রাজধানীসহ সারা দেশের আনাচ-কানাচে এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট। গ্রামের মেঠোপথজুড়ে অটো বেশ মানানসই ও সহজলভ্য যাতায়াত ব্যবস্থা হলেও প্রথম শহরগুলোতে এ অটো এখন এক মরণফাঁদ। এদের বেপরোয়া গতি কেড়ে নিচ্ছে মানুষের জীবন। মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়ানোর জন্য ঘটছে বড় সব দুর্ঘটনা।
একদিকে কম খরচে ও সহজে যাতায়াতের সুবিধা, অন্যদিকে বেপরোয়া গতি, ঘন ঘন দুর্ঘটনা এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ চুরির অভিযোগ—দুইয়ে মিলে এটি এখন ঢাকা শহরসহ দেশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সস্তা ও সহজলভ্য হলেও এর পেছনে গড়ে উঠেছে এক বিশৃঙ্খল ব্যবস্থা, যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন।
অটোরিকশার উত্থান ও পেছনের ইতিহাস
দুই দশক আগেও দেশের শহরাঞ্চলে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল মানুষের শারীরিক পরিশ্রমে চালানো পায়ে চালিত ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল রিকশা। ২০০৮-১০ সালের দিকে চীনা প্রযুক্তির মোটর ও ই-বাইক ব্যাটারি ব্যবহার করে এসব হাতে-চালিত রিকশাকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় রূপান্তর করা শুরু হয়। খুব অল্প সময়েই শারীরিক কষ্ট কমানো ও দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ হওয়ায় চালক ও যাত্রী—উভয়ের কাছেই এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে এ বাহনের দ্রুত প্রসারের সাথে সাথে অনিয়মও জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিআরটিএর রেজিস্ট্রেশন বা চলাচলের নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও নামসর্বস্ব কিছু সংগঠনের ব্যানারে কিউআর কোড বা টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে গড়ে ওঠে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট। ইতিপূর্বে হাইকোর্ট ও সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ একাধিকবার প্রধান সড়কগুলো থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের নির্দেশ দিলেও চালক ও স্থানীয় সিন্ডিকেটের আন্দোলন, বিক্ষোভ এবং জীবিকার দাবির মুখে পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ কখনোই সম্ভব হয়নি।
সংসদে অটোরিকশা সংকট ও বিদ্যুৎ অপচয়ের চিত্র
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য রেহেনা আক্তার রানুর এক নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন। সংসদে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। দেশে চাহিদার বিপরীতে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি। অথচ কেবল ঢাকাতেই প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট গড়ে উঠেছে। এসব স্থানে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করার ফলে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং জাতীয় গ্রিডে মারাত্মক চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে দেশজুড়ে ব্যাপক চাহিদার বিদ্যুৎ এখন অটোর পেটে ঢুকছে অবৈধভাবে।
রাজধানীতে নতুন চালু হওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ট্রাফিক ক্যামেরায় অন্যান্য যানবাহনের গতিসীমা লঙ্ঘন বা লেন ভাঙার অপরাধ শনাক্ত হলেও, অটোরিকশার কোনো নম্বর প্লেট না থাকায় এদের জরিমানা বা আইনি শাস্তির আওতায় আনা যাচ্ছে না। ফলে অসহায় হয়ে পড়েছে ট্রাফিক পুলিশ। ব্যর্থ হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি।
নিরাপত্তা ও চালকদের জীবিকার দ্বিমুখী সংকট
অটোরিকশার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ব্রেক ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে প্রধান সড়কগুলোতে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। তা সত্ত্বেও লাখ লাখ চালকের আত্মকর্মসংস্থান ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে এর গুরুত্বও অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এ প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের চলাফেরাতে নাভিশ্বাস উঠেছে।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, চালকদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই একটি নতুন নীতিমালা ও বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে, যা শিগগির বাস্তবায়ন করা হবে।
নতুন নীতিমালায় যা থাকছে
সরকারের পরিকল্পনায় অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে বেশ কয়েকটি বড় পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
১. চালক নিয়ন্ত্রণ ও নিবন্ধন: চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা।
২. নির্দিষ্ট রোড নির্ধারণ: প্রধান সড়ক বা মহাসড়ক এড়িয়ে নির্দিষ্ট গলি বা সংযোগ সড়কে চলাচলের লেন নির্ধারণ করা।
৩. পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ প্রযুক্তি: যান্ত্রিক ত্রুটি কমাতে পরিবেশ উপযোগী ব্যাটারি ও উন্নত কাঠামো নিশ্চিত করা।
৪. অবৈধ চার্জিং বন্ধ: অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ করে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট বৃদ্ধি করা।
সড়কের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে লাখ লাখ চালকের রুটি-রুজির সমতা রক্ষা করা—সরকারের নতুন এই নীতিমালার বাস্তবায়নের ওপরই এখন নির্ভর করছে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।