তারেক রহমান
রাজধানীতে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে ঈদের পরের দিন ২৯ মে শুক্রবার বিকেলে নিজেই গাড়ি চালিয়ে বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এনিয়ে নানান ধরনের ইতিবাচক নেতিবাচক বক্তব্য দেখা দিয়েছে। সবার আগে প্রশ্ন হচ্ছে একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে কেনো সব তদারকি করতে হবে? সংশ্লিষ্টরা যারা নিজেদের অভিজ্ঞতার বুলিয়ে আউড়িয়ে পদ-পদবি জন্য দৌড়ঝাঁপ দেন তাদের কি দায়-দায়িত্ব নেই। কেনো তাদেরকে খোদ প্রধানমন্ত্রী ঘুম থেকে উঠিয়ে রাষ্ট্রীয় কাজের তদারকি শেখাতে হচ্ছে?
ময়লার হালহকিকত দেখতেও প্রধানমন্ত্রী
বেশ বড়ো ধরনের ঘোষণা দিয়েই ২০ বছর পরে ক্ষমতা পাওয়া বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিরা জোরালো দাবি করে। তারা জানায় যে, পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীকে দ্রুতত কোরবানির বর্জ্যমুক্ত রাখতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছিলো ঈদের দিনেই মোট বর্জ্যরে অর্ধেকের বেশি অপসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু বিধি বাম। রাজধানীতে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রমের অগ্রগতি স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করতে বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আর তা-তেই সব পরিস্কার। ঈদের পরের দিন শুক্রবার বিকেল ৪টা থেকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই গাড়ি চালিয়ে বিভিন্ন রুট ঘুরে দেখতে গিয়েই বিপত্ত বাধে। ধরা পরে নানান ধরনের অসঙ্গতি। কেননা ১২ ঘণ্টার মধ্যে কোরবানির পশুবর্জ্য অপসারণের আগাম ঘোষণার বাস্তবায়ন করতে পারেনি রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন। ২৪ ঘণ্টা পরও রাজধানীর যেখানে সেখানে কোরবানির পশুর বর্জ্য পড়ে আছে। প্রধান সড়কগুলোর অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও অলিগলির অবস্থা খারাপ। ঈদের দিনের বর্জ্যই রয়ে গেছে বিভিন্ন স্থানে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরেই দেখা গেলো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক স্থানেই কোরবানির পশুর বর্জ্য সরানো হয়নি। কোথাও বর্জ্যের স্তুপ, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পশুর উচ্ছিষ্ট অংশ। অথচ দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আব্দুস সালাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, কাজ শুরুর ৮ ঘণ্টার মধ্যেই বর্জ্য অপসারণ করা হবে। অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছিলেন, সরকার নির্ধারিত ১২ ঘণ্টার আগেই কাজ শেষ করা হবে।
ব্যস্তব অবস্থা
কিন্তু বাস্তব অবস্থা ছিল ভিন্ন। কেননা কাউকে কিছু না জানিয়ে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম দেখতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঈদের পরের দিন শুক্রবার বেলা দুইটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত প্রায় চার ঘণ্টা ঢাকার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় গাড়ি চালিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। এসময় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বিশেষ সম্পাদক মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন মৃধা ও প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ মেহেদুল ইসলাম। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালামকে তাঁর বাসার সামনে যেতে বলেন। সেখানে গেলে তিনি তাদেরকে গাড়িগুলো ছেড়ে দিতে বলেন। এরপর তাঁর গাড়িতে উঠিয়ে নেন। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী কেন ডেকেছেন, কোথায় যাবেন, সে বিষয়ে তাদের ধারণা-ও দেওয়া হয়নি। এব্যাপারে গণমাধ্যমে মীর শাহে আলম বলেন, ‘পরে দেখি, তিনি ঢাকায় চলমান বিভিন্ন উন্নয়নকাজ ও কোরবানির পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেমন হচ্ছে, তা সরেজমিনে দেখতে বের হয়েছেন। কয়েকটি এলাকার অবস্থা দেখে তিনি অসস্তোষ প্রকাশ করেন। তারেক রহমানও একটি অনুষ্ঠানে জানান যে তিনি নগরীতে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম ঘুরে দেখেছেন। