নীল কুয়াশার পাহাড়ে


হাবিব রহমান , আপডেট করা হয়েছে : 10-09-2026

নীল কুয়াশার পাহাড়ে

সকালের সিডনি তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোতে গাড়ির চলাচল শুরু হয়েছে, কিন্তু আকাশে তখনও সকালের নরম আলো। আমি দাঁড়িয়ে আছি সিডনি হিলটনের লবিতে। হাতে এক কাপ কফি, চোখ বারবার চলে যাচ্ছে হোটেলের দরজার দিকে।আজ আমার গন্তব্যব্লু মাউন্টেইনস।হঠাৎ পেছন থেকে মিষ্টি একটি কণ্ঠ—মি. রহমান?ফিরে তাকাতেই দেখি এক তরুণী। নীল জিন্স, সাদা শার্ট, কাঁধে ছোট ব্যাগ। মুখে প্রশান্ত হাসি।আমি লিজ। আজ তোমার ব্লু মাউন্টেইনসের সঙ্গী।আমি পরিবেশটা হালকা করার জন্য মৃদু হেসে বললাম,গাইড তো পেলাম, কিন্তু এতো সুন্দর গাইড পাবো, এটা আমার জানা ছিল না।লিজ হেসে ফেলল।বললো,পাহাড়ে যাওয়ার আগেই যদি আমার এতো প্রশংসা করো, তাহলে কিন্তু পাহাড়ের সৌন্দর্যকে অবহেলা করা হবে।

হিলটন থেকে বেরিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটলো পশ্চিমে। লিজ ড্রাইভ করছে আর বলছে,সিডনি থেকে ৫০ কিলোমিটার গেলেই তুমি বুঝবে শহর কীভাবে জঙ্গল হয়ে যায়। এই রাস্তাটার নাম গ্রেট ওয়েস্টার্ন হাইওয়ে। আদিবাসী দারুগ আর গুন্ডুংগুরা মানুষরা হাজার বছর ধরে এই পথে হেঁটেছে।জানালার বাইরে ইউক্যালিপটাসের সারি। লিজ বললো, তুমি কি জানো,ব্লু মাউন্টেইনকে নীল দেখায় কেন?আমি হোমওয়ার্ক করে আসা বিদ্যা থেকে বলে দিলাম, ইউক্যালিপটাস গাছের জন্য।ও বললো,হ্যাঁ, এখানে লাখ লাখ ইউক্যালিপটাস গাছ তেল ছড়ায় বাতাসে। রোদ পড়লে সেই তেলের কণা নীল হয়ে যায়। তাই দূর থেকে পাহাড়টাকে নীল মনে হয়। এটা ধোঁয়া না, এটা পাহাড়ের নিঃশ্বাস।

আমি বললাম,তোমার দেশটা তাহলে নিঃশ্বাস দিয়েও ছবি আঁকে?লিজ হেসে আমার দিকে তাকালো। বললো, তুমি কবি নাকি?ঊললাম—না,তবে সুন্দর পরিবেশ আর চমৎকার সঙ্গী পেলে মাঝে মধ্যে কবি ভাবটা বেড়িয়ে আসে।এর বেশি কিছু নয়।ও হাসলো।

আমি জানালার বাইরে তাকালাম।দূরের পাহাড়গুলো নীল। এক পাহাড়ের পেছনে আরেক পাহাড়। তাদের মাঝখানে গভীর উপত্যকা। কোথাও মেঘের ছায়া, কোথাও সূর্যের আলো।মনে হলো, প্রকৃতি যেন নীল রঙে আঁকা এক বিশাল জলরঙের ছবি।এক ঘণ্টা পর আমরা ঢুকলাম ব্লু মাউন্টেইন ন্যাশন্যাল পার্কে।

নিজ বললো, ২০০০ সালে ইউনেস্কো এটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।প্রায় দশ লাখ হেক্টর, আটটা জাতীয় উদ্যান মিলে।কারণ কী জানো? এখানে প্রায় ১০০ রকমের ইউক্যালিপটাস—পৃথিবীতে যত প্রজাতি আছে তার প্রায় ১৩ শতাংশ, এক জায়গায়। বিজ্ঞানীদের কাছে এটা একটা খোলা পরক্ষাগার, কীভাবে একটা গাছের বংশ শুকনো মহাদেশে ছড়িয়ে পড়লো তার জীবন্ত নথি।আর ১৯৯৪ সালে ‘ডেভড নোবল‘ নামে এক পার্ক রেঞ্জার ছুটির দিনে একটা গিরিখাদে দড়ি বেয়ে নামলেন। নিচে এমন একটা গাছ দেখলেন যেটা তিনি চিনতে পারলেন না। একটা ডাল ছিঁড়ে নিয়ে এলেন।ওটা ছিল ওয়োলেমাই পাইন। ৯ কোটি বছরের পুরোনো প্রজাতি-জীবাশ্মে পাওয়া যেত, সবাই ভাবত কোটি কোটি বছর আগে বিলুপ্ত। ডাইনোসরের পায়ের কাছে যে গাছ ছিল, সেটা সিডনি থেকে দু’ঘণ্টার দূরত্বে বেঁচে আছে, একশরও কম গাছ।ওর ঠিক অবস্থান আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে গোপন।যারা জানে তারা শপথ করে যায়।তুমি জানো?

