বিদ্যুৎ সংকট যেভাবে উত্তরণ ঘটাতে পারে বিএনপি


সালেক সুফী , আপডেট করা হয়েছে : 02-09-2026

বিদ্যুৎ সংকট যেভাবে উত্তরণ ঘটাতে পারে বিএনপি

গ্রিড এবং অব গ্রিড মিলে বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। গ্রিড সংযুক্ত উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের রেকর্ড থেকে দেখা যায়, ২০ মে ২০২৬ সন্ধ্যায় কয়েক ঘণ্টা পিক লোড সময়ে থাকা ১৭.২০১ মেগাওয়াট ছিল সর্বোচ্চ উৎপাদন। বিদ্যুৎ সরবরাহ চেনে বিপুল পরিমাণ রিজার্ভ ক্ষমতা থাকলেও ভুল পরিকল্পনার আর দুর্বৃত্তায়নের কারণে নেই স্পিনিং রিজার্ভ। প্রাথমিক জ্বালানি সংকট আর সঞ্চালন, বিতরণ ব্যাবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে ১৫ হাজার মেগাওয়াট ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন এবং সরবরাহ করা যায় না। গ্রীষ্মকালে তীব্র দাবদাহের সময় চাহিদা কখনো কখনো ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। ২৫০০-৩০০০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে সৃষ্টি হয় তীব্র বিদ্যুৎ লোডশেডিং। সম্প্রতি কক্সবাজার উপকূলে থাকা দুটি ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনা এবং এলএনজি জাহাজ থেকে এলএনজি স্থানান্তর সমস্যা হওয়ায় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৭৫ মেগাওয়াট রেকর্ড লোডশেডিং বিড়ম্বনা দেখা যায়