২২ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার, ০৮:৫৫:২১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
অবৈধ ট্যারিফ ফেরতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন পোর্টাল চালু হার্ভার্ডে ঈদ উদযাপনের পোস্টকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক মার্কিন কংগ্রেসে লড়ছেন বাংলাদেশি আমেরিকান সিনেটর সাদ্দাম সেলিম মদ্যপানের খবরে দ্য আটলান্টিকের বিরুদ্ধে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মামলা কাশ প্যাটেলের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ প্রার্থীর কারা পেলেন মনোনয়ন উজ্জীবিত নববর্ষ উদযাপন যে বার্তা দিয়ে গেল ২০২৬ সালের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে ১৬ মিলিয়ন অভিবাসী ভোটার আইএমএফ’র শর্তের নেপথ্যে রাজনীতি না অন্যকিছু জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি দিলেও ‘কিছু রাজনৈতিক দল’ জনগণকে বিভ্রান্ত করছে - তারেক রহমান মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পেলেন সেই শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরী


অবৈধ ট্যারিফ ফেরতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন পোর্টাল চালু
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২২-০৪-২০২৬
অবৈধ ট্যারিফ ফেরতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন পোর্টাল চালু ট্যারিফ ফেরতের নতুন অনলাইন পোর্টাল


ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে অবৈধভাবে আদায় করা ট্যারিফ বা শুল্ক ফেরতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার সম্প্রতি একটি নতুন অনলাইন পোর্টাল চালু করেছে। চালু করা পোর্টালটির মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা ট্যারিফ ফেরত পেতে আবেদন করতে পারবেন। উদ্যোগটি এসেছে এ এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গত ফেব্রুয়ারি মাসে এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে ঘোষণা করে যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা আইনগতভাবে বৈধ ছিল না। রায়ের পর থেকেই বিভিন্ন আমদানি-নির্ভর কোম্পানি তাদের পরিশোধ করা শুল্ক ফেরত পাওয়ার জন্য চাপ তৈরি করে আসছিল। সেই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) চালু করেছে নতুন ডিজিটাল সিস্টেম, যার নাম কনসলিডেটেড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড প্রসেসিং অব এন্ট্রিজ-কেপ পোর্টাল।

পোর্টালের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যবসায়ীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে তারা ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট-ভিত্তিক শুল্ক ফেরতের দাবি সহজে জমা দিতে পারবে। সরকার আশা করছে, সিস্টেমের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোম্পানির দাবি প্রক্রিয়াকরণ তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। তবে শুরু থেকেই উদ্যোগকে ঘিরে জটিলতা ও অনিশ্চয়তার কথাও উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও এটি একটি ডিজিটাল অগ্রগতি, বাস্তবে ব্যবসায়ীদের জন্য অর্থ ফেরত পাওয়ার পথ সহজ হবে না।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে মোট প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত শুল্ক ফেরত দিতে হতে পারে। এটি মার্কিন ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য-সংক্রান্ত ফেরত প্রক্রিয়া হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে সিবিপি জানিয়েছে, প্রায় ৮২ শতাংশ ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্টশুল্ক অর্থাৎ প্রায় ১২৭ বিলিয়ন ডলার কনসলিডেটেড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড প্রসেসিং অব এন্ট্রিজ সিস্টেমের আওতায় ফেরতের জন্য যোগ্য হতে পারে। তবে পরিসংখ্যানও সম্পূর্ণ চূড়ান্ত নয়, কারণ বিভিন্ন কেস এখনো পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে এবং অনেক দাবি ভবিষ্যতে অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

 পোর্টাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কে আবেদন করতে পারবে এবং কে পারবে না। সিবিপি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে শুধুমাত্র ইম্পোর্টার অব রেকর্ড বা আনুষ্ঠানিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোই অর্থ ফেরতের জন্য আবেদন করতে পারবে। অর্থাৎ যেসব কোম্পানি সরাসরি পণ্য আমদানি করেছে এবং শুল্ক পরিশোধ করেছে, তারাই কেবল সুবিধার আওতায় আসবে। অন্যদিকে, সাধারণ ভোক্তারা যারা পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা প্রক্রিয়ায় কোনো দাবি করতে পারবেন না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ফেরত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে স্বয়ংক্রিয় নয়। অর্থাৎ কোনো কোম্পানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা ফেরত পাবে না। তাদেরকে নিজ উদ্যোগে কনসলিডেটেড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড প্রসেসিং অব এন্ট্রিজ পোর্টালে লগইন করে আলাদা করে আবেদন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। আবেদন জমা দেওয়ার পর সিবিপি তা যাচাই-বাছাই করবে এবং তারপরই ফেরতের সিদ্ধান্ত নেবে। প্রক্রিয়াকে অনেক বিশেষজ্ঞ অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপহিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, যেহেতু সরকারের কাছেই সব তথ্য বিদ্যমান, তাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত দেওয়া আরো কার্যকর হতে পারতো।