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা কাজ করছে। অনেক এলাকার বর্জ্য পরিষ্কার করা হয়েছে। তবে বেশ কিছু এলাকায় কাজ বাকি আছে বলে জানান তিনি। বলা হয় পরিদর্শনকালে হাতিরপুল, এলিফ্যান্ট রোড, গ্রিনরোড, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকায় কোরবানির পশুর বর্জ্যরে পাশাপাশি আগের জমে থাকা ময়লা রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জানান, এসব এলাকায় বর্জ্য অপসারণে অবহেলার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। এরপর তাঁর নির্দেশে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন নিয়ে কিছু কথা
এদিকে একটি দেশের খোদ রাজধানীতে ময়লা অপসারণ নিয়ে সে-ই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে মাঠে নামতে হবে কেনো? প্রশ্ন হচ্ছে ঢাকা এতো হাকঢাক দিয়ে যখন ময়লা অপসারণে এই হাল-হকিকত তখন রাজধানীর বাইরে কেনো একের পর এক চমক দেখিয়ে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো রাজধানীবাসীকে যখন দ্রুত বর্জ্য অপসারণে দুই সিটি কর্পোরেশন যখন ব্যর্থতা দেখালো তখন চমক দেখলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। গণমাধ্যমের খবরে দেখা গলো ঈদের দিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর জামালখান ওয়ার্ডের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) সরেজমিনে দেখা যায়, জমে থাকা পশুর বর্জ্য আগেই সরিয়ে নেয়া হয়েছে। যদিও রাত ৮টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল সিটি করপোরেশন। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায় শহরের ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ডেও দেখা যায় একই চিত্র। সেখানে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই বর্জ্য সরিয়ে দুর্গন্ধ দূর করতে ছিটানো হয়েছে ব্লিচিং পাউডার। নগরীর আরও কয়েকটি ওয়ার্ড ঘুরেও একই অবস্থা দেখা গেছে। নগরবাসীর মন্তব্য হচ্ছে , অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার অনেক দ্রুত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। রাস্তাঘাটও পরিষ্কার। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দ্রুত কাজ করছেন। অন্য সময় এখানে অনেক বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়, এবার তা নেই।
চমক দেখালো রাসিকও
এদিকে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয় যে, রাজশাহী মহানগরীতে কোরবানির বর্জ্য নির্ধারিত সময়ের আগেই অপসারণ করে নতুন রেকর্ড গড়েছে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক)। পবিত্র ঈদুল আযহার দিন দ্রুততম সময়ের মধ্যে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করে নগরী পরিচ্ছন্ন রাখার এ সফলতায় নগরবাসীর প্রশংসা পেলেন রাসিক প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন। বলা হয় যে ঈদের দিন বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে একযোগে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু হয়। দুপুরে নগরীর ৯ নম্বর ওয়ার্ডে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন রাসিক প্রশাসক। এছাড়া বিকেলে বুলনপুর এসটিএস, রুয়েট সংলগ্ন এসটিএস, রাবি এসটিএসসহ বিভিন্ন স্থানে চলমান কার্যক্রম ঘুরে দেখেন তিনি।
চমক দেখাতো বাদ গেলো না কেসিসিও
এদিকে খুলনা মহানগরীতে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে নজির গড়েছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। পূর্বঘোষিত সময়সীমা অনুযায়ী মাত্র ৮ ঘণ্টার মধ্যেই নগরীর ৩১টি ওয়ার্ড থেকে কোরবানির বর্জ্য সরিয়ে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়। বলা হয় কেসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দুপুর থেকে শুরু হওয়া অভিযান রাত ১০টার মধ্যেই সম্পন্ন করা হয়। নগরজুড়ে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ করে আগের মতো পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।
