ওহাইও স্টেটের লোরেইন কাউন্টির একটি মসজিদে রমজান মাসে ভয়াবহ হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে ভ্যালি সিটির ২০ বছর বয়সী ওয়াট ব্রজস্কার বিরুদ্ধে ফেডারেল মামলা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের দাবি, ব্রজস্কা কলাম্বিয়া স্টেশনের উম্মাহ সেন্টার ইসলামিক সেন্টার ও স্কুলে হামলার প্রস্তুতি হিসেবে নজরদারি চালান, অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ সংগ্রহ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক হুমকিমূলক বার্তা ও ভিডিও প্রকাশ করেন।
ব্রজস্কাকে গত মার্চে গ্রেফতার করে এফবিআই। আদালতে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, তার পরিবারের ভ্যালি সিটির বাড়ির একটি শোবার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র, প্রায় ৭০০ রাউন্ড গুলি, ট্যাকটিক্যাল ভেস্ট, গ্লাভস, একটি মুখোশ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা একটি রাইফেলে নাৎসি প্রতীকও দেখা যায় বলে প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন।
তদন্তকারীদের দাবি, ব্রজস্কা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমেই সহিংস ও হুমকিমূলক বক্তব্য প্রকাশ করছিলেন। এফবিআই তার বিষয়ে প্রথম সতর্ক হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরে, যখন তার টিকটক অ্যাকাউন্টে সম্ভাব্য গণহামলার হুমকির বিষয়ে একটি টিপ পাওয়া যায়। এরপর মেডিনা কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সে সময় ব্রজস্কা তার পোস্টগুলোকে ‘জোকস’ এবং মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখার একটি উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, এরপরও তার অনলাইন কার্যক্রম আরো সহিংস হয়ে ওঠে।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, ব্রজস্কা ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে হামলা চালানো বন্দুকধারী ব্রেন্টন ট্যারান্টের প্রতি আগ্রহ ও প্রশংসা প্রকাশ করেছিলেন। ওই হামলায় ৫১ জন নিহত হন। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ব্রজস্কা তার কথাবার্তা ও অনলাইন পোস্টে ট্যারান্টের হামলার চেয়েও বেশি মানুষ হত্যার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছিলেন। তার পোস্ট ও ভিডিওতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যও ছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
মার্চে হামলার পরিকল্পনা আরো এগিয়ে নেওয়ার সময় ব্রজস্কা উম্মাহ সেন্টারকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করেন বলে অভিযোগ। একটি ভিডিওতে তাকে সামরিক ধাঁচের পোশাকে গাড়ির ভেতর থেকে মসজিদটির দিকে ক্যামেরা তাক করতে দেখা যায়। ভিডিওটির সঙ্গে ‘ইউ উইল ফিল ইট’ লেখা ছিল বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা আরো দাবি করেছেন, তিনি মসজিদটির গুগল ম্যাপসের ছবি সংগ্রহ করেছিলেন এবং ভবনের পেছনের বের হওয়ার পথ সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। এমনকি হামলার সময় ওই পথ গাড়ি দিয়ে আটকে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছিলেন বলে প্রসিকিউটরদের অভিযোগ।
মামলার তদন্তে ইউটাহর ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর সঙ্গে ব্রজস্কার অনলাইন কথোপকথনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্রজস্কা ওই কিশোরীকে মসজিদে হামলার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি হামলার জন্য অতিরিক্ত গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ সংগ্রহের কথাও বলেছিলেন বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। কিশোরীটি তদন্তকারীদের আরো জানিয়েছে বলে নথিতে বলা হয়েছে যে, ব্রজস্কা বিভিন্ন সময় মসজিদ, স্কুল ও গির্জায় হামলা এবং প্রতিবেশীদের গুলি করার মতো কথাও বলেছিলেন।
তদন্তকারীদের মতে, গ্রেফতারের আগের দিনগুলোতে ব্রজস্কা তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আরো প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার ওপর নজর রাখছিল এবং তার কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছিল বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার কাছে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য, অস্ত্র সংগ্রহের সক্ষমতা এবং হামলা চালানোর উদ্দেশ্য এ সবকিছুরই প্রমাণ পাওয়া যায়। এফবিআই সময়মতো তাকে গ্রেফতার না করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারত বলেও প্রসিকিউটররা আদালতে যুক্তি দিয়েছেন।
ঘটনাটি রমজান মাসকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করে। উম্মাহ সেন্টারে রমজান উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল বলে জানা গেছে। কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস, ওহাইওর নির্বাহী পরিচালক ফাতেন ওদেহ বলেন, হামলাটি বাস্তবায়িত হলে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ নিরীহ মুসল্লিদের ওপর ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারত। তিনি বলেন, এ ঘটনা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর ভয় ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পরবর্তী সময়ে ব্রজস্কার বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে হুমকিমূলক যোগাযোগের তিনটি অভিযোগ আনা হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি গ্র্যান্ড জুরির মাধ্যমে ইনডাইটমেন্টের পরিবর্তে ইনফরমেশনের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণে সম্মতি দিয়েছেন। কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটির আইন অধ্যাপক মাইকেল বেনজা মনে করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য প্লি অ্যাগ্রিমেন্টের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে কোনো সমঝোতা হয়ে থাকলে তার বিস্তারিত শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বেনজার মতে, মামলাটিতে কারাদণ্ডের সম্ভাবনা রয়েছে। তার মতে, হুমকির মাত্রা, একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে অন্যদের নিরুৎসাহিত করার প্রয়োজনীয়তা আদালতের সাজা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। তবে মামলার চূড়ান্ত পরিণতি আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম ও সম্ভাব্য প্লি অ্যাগ্রিমেন্টের ওপর নির্ভর করবে।
কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস, ওহাইও মামলাটির অগ্রগতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করার কথা জানিয়েছে। সংগঠনটি ফেডারেল কর্তৃপক্ষকে ব্রজস্কার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আরো গুরুতর অভিযোগ বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, একটি মসজিদে সম্ভাব্য গণহামলার পরিকল্পনার অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়টি কঠোরভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
এদিকে ব্রজস্কার আইনজীবী মামলাটি নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেননি এবং মার্কিন অ্যাটর্নির কার্যালয়ও চলমান আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি। তবে তদন্ত ও আদালতের নথিতে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ব্রজস্কার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ছিল গুরুতর এবং সম্ভাব্য হামলার আগে তাকে গ্রেফতার করা যাওয়ায় একটি বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে তারা মনে করছে। তবে ব্রজস্কার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনত নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।