মধ্যবর্তী নির্বাচনের ময়দানে শরিয়াহ ইস্যু


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 30-09-2026

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ময়দানে শরিয়াহ ইস্যু

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মুসলিমদের ধর্মীয় বিধান শরিয়াহ নিয়ে রিপাবলিকান রাজনীতিকদের বক্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ ও গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর মুসলিম আমেরিকান নাগরিক অধিকারকর্মী, আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ডালাসে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনবিষয়ক সম্মেলনে সিনেটর টেড ক্রুজ বলেন, আমেরিকায় শরিয়াহ আইনের কোনো স্থান নেই। তিনি শরিয়াহর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। এর পরপরই গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট টেক্সাসে শরিয়াহ আইন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

রিপাবলিকান নেতাদের এমন বক্তব্যের জবাবে মুসলিম আমেরিকান নেতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের কাছে শরিয়াহ মূলত ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা ও জীবনযাপনের নির্দেশনার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাদের মতে, শরিয়াহকে শুধু শাস্তি বা রাষ্ট্র পরিচালনার আইন হিসেবে তুলে ধরলে এর প্রকৃত ও বিস্তৃত অর্থ আড়াল হয়ে যায়। ইসলামী পরিভাষায় শরিয়াহ বলতে মুসলমানদের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনযাপনের নির্দেশনাকে বোঝানো হয়। নামাজ, রোজা, হজ, দান-সদকা, ব্যক্তিগত নৈতিকতা, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক আচরণসহ জীবনের বিভিন্ন বিষয় এর আওতায় পড়ে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সমাজে শরিয়াহর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগও এক নয়।

ইলিনয়ভিত্তিক ইসলামি জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ গেইনপিসের পরিচালক সাবিল আহমেদ বলেন, শরিয়াহকে প্রায়ই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। তার মতে, শরিয়াহ শুধু শাস্তির বিষয় নয়; ইসলামে এটি বিশ্বাস, ন্যায়বিচার, দয়া, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি মুসলিমদের প্রতি ক্ষোভ বা বিদ্বেষের পরিবর্তে মানুষকে শরিয়াহর প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে শিক্ষিত করার আহ্বান জানান। তার মতে, মুসলিমদের উচিত সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া।

ইসলামি আইন ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা ইসলামি চিন্তাবিদ আবদুল্লাহি আহমেদ আন-নাইমও যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ নিয়ে চলমান বিতর্কের সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য, মুসলিম আমেরিকানরা একই সঙ্গে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখে আমেরিকান মূল্যবোধ ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যশীল হতে পারেন। অন্যদিকে, রিপাবলিকান রাজনীতিকদের একটি অংশ শরিয়াহকে মার্কিন সংবিধান ও প্রচলিত আইনব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। টেক্সাসের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান কিথ সেলফ ও চিপ রয় ‘শরিয়াহ-ফ্রি আমেরিকা ককাস’ গঠন করেছেন। ককাসের সদস্যরা শরিয়াহ-বিরোধী বিভিন্ন আইন ও উদ্যোগের পক্ষে কাজ করছেন।তাদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ধর্মীয় বিধান দেশটির সংবিধান ও প্রচলিত আইনের বিকল্প হতে পারে না। তারা মনে করেন, মার্কিন আইন ও সাংবিধানিক অধিকার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

তবে মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শরিয়াহকে কেন্দ্র করে এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য মুসলিমদের সম্পর্কে ভয় ও ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। তাদের বক্তব্য, ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিনের একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অংশ এবং মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতাও সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত।

টেক্সাসে সরকারি তদন্ত

শরিয়াহ নিয়ে বিতর্ক শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন ডালাসভিত্তিক ইসলামিক ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন এবং প্রতিষ্ঠানটির কাছে বিভিন্ন নথি চেয়েছেন। প্যাক্সটনের কার্যালয় জানতে চাইছে, প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের বেআইনি বিচারিক ক্ষমতা ব্যবহার করছে কি না, বিদেশি আইন প্রয়োগ করছে কি না কিংবা সরকারি আদালতের মতো ক্ষমতা ব্যবহারের চেষ্টা করছে কি না।

ইসলামিক ট্রাইব্যুনাল অবশ্য এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট করেছে, এটি কোনো সরকারি আদালত নয় এবং এর সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা মুসলিমদের ধর্মীয় ও পারিবারিক বিষয়ে পরামর্শ, মধ্যস্থতা ও ধর্মীয় সালিশের মতো সেবা দিয়ে থাকে। যেসব বিষয়ে আইনগত প্রয়োগের প্রয়োজন হয়, সেগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি আদালতে পাঠানো হয়।

মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির কলেজ অব ল-এর অধ্যাপক আস্মা উদ্দিনের মতে, মুসলমানদের সাধারণ ধর্মীয় আচরণ নামাজ পড়া, পোশাক নির্বাচন, পারিবারিক পরামর্শ নেওয়া কিংবা মসজিদে যাওয়া কখনো কখনো রাজনৈতিকভাবে একটি বৃহত্তর হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

মুসলিম আমেরিকান নেতারা বলছেন, নির্বাচনের আগে শরিয়াহ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য বাড়লেও এ বিষয়ে জনসাধারণের মধ্যে বাস্তব ও তথ্যভিত্তিক ধারণা তৈরি করা জরুরি। তাদের মতে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় আইনব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার। সাবিল আহমেদসহ মুসলিম নেতারা বিভিন্ন মসজিদে আলোচনা ও ওপেন হাউসের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে মানুষকে জানাতে কাজ করছেন। তাদের আহ্বান—ভয় বা রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে মুসলিমদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি করা।

টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ও অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন নর্থ টেক্সাসে মুসলিমদের জন্য প্রস্তাবিত একটি পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। অ্যাবট গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা কেয়ারকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেন।

এছাড়া ডালাস ও হিউস্টনের প্রধান বিমানবন্দরে মুসলিমদের নামাজের আগে অজু করার জন্য ব্যবহৃত স্থান নিয়ে অ্যাবট আপত্তি তুলেছেন। এসব স্থাপনার কারণে বিমানবন্দরগুলোকে দেওয়া তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আগস্টে টেক্সাস স্টেট বোর্ড অব এডুকেশন রাজ্যের সামাজিক শিক্ষা পাঠ্যক্রমে পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, নতুন পাঠ্যক্রমে ইসলামকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের ঝুঁকি রয়েছে।

রিপাবলিকান নেতারা অবশ্য এসব পদক্ষেপকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য হিসেবে দেখছেন না। তাদের বক্তব্য, কোনো ধর্মকে অন্য ধর্মের তুলনায় বিশেষ সুবিধা দেওয়া উচিত নয় এবং শরিয়াহ আইন যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার।

মুসলিম নেতা ও ইসলামি চিন্তাবিদরা এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে, শরিয়াহ মূলত মুসলিমদের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনযাপনের নির্দেশনা; এটিকে একটি বিকল্প সরকারি আইনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামের ধারণাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা। মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরিয়াহ নিয়ে এই বিতর্কও নতুন মাত্রা পেয়েছে। এতে একদিকে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে, অন্যদিকে ধর্মীয় বিশ্বাসকে নির্বাচনী রাজনীতিতে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)