সিবিপি আরো জানিয়েছে যে, আপাতত শুধুমাত্র দুই ধরনের শুল্ক ফেরতের জন্য আবেদন গ্রহণ করা হবে। প্রথমত, যেসব শুল্ক এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি অবস্থায় রয়েছে, অর্থাৎ যেগুলোর চূড়ান্ত হিসাব এখনো সম্পন্ন হয়নি। দ্বিতীয়ত, যেসব শুল্ক গত ৮০ দিনের মধ্যে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। দুই শ্রেণির বাইরে থাকা অনেক দাবি আপাতত সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। ফলে অনেক ব্যবসায়ীই তাদের সম্পূর্ণ পাওনা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

শিল্প বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৩৭ শতাংশ দাবি আপাতত পোর্টালের আওতার বাইরে থাকতে পারে। ফলে অনেক কোম্পানিকে তাদের অর্থ ফেরতের জন্য দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া বা আদালতের শরণাপন্ন হতে হতে পারে। ইতোমধ্যেই হাজার হাজার কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডে মামলা দায়ের করেছে, যেখানে তারা সরাসরি সরকারের কাছ থেকে শুল্ক ফেরতের দাবি জানাচ্ছে।

ফেরত প্রক্রিয়ার সময় নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। সিবিপি জানিয়েছে, আবেদন অনুমোদিত হলে সাধারণত ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। তবে সময়সীমা সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। যদি কোনো আবেদনপত্রে ভুল তথ্য থাকে, বা কাগজপত্র অসম্পূর্ণ হয়, তাহলে প্রক্রিয়া আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফেরত পেতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাস্টমস ব্রোকারদের ভুল তথ্য প্রদান বা ভুল ট্যারিফ কোড ব্যবহার করার কারণে অনেক আবেদন জটিল হয়ে পড়তে পারে। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের সমস্ত নথি সঠিকভাবে প্রস্তুত রাখা এবং আবেদন করার আগে যথাযথ যাচাই করা।

পুরো প্রক্রিয়াকে ঘিরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও তারা মনে করছে, প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্যবসায়িক সংগঠন বলেছে, এটি একটি অগ্রগতি, তবে এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার নয়। তাদের মতে, ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য এত জটিল আবেদন প্রক্রিয়া পরিচালনা করা কঠিন হবে।

অন্যদিকে কিছু বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং হেজ ফান্ড ইতোমধ্যেই একটি বিকল্প পথ তৈরি করেছে। তারা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভবিষ্যতের শুল্ক ফেরতের দাবি কিনে নিচ্ছে এবং বিনিময়ে তাৎক্ষণিক নগদ অর্থ প্রদান করছে। ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা না করেই অর্থ পেয়ে যাচ্ছেন, তবে ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ ফেরত পাওয়ার অধিকার তারা হারাচ্ছেন। অনেক কোম্পানি নগদ প্রবাহের প্রয়োজনের কারণে পথ বেছে নিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি মার্কিন বাণিজ্য ব্যবস্থায় একটি নতুন ধরনের আর্থিক বাজার তৈরি করছে, যেখানে ভবিষ্যতের সরকারি ফেরত দাবিগুলো এক ধরনের সম্পদ হিসেবে কেনাবেচা হচ্ছে। এটি একদিকে ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তির পথ তৈরি করলেও অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

সব মিলিয়ে, কনসলিডেটেড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড প্রসেসিং অব এন্ট্রিজ পোর্টাল চালু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলেও এটি ঘিরে অনিশ্চয়তা ও জটিলতা এখনও রয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা এখন অপেক্ষা করছেন, ডিজিটাল ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং তারা সত্যিই তাদের প্রাপ্য অর্থ দ্রুত ও সহজভাবে ফেরত পান কিনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক মাসই নির্ধারণ করবে পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা সফল বা ব্যর্থ হিসেবে বিবেচিত হবে।

শেয়ার করুন