কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্সে পড়তে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন মহসিন শাহেদ রানা (৩৭)। স্বপ্ন ছিল পেশাদার তথ্য প্রযুক্তিবিদ হবেন। তারপর কাজের সুযোগ থাকলে স্থায়ী বসবাসের জন্য থেকে যাবেন নতুবা দেশে ফিরে ক্যারিয়ার গড়বেন। ভিসার ক্যাটাগরি পরিবর্তন করে স্থায়ী বসবারের অনুমতি মিললেও মাস্টার্স শেষ করতে পারেননি তিনি। দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয়ে রানার সেই স্বপ্নও মরদেহের সঙ্গে কফিন বন্দি হয়ে ফিরেছে তার প্রিয় মাতৃভূমিতে।
বাংলাদেশ সময় গত ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় নামাজে জানাজা শেষে তাকে সমাহিত করা হয় ঢাকার সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের ভাকুর্তা কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমান বন্দর থেকে রানার মরদেহ দেশের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। গত ৬ সেপ্টেম্বর বিকালে মরদেহ ঢাকায় পৌঁছে।
গত ২২ আগস্ট রাত ২টা ২৪ মিনিটে টেনেসির বেলস্ সিটিতে পেট্রোল পাম্পের কনভেনিয়েন্স স্টোরে কর্মস্থলে দুর্বৃত্তের গুলিতে খুন হন ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের ভাকুর্তা গ্রামের মহসিন শাহেদ রানা। দীর্ঘ আইনি প্রকৃয়া শেষে তার মরদেহ টেনেসি থেকে নিউইয়র্কে আনা হয় বাংলাদেশে প্রেরণের জন্য।
বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির তত্ত্বাবধানে মরদেহ বাংলাদেশে প্রেরণের জন্য গত ১ সেপ্টেম্বর মাগরিবের নামাজের পর ব্রুকলিনে বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টারে মহিসন রানার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় শোকার্ত প্রবাসীরা অংশগ্রহণ করেন। জানাজা নামাজ পরিচালনা করেন বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টারের খতিব মাওলানা রুহুল উল্যাহ।
জানাজার আগে মহসিন রানার পরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলেন বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির সভাপতি জাহিদ মিন্টু। এসময় কমিউনিটির নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান নাজমুল হাসান মানিক, ট্রাস্টি গোলাম সারোয়ার, খোকন মোশারফ, উপদেষ্টা মাইনুল উদ্দিন মাহবুব, আব্দুল মালেক খান, সহ-সভাপতি তাজু মিয়া, সেক্রেটারি এএসএম মাইনউদ্দিন পিন্টু, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সেক্রেটারি রুহুল আমিন সিদ্দিকী, ঢাকা জেলা সমিতির সাবেক সভাপতি বাসেত রহমান প্রমুখ।
জানাজার পরবর্তী সময়ে দেশিজ রাইজিং অ্যান্ড মুভিংড্রামের পরিচালক কাজী ফৌজিয়ার নেতৃত্বেও ড্রামের সদস্যরা মসজিদের সামনে মহসিন রানার জন্য তহবিল সংগ্রহ করেন।
নিহত মহসিন রানার শ্যালক সুমন আহম্মেদ জানান, জুনায়েদ সাহেদ (১২) এবং জাহিদ সাহেদ (৬) নামে রানার দুটি ছোট্ট শিশু সন্তান রয়েছে। মৃত্যুর শোনার পর থেকেই বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন রানার স্ত্রী সাদিয়া সাহেদ বিনু। এই অনাকাঙ্খিত মৃত্যু পুরো পরিবার চোখে অন্ধকার দেখছে। রানার বড় ভাই মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে আসেন ইতালি থেকে। বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি তার মরদেহ দেশে প্রেরণের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে।গত রোববার বিকালে মরদেহ পৌঁছে বাংলাদেশে।তিনি জানান, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে ব্যালেচর ডিগ্রি (বিএসসি) অর্জন করেন মহসিন সাহেদ রানা। এমএসসি করার জন্য ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান রানা।
কথা হয় মহসিন রানার কর্মস্থল সাফারি কর্নার মার্টের মালিক আব্দুল হান্নানের সঙ্গে। তিনি এবং রানা একই বাসায় থাকতেন। তিনি জানান, আইওয়ার মহারিশি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভিার্সিটিতে মাস্টার্সে পড়তে আসেন মহসিন রানা। গত ১০ বছরেও দোকানে কোন সহিংস ঘটনা ঘটেনি। দুর্ভাগ্যক্রমে গত ২২ আগস্ট রাতে দুর্বৃত্তের গুলিতে রানা নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে তিনি দুবৃত্তের চাহিদা মোতাবেক টাকা ও সিগারেটও দিয়ে দিয়েছিলেন।
একই বাসায় থাকার সুবাধে সুখ-দুঃখের অংশীদার ছিলেন উল্লেখ করে আব্দুল হান্নান আরো বলেন, স্ট্যাটাস পরিবর্তনের পর তার (রানা) গ্রিনকার্ড হয়েছিল। কথা ছিল দেশে যাবে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা হবে। পড়ালেখা শেষ করে একজন আইটি প্রফেশনাল হিসেবে দেশে কিংবা এখানে (ইউএসএ) ক্যারিয়ার গড়বে। দুর্বৃত্তের ছোড়া বুলেটে সবই শেষ হয়ে গেছে।
জানাজায় অংশ নেওয়া ঢাকা জেলা সমিতি সাবেক সভাপতি বাসেত রহমান টেনেসি থেকে মরদেহ এনে জানাজার আয়োজন এবং দেশে প্রেরণের জন্য বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি ইউএসএ ইনকের সভাপতি জাহিদ মিন্টুসহ কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান।
বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি ইউএসএ ইনকের সভাপতি জাহিদ মিন্টু জানান, টেনেসি থেকে মরদেহ বাংলদেশে প্রেরণ ব্যায়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। তাছাড়া প্রক্রিয়াটাও অনেক কঠিন। কমিউনিটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং সহযোগীতার করার জন্যই তারা নিউইয়র্ক থেকে মরদেহ প্রেরণের ব্যবস্থা করছেন।