ঢাকা নগর পরিকল্পনায় সরকারগুলোর দূরদর্শিতার অভাব, দুর্নীতিগ্রস্ত অদক্ষ ব্যাবস্থাপনা আর সব পর্যায়ে দুর্বৃত্তায়নের কারণে নগরে বসবাস পড়েছে গভীর সংকটে। একসময়ের তিলোত্তমা ঢাকা এখন পরিণত হয়েছে বসবাসের জন্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান অনুপযোগী মহানগরে। যানজট, জনজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত ঢাকা মহানগরী।
এবারের ঢাকা সফরে স্মরণকালের সবচেয়ে অস্বস্তিকর যান জটের অভিজ্ঞতা হলো। একবার নয়াপল্টনের এনার্জি পাওয়ার কার্যালয় থেকে বিকাল ৪টায় রওনা করে উত্তরায় পৌঁছতে সময় লাগে পাঁচ ঘণ্টা। মহাখালীর বাংলাদেশ টোব্যাকোর কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডের কারণে তীব্র যানজট দেখা দেয় শহরজুড়ে। শুনেছি, অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ধানমন্ডি এলাকায়ও। এমনিতেই সপ্তাহের শেষদিনে যানজট হয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় মহানগরীর রাস্তাঘাটগুলো যানজটে স্থবির হয়ে পড়ায় দুর্ভোগে পরে নগরবাসী। হয় জ্বালানির অপচয়, গ্রিন হাউস গ্যাস এমিশন। শহরজুড়ে উড়াল সড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে আর মেট্রোরেল থাকা সত্ত্বেও সড়ক মহাসড়কে যান বাহন চলাচলে ন্যূনতম শৃঙ্খলা না থাকাকে যানজটের অন্যতম কারণ বলা যেতে পারে। আর মহানগরে জল নিষ্কাশনের অবকাঠামো নাজুক থাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই হয় জলজট। মহানগর জুড়ে লাখ লাখ বিভিন্ন ধরে যানবাহন এলোমেলো চলাচল করায় নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থার সৃষ্টি নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কবে কীভাবে যানজট থেকে মুক্তি মিলবে কেউ কিছু বলতে পারে না। তবে যান জটের অভিশাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কর্মঘণ্টার অপচয়, দূষিত বাতাসে অসুস্থ হয়ে পড়ে নারী, শিশু-বয়স্ক মানুষেরা। শুধু পরিকল্পিত যান চলাচল ব্যবস্থা, কতিপয় অজনপ্রিয় অথচ কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন বিকল্পহীন।
সুপারিশসমূহ
সপ্তাহের শেষদিন অথবা কোনো লম্বা ছুটির আগের দিন ছুটির সময় স্টেগারিং করে যানজট কমানো। ঢাকায় চলাচল কৃত যানবাহন চলা চল সীমিত করার জন্য ছুটির আগের দিন দুপুর থেকে মাঝরাত পর্যন্ত মহানগরীতে কয়েক ধরনের যান চলাচল স্থগিত করা। সড়ক মহাসড়কজুড়ে দাপট সৃষ্টি করা ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রিত করা।
এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে এবং ঢাকা মেট্রোর অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করা। দুটো এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে দ্রুত সংযুক্ত করা। গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত মহানগর বাইপাস সড়ক এবং বালু, তুরাগ এবং বুড়িগঙ্গা নদীর তীর বরাবর সিটি সার্কুলার সড়ক নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ করা। বিমান বন্দর থেকে মহানগরীর কেন্দ্রে আসার একমাত্র সড়কের বিকল্প সড়কগুলো চালু হলে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ থেকে আসা দক্ষিণ বাংলা অথবা দক্ষিণ পূর্ব বাংলাদেশ অভিমুখী যানবাহন গুলোকে ঢাকার কেন্দ্রস্থলে যেতে হবে না।
কিছু স্থাপনা স্থানান্তর করার সুপারিশ
জাতীয় স্বার্থে কেন্দ্রীয় সচিবালয়, বিজেবি সদর দফতর, মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, পুরান ঢাকা বিমানবন্দরের সামরিক স্থাপনা নগরের বাইরে স্থানান্তরিত হলে যানজট অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থল এবং সদর দফতর ঢাকার কেন্দ্রস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। ডিজিটাইজেশনের রমরমা সময়ে যথাসম্ভব ডিজিটাল সভার মাধ্যমে অধিকাংশ কাজ সমাপ্ত করা যেতে পারে। কূটনীতিকদের আবাসস্থল ঢাকার ঘনবসতি পূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। ধানমন্ডি, বনানী, গুলশান, উত্তরার মতো ঢাকার অভিজাত এলাকায় সন্ধ্যার পর অসংখ্য ভোজনরসিক মাঝরাত পর্যন্ত সড়কগুলো অবরুদ্ধ করে রাখে। জানি না, এ দুর্ভোগ থেকে কীভাবে ঢাকা মুক্ত হবে। জানি না, মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিত এলাকায় সীমিত সময়ের জন্য পর্যায়ক্রমিকভাবে সন্ধ্যার পর থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ লোডশেডিং করা যেতে পারে। ঢাকায় গ্যাস বিদ্যুৎ সমস্যা নিয়ন্ত্রিত হলে নগরবাসীদের মাঝে ঢাকার বাইরে বসবাসের (রিভার্স মাইগ্রেশনের) তাড়না সৃষ্টি হবে। ২-২.৫ কোটি মানুষের বিশাল বোঝা বহন করা ঢাকা মহানগরীর জন্য দুরূহ হয়ে পড়েছে। ভেঙে পড়ছে সকল প্রকার নাগরিক সেবা ব্যবস্থাপনা। পরিকল্পিতভাবে ঢাকা থেকে ৩০-৪০ শতাংশ জনগণ ঢাকার সন্নিহিত জেলাগুলোতে সরে না গেলে ক্রম বৃদ্ধি পাওয়া ঢাকা জনগণের ভোগান্তি দূর করা সম্ভব হবে না। সরকার কিছুটা উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে জয়দেবপুর, ঢাকা নারায়ণগঞ্জের মধ্যে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে অনেক মানুষ পার্শবর্তি এলাকায় চলে যাবে। এতে নগর যানবহনের ওপর চাপ কমলে যানবাহনও কমে যাবে। একই সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ, ফিটনেস ও কাগজপত্রবিহিীন লাখো যানবাহন যারা বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে রাজধানীতে ও রাজধানী থেকে ছেড়ে বিভিন্ন গন্ত্যেব্যে যাতায়াত করে সেগুলো রিমুভ করলেও চাপ কমতে পারে।
আশা করি, দ্রুত সরকার জনস্বার্থে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীকে বসবাসের জন্য সহনীয় করে তুলবে।