সিলেটও এগিয়ে
সিলেট নগরে গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু করে সিলেট সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। তাঁরা প্রথম ৮ ঘণ্টায় ৮০০ টন বর্জ্য অপসারণ করেছেন যা মোট বর্জ্যের ৯৮ শতাংশ বলে সিটি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। তারা ঈদের পরের দিন শুক্রবারও বর্জ্য অপসারণের কাজ চালিয়ে যায়। জানা গেছে ৮ ঘণ্টায় অন্তত ৯৮ ভাগ বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে।
শেষ কথা
ক্ষমতা গ্রহণের পরে ২৯ মার্চ সকাল ৯টায় সচিবালয়ে প্রবেশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্যদিন গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি নিজ দফতরে গেলেও সরাসরি চলে যান সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনে। সেখানে অবস্থিত একাধিক মন্ত্রণালয়ে আকস্মিক পরিদর্শন শেষে নিজ দফতরে বসেন তিনি। সাতসকালে হঠাৎ তাকে দেখতে পেয়ে অনেক কর্মকর্তাও অবাক হয়ে যান। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, মহিলা ও শিশু, স্বাস্থ্য এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনিসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা। এনিয়ে অনেক প্রশংসা পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়। কিন্ত্র প্রশ্ন হচ্ছে আজকের তথ্য প্রযুক্তির যুগে কেনো? কে কি করে তা দেখতে প্রধানমন্ত্রীতে দফতরে দফতরে যেতো হবে? কোনো রাজধানী ময়লা অপসারণ কার্যক্রম তাকেই আড়ালে গিয়ে দেখতে হবে? সংশ্লিষ্টরা কি করছেন বা করেন? কেনো পুরো বিষয়ে একটি সিস্টেশের উন্নয়ন ঘটানো হচ্ছে না? তাহলে বলা যায় যায় না যে ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন রুটে বাসে কেনো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির দাবি, বাস মালিক সমিতির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে রাজধানীসহ সারাদেশে সিটি সার্ভিস ও দূরপাল্লার বাসে ভাড়া নৈরাজ্য চলছে। বলা হচ্ছে ২৬টি রুটের বাসে প্রায় ৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা বাড়তি আদায় করা হয়েছে। তাহলে কেনো এসব তদারকিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে, সচিবেরর তৎপরতা দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তো সেনাবাহিনী বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাতো ঠিকই এসব ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা রেখে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন..। এখন কেনো রাজনৈতিক সরকারের নির্বাহী প্রধানকে মাঠে নেমেই খোঁজ-খবর নিতে হবে? সেক্ষেত্রে কেনো ঈদ আনন্দ উপভোগ শেষে রাজধানীর অন্যতম প্রবেশদ্বার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ফেরা যাত্রীদের ব্যাপক মধ্যে যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেলো তা খোঁজ নিতে কে পথে নেমেছিল? যাত্রীদের অভিযোগ, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে টিকিট কেটেও অনেক যাত্রী ট্রেনে উঠতে পারেননি। আবার যারা উঠতে পেরেছেন তাদের অনেকেই নিজের আসনে বসতে পারেননি। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কেউ কেউ ট্রেনের দরজায় ঝুলে যাত্রা করেছেন। এছাড়া ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ও ছিল। এখন প্রশ্ন সাধারণ জনগণের প্রশ্ন সব কিছুতেই কেনো প্রধানমন্ত্রীকেই মাঠে নামতে হবে? কারো কারো অভিমত এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে যদি প্রধানমন্ত্রীকেই তদারকি করতে হয় তাহলে এর নেতিবাচক দিক অনেক আছে, যা নজীর অতীতে আওয়ামী লীগের আমলে দেখা গিয়েছিল।