সড়কে ঝরছে তারুণ্য, আইনের বাস্তব প্রয়োগ চান তরুণরাই


বিশেষ প্রতিনিধি , আপডেট করা হয়েছে : 30-09-2026

সড়কে ঝরছে তারুণ্য, আইনের বাস্তব প্রয়োগ চান তরুণরাই

মোটরসাইকেলে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি, সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইনের দাবিতে সংগঠিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সাড়ে সাত বছরে সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন সাত হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যালোচনা বলছে, তাঁদের অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ ৩ হাজার ৮৪১ জন ছিলেন মোটরসাইকেলের চালক বা আরোহী। এই সংখ্যাগুলোর মাঝেই রাজধানীর শ্যামলীতে গত মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জড়ো হয়েছিলেন একদল তরুণ। তাঁদের দাবি, সড়ক নিরাপত্তার জন্য চাই একটি সমন্বিত আইন। আর সেই আইনের পথে তাঁরা শুধু দর্শক থাকতে চান না।

শ্যামলীর আলোচনা সভা

‘সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইনের পক্ষে তরুণদের আহ্বান’ শীর্ষক সভাটি হয় ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের সভাকক্ষে। সঞ্চালনা করেন মিশনের ইয়ুথ ফোরাম ফর হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িংয়ের সমন্বয়কারী মারজানা মুনতাহার। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন মিশনের রোড সেফটি প্রকল্পের সমন্বয়কারী শারমিন রহমান। বিতর্ক, পরিবেশ, স্বেচ্ছাসেবা ও চিকিৎসা, বিভিন্ন ক্ষেত্রের তরুণ সংগঠকেরা আলোচনায় অংশ নেন। ছিলেন বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের মো. ইস্তিয়াক ইমন, মিশন গ্রিন বাংলাদেশের মো. ইফরাত হোসাইন ও স্বেচ্ছাসেবক সমন্বয়কারী মো. আরমান হোসাইন রায়েদ। বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্ট সোসাইটির নওশীন নাওয়ার আচলও বক্তব্য দেন।

সভায় প্যানেল আলোচনার বিষয় ছিল চারটি: নিরাপদ যানবাহন, গতি নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত হেলমেট এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবা। ‘রোড সেফটি আইন কেন দরকার ও তরুণদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলাদা সেশনে সড়ক নিরাপত্তায় তরুণদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

ঝুঁকির কেন্দ্রে মোটরসাইকেল

বক্তাদের মতে, তরুণদের একটি বড় অংশ মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। অতিরিক্ত গতি, হেলমেটের সঠিক ব্যবহার না করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের কারণে সড়কে তাঁদের ঝুঁকি বেশি। বক্তারা ডব্লিউএইচও-র হিসাব উদ্ধৃত করে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা বিশ্বব্যাপী ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মৃত্যুর প্রধান কারণ। দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা ও জরুরি সেবা না পেলে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়ে। দেশের হিসাবও একই দিকে ইঙ্গিত করে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালে ৭ হাজার ৫৮৪টি দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত ও ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হন। মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী মারা যান ২ হাজার ৬৭১ জন, যা মোট নিহতের ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ওই বছর ৯ হাজার ১১১ জনের মৃত্যু হয়েছে, এর মধ্যে মোটরসাইকেল-সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন। দুই সংস্থার মোট সংখ্যায় ফারাক আছে, কারণ তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি আলাদা। কিন্তু মোটরসাইকেল যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা, তাতে দুই হিসাবেই মিল আছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও স্পষ্ট। ১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সি শিক্ষার্থীরা মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে বেশি প্রাণ হারিয়েছেন, আর এমন দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে।

আইন আছে, তবু প্রশ্ন

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এসেছিল সেই বছরের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর। ঢাকায় বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে রাস্তায় নামা শিক্ষার্থীদের চাপেই আগের আইন কঠোর করা হয়। ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর আইনটি কার্যকর হয়, আর বিধিমালা প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২ জানুয়ারি। দুর্ঘটনার পর পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিসকে না জানালে কিংবা আহতের চিকিৎসার ব্যবস্থা না করলে ২০ হাজার টাকা জরিমানা বা এক মাসের কারাদণ্ডের বিধান আছে।

তবু সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা কিছু সংগঠনের অভিযোগ, বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা মূলত পরিবহন ব্যবস্থার আইন। নিরাপদ সড়কের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু বিষয় এতে আসেনি, দুর্ঘটনা-পরবর্তী ব্যবস্থার আলোকেও এটি তৈরি হয়নি। এই ফাঁকটাই ‘সমন্বিত’ আইনের দাবির পেছনের যুক্তি।

বক্তাদের দাবি

আলোচনায় দুটি কথা বারবার এসেছে। প্রথমত, আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি তরুণদের মতামত ও উদ্যোগকে কাজে লাগিয়ে নিরাপদ সড়কের কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

সবশেষে প্রশ্নটা থেকেই যায়। ২০১৮ সালে তরুণরা রাস্তায় নেমে আইন বদলাতে বাধ্য করেছিলেন। আইন এসেছে, কিন্তু মৃত্যুর হার এখনও উদ্বেগজনক। এবার তাঁদের দাবি শুধু নতুন আইন নয়, সেটি সত্যিই মাঠে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তার নিশ্চয়তাও।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)