২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির শীর্ষ ৭ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামির অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীসহ তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেছে। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। মৃতুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামি হলেন- ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সব আসামিই পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় দায়েরকৃত সপ্তম মামলার রায় এটি।
৫০ শতাংশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছে- আসামি ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ এবং মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক (৫০ শতাংশ) বাজেয়াপ্ত করা হলো এবং ওই সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ অর্থ হতে জুলাই বা আগস্ট ২০২৪ সময়কালে নিহত ও আহত সকল ব্যক্তি বা তাদের পরিবারবর্গকে জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেয়া হলো। আইনানুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের এই রায় প্রকাশিত হওয়ার পর ৩০ দিন পর্যন্ত আসামিদের আপিল করার সুযোগ থাকে। এই ৩০ দিন পর্যন্ত কোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা অন্য কোনো ব্যবস্থায় যাওয়ার হয়তো সুযোগ নাই। কিন্তু ৩০ দিন পর থেকে বাংলাদেশ সরকারের এই রায় বাস্তবায়ন করতে কোনো বাধা নেই।বাংলাদেশ সংবাদ
রায়ের প্রতিক্রিয়া
রায় প্রদানের পর নিজ দপ্তরে ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আসামিদের নির্মম ও নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডের কারণে সারা বাংলাদেশে ছাত্র-জনতাসহ প্রায় ১,৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন, প্রায় ২৫,০০০ মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করেছেন এবং অসংখ্য পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা এই রায়ের জন্য শুকরিয়া আদায় করছি। তিনি বলেন, এই মামলায় সর্বমোট ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। একজন সাক্ষী-যিনি আমাদের মরহুম হাদি-তার বক্তব্যটাকে ১৯-এর ৪ ধারায় আদালতে এভিডেন্স (সাক্ষ্য) হিসেবে নেয়া হয়েছিল। সে হিসেবে আমরা মোট ৩০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য বলতে পারি। উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আজকে এ মামলায় রায় ঘোষণা করা হলো।
আসামিদের বর্তমান অবস্থানের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য এই মুহূর্তে নেই জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, যেহেতু তারা এখন দণ্ডপ্রাপ্ত, তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হলে তাদের গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মোহাম্মদ আলী আরাফাত বিচার প্রক্রিয়ার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এমন মন্তব্যের প্রেক্ষিতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তিনি বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। বিচারকার্য চলমান থাকা এবং প্রসিডিংস থাকা সত্ত্বেও তারা আদালতে এসে তা মোকাবিলা করেননি; বরং পলাতক রয়েছেন। পলাতক অবস্থায় এমন মন্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই পালিয়ে আছেন এবং তারা অপরাধ করেছেন বলেই পলাতক। আইনগতভাবে পলাতক থাকা অবস্থায় তাদের এমন কোনো বক্তব্যের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। এই মামলায় পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আপিলের সুযোগ থাকলে ভিন্ন ফল আসতো
এদিকে, ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তুষ্ট নন রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের দুই আইনজীবী। রায়কে সম্মান জানালেও তারা মনে করেন, আপিলের সুযোগ থাকলে ভিন্ন ফল আসতে পারতো। রায়ের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ প্রতিক্রিয়া জানান রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম ও ইসরাত জাহান।
আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম বলেন, বিচারপতিদের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে মন্তব্য করার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই। আদালতের প্রতি আমরা সর্বোচ্চ সম্মান জানাই। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট নই। আপিল করার সুযোগ থাকলে সেটি করা উচিত ছিল। আপিলে হয়তো আমরা আরও ভালো কোনো ফলাফল পেতে পারতাম। রাষ্ট্রনিযুক্ত আরেক আইনজীবী ইসরাত জাহান বলেন, আমরা ট্রাইব্যুনালের রায় মানি ও সম্মান করি। কিন্তু এই রায়ে আমি সন্তুষ্ট নই।
নীরব প্রতিবাদ আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের
সাত শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিবাদে নীরব অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। এদিন দুপুর দেড়টার দিকে সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের এডভোকেট লাউঞ্জের সামনে একদল আওয়ামীপন্থি আইনজীবী জড়ো হয়ে এ প্রতিবাদ জানান। এ সময় তাদের কোনো স্লোগান দিতে দেখা যায়নি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন আইনজীবীকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে শোনা যায়।
ককটেল বিস্ফোরণ
মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরপরই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির গেটের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে কে বা কারা ককটেল ছুড়ে পালিয়েছে, তৎক্ষণাৎ বলতে পারেননি দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। রায়ের পর বেলা ১টা ১৫ থেকে ১টা ২০ মিনিটের মধ্যে মোটরসাইকেলে করে দু’জন ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টের মূল ফটকের সামনে সড়কে ককটেল ছুড়ে পালিয়ে যান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, চলন্ত একটি মোটরসাইকেল থেকে ককটেলটি ছোড়া হয়। কদম ফোয়ারার দিক থেকে এসে ককটেল ছুড়ে মোটরসাইকেলটি মৎস্য ভবনের দিকে চলে যায়। এদিকে ককটেল ছোড়া দু’জন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে বিস্ফোরণকারী দু’জনকে চিহ্নিত করা গেছে। তারা আওয়ামী লীগের দুষ্কৃতকারী কেউ হতে পারেন। সরকার এ বিষয়ে তদন্ত করছে।