সেহাসলো, চোখ রাস্তায়। জানলেও বলতাম না। আর তুমি যদি আমাকে যথেষ্ট পছন্দ করো, তুমিও জিজ্ঞেস করবে না।গাড়ি থেকে নামতেই ঠান্ডা হাওয়া শরীরে একটা ধাক্কা লাগাল।সামনে গভীর খাদ, আর যতদূর চোখ যায় শুধু নীল আর নীল পাহাড়ের ঢেউ।লিজ ইতিহাস বলতে শুরু করল।তবে গাইডের মত না, গল্পের মতো।

১৮১৩ সালের আগে ইউরোপিয়ানরা ভাবত এই পাহাড় পার হওয়া যায় না। তিনজন—ব্লাক্সল্যান্ড, লসন আর ওয়েন্টওয়ার্থ—প্রথম এ পাহাড় ডিঙিয়ে পশ্চিমের সমতল খুঁজে পায়। তখনই সিডনি বাঁচলো।আর এ পাহাড়ের আসল মালিক? দারুগরা। ওদের কাছে এই পাহাড়টা মা। ওরা বলে, থ্রি সিস্টার্স পাহাড়টা আসলে তিন বোন, যাদের যুদ্ধ থেকে বাঁচাতে পাথর বানিয়ে দেয়া হয়েছিল।

পর্বতের চড়াই গড়িয়ে যখন বিকেলের নরম সোনাঝরা আলো এসে পড়লো থ্রি সিস্টার্সের প্রকাণ্ড চূড়াগুলোতে, তখন নীলগিরির পুরো উপত্যকা যেন এক রহস্যময় মায়াজালে ঢেকে গেছে। আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বিশাল সেই গিরিখাতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ইউক্যালিপটাসের হালকা গন্ধ আর পাহাড়ে নামা ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ আমাদের যেন কিছুটা বুঁদ করে রেখেছিল।লিজ আমার দিকে ফিরে মৃদু হেসে বললো,এ সুবিশাল পাথরের দেওয়ালগুলোর পেছনে কিন্তু গভীর এক প্রেমের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। স্থানীয় আদিবাসী গুন্ডুঙ্গুরা জনগোষ্ঠীর কাছে এটা শুধু প্রকৃতির রূপ নয়, এক অমর ট্র্যাজেডি।

বহু বছর আগে এ উপত্যকায় জামিসন নদীর তীরে বাস করতো গুন্ডুঙ্গুরা উপজাতি। তাদের বংশেরই তিন পরম সুন্দরী বোন ছিল—মেহনি, ওয়িমলা আর গুনেনু। প্রতিবেশীদের কাছে তারা ছিল এক একটি পদ্মকলির মতো।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস,পাশের শত্রুভাবাপন্ন কাত্তুম্বা উপজাতির তিন ভাইয়ের প্রেমে পড়ে যায় এই তিন বোন। উপজাতীয় কঠোর আইন ভেঙে দুই ভিন্ন গোত্রের এই ভালোবাসা মেনে নিতে পারেনি সমাজ। বিয়ের কোনো উপায় না দেখে প্রেমিক ভাইয়েরা সিদ্ধান্ত নেয় জোর করে তিন বোনকে ছিনিয়ে নেওয়ার।

শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। দুই উপজাতির এই সংঘর্ষে তোলপাড় হয়ে ওঠে গোটা নীলগিরি। তিন বোনকে যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং তাদের সম্মান বাঁচাতে তাদের সম্প্রদায়ের এক ক্ষমতাধর প্রবীণ বয়োজ্যেষ্ঠ বা উইচ ডক্টর এক বিশেষ মন্ত্রবলে তিন বোনকে তিনটি বিশাল পাথরে রূপান্তরিত করে দেন। পরিকল্পনা ছিল, যুদ্ধ শেষ হলেই তিনি আবার মন্ত্রের উল্টো জাদুতে তাদের রক্তমাংসের সজীব নারীতে ফিরিয়ে আনবেন।কিন্তু ভাগ্য ছিল বড়ই নির্দয়। যুদ্ধের ময়দানেই কাত্তুম্বা যোদ্ধাদের হাতে প্রাণ হারান সেই বয়োজ্যেষ্ঠ। তার সঙ্গেসঙ্গেই চিরতরে হারিয়ে যায় সেই জাদুমন্ত্র। আর তিন বোন সেই উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অনন্তকালের জন্য কঠিন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, নিজেদের ভালোবাসার মাশুল দিয়ে, প্রিয় মানুষদের ফিরে আসার অপেক্ষায়।কঠিন পাথরও তা হলে ভালোবাসার ভার বয়ে বেড়ায়?-আমি শান্ত গলায় বললাম। লিজ কোনো জবাব দিলো না।তার চোখের কোণে পাহাড়ের কুয়াশার মতোই যেন একচিলতে উদাস ভাব ভেসে উঠলো।

দুপুরের দিকে আমরা গেলাম কাতুম্বার একটি স্থানীয় রেস্তোরাঁয়-Bowery।পুরোনো একটি গির্জা ভবনকে নতুনভাবে সাজিয়ে তৈরি করা এই রেস্তোরাঁয় আধুনিক Australian cuisine-এর সঙ্গে স্থানীয় উপকরণের ব্যবহার দেখা যায়।নিজ নিজেই অর্ডার করল। টেবিলে খাবার আসতেই সে বললো,আজ তোমাকে অস্ট্রেলিয়ান ফুডের স্বাদ দিতে চাই।খাবারের সঙ্গে ছিল স্থানীয় সবজি, মাংস ও অস্ট্রেলীয় স্বাদের আধুনিক পরিবেশন।আমি বললাম,ভ্রমণের একটা বড় আনন্দ হল নতুন জায়গার খাবার খাওয়া।দুপুরের পর আমরা Leura-এর দিকে গেলাম।

ছোট্ট পাহাড়ি শহর। পুরনো বাড়ি, সুন্দর বাগান, ছোট দোকান আর শান্ত রাস্তা। Leura-কে ব্লু মাউন্টেইনস এর অন্যতম আকর্ষণীয় পাহাড়ি জনপদ হিসেবে ধরা হয়। বিকালে পাহাড় থেকে নামার সময় আমরা একটা ছোট কফিশপে বসলাম।লিজ অর্ডার করলো দুকাপ Flat White-অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত কফি।

কফির ধোঁয়া উড়ছে, আর সামনে নীল পাহাড় আস্তে আস্তে বেগুনি হচ্ছে। লিজ বললো,এই পার্কের আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এখানে এখনো ৯১ প্রজাতির ইউক্যালিপটাস আছে, যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। ইউনেস্কো একে হেরিটেজ করেছে এ গাছগুলোর জন্যই।আমি লিজকে একটু রাগাতে চাইলাম।বললাম,তোমার দেশের কফি ভালো। কিন্তু নিউইয়র্কের কফি আরো বেশি ভালো।লিজ একটুও না রেগে বললো,এখানে কফির সঙ্গে পাহাড় ফ্রি। নিউইয়র্কে সেটা পাও?

—না।

—তাহলে আমি জিতে গেলাম।

—লিজ আবার বললো,তুমি কিন্তু চমৎকারভাবে কথা বল!আমি বললাম,শুধু যখন সামনে সুন্দর দৃশ্য থাকে।আর যদি দৃশ্যটা মানুষ হয়?লিজ মৃদু হেসে বললো,তুমি বেশ বিপজ্জনক পর্যটক।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা।গাড়ি এবার সিডনির দিকে নামতে শুরু করেছে।পাহাড়ের ওপর সূর্যের শেষ আলো।নীল পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। ইউক্যালিপটাস বনের ফাঁক দিয়ে কমলা রঙের সূর্যাস্ত দেখা যাচ্ছে।সকালের পথের সঙ্গে এই পথের কোন মিল নেই।সকালে আমরা যাচ্ছিলাম অজানার দিকে।এখন ফিরছি একটি নতুন স্মৃতি নিয়ে।গাড়ির ভেতর কিছুক্ষণ নীরবতা।লিজ হঠাৎ বললো,আজকের দিনটা কেমন লাগলো?আমি বললাম,পাহাড় সুন্দর ছিল। সে বললো,শুধু পাহাড়?আমি একটু থেমে বললাম—পাহাড়, কুয়াশা, বন, থ্রি সিস্টার্স,সবই সুন্দর ছিল। তবে একজন মানুষ এই দিনটাকে মনে রাখার মত করে তুলেছিল।লিজ আর কিছু বললো না।জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো।আমি দেখলাম, তার মুখে সন্ধ্যার আলো পড়েছে।

সিডনি শহরের আলো আবার দেখা যাচ্ছে।উঁচু ভবনগুলো একে একে সামনে আসছে।গাড়ি থামলোসিডনি হিলটনের সামনে।আমি দরজা খুলে নামলাম।লিজও নামলো।সারাদিনের ধুলো, ছবি আর গল্প নিয়ে ফিরে এসেছি।গাড়ি থেকে নামার সময় লিজ একটা ছোট ইউক্যালিপটাসের পাতা আমার হাতে দিলো।বললো, এটা রাখো।নিউইয়র্কে গিয়ে যখন খুব মন খারাপ হবে, পাতাটা ঘষবে,গন্ধ পাবে।মনে হবে ব্লু মাউন্টেইন তোমার পাশেই আছে।আমি বললাম, আর তোমাকে মনে পড়লে?তাহলে আবার এসো।পাহাড় তো পালাচ্ছে না। আর আমিও থাকবো।

লিজ হাতটা বাড়িয়ে দিলো।হাতটা ঠান্ডা, পাহাড়ের হাওয়ার মতো।তারপর গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। বাইরে তখন সিডনির আলো জ্বলে উঠেছে।আমার পকেটে একটা পাতা। আর বুকে একটা নীল পাহাড়।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)