ, রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলা।

দীর্ঘদিন ধরেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলেও সম্ভবত ভূরাজনীতির প্রভাবে পূর্ববর্তী সরকারগুলো প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সবাই জানে ফারাক্কা বাঁধ উজানে পদ্মা নদীর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করায় একদিকে যেমন পদ্মা এবং শাখা-প্রশাখা নদীগুলোর পানি শুস্ক মৌসুমে শুকিয়ে যাওয়া সেচের পানির অভাবে কৃষি কাজ ব্যাহত হয়। তেমনিভাবে বর্ষাকালে প্লাবন মহাপ্লাবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় ভাটি অঞ্চলে। উপকূল অঞ্চলে সৃষ্ট লবণাক্ততা কৃষির ব্যাপক ক্ষতি, মৎস্য্য সম্পদের ওপর বিরূপ প্রভাব-এমনকি সুন্দরবন বনাঞ্চলের ব্যাপক ক্ষতি করে। উল্লেখযোগ্য যে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারে অন্তর্ভুক্ত আছে। আশা করি, সরকার প্রকল্পটি পেশাদারি দক্ষতায় জনগণকে সম্পৃক্ত রেখে বাস্তবায়ন করবে। এটি হবে বিশাল অর্জন।

নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি সফল ভাবে বাস্তবায়িত হলে আওয়ামী সরকার নির্মিত পদ্মা বহুমুখী সেতুর মত বাংলাদেশের উন্নয়ন আর অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলবে। 

ফ্লাশ ব্যাক 

বিগত কয়েক বছর প্রকল্পটি আলোচনায় আসলেও এ বিষয়ে ধারণা প্রথম উঠে আসে ষাটের দশকে। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রথম সমীক্ষা শুরু করে। এরপর আরো কয়েক দফা করা হয় সমীক্ষা। একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আলোর মুখ দেখছে এ মেগা প্রকল্প।

১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ চূকরে ভারত। ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে পদ্মা নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমেছে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী শুকিয়ে গেছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ সংক্রান্ত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়। ১৯৯৬ সালে হওয়া গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। তবে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের আগেই ১৯৬১ সালে গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা হয়। এ লক্ষ্যে ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে চারটি প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালানো হয়। এরপর ২০০২ সালে কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ী অথবা রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন করা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত থাকে।

প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি পানি নির্গমন পথ, ১৮টি নিম্নস্রোত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, মাছ চলাচলের বিশেষ পথ, নৌযান চলাচলের লক এবং নদীতীর রক্ষাবাঁধ। গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর জন্য তিনটি পানি গ্রহণ কাঠামো নির্মাণ করা হবে। নদী ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে গড়াই-মধুমতি ব্যবস্থায় ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার খনন এবং হিসনা নদী ব্যবস্থায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। এছাড়া ব্যারাজের মাধ্যমে ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জলাধার তৈরি হবে।

শুধু বাঁধ নয়, এ প্রকল্পে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এছাড়া ব্যারাজের ওপর সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে এটিকে বহুমুখী করিডর হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এর ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান এবং ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে।

এ প্রকল্পের মূল বাঁধ বা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশায়। তবে প্রকল্পটিতে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা ও বরিশাল জেলার বিস্তৃত অঞ্চল যুক্ত করা হবে। এসব অঞ্চলে ধাপে ধাপে আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

শেয়ার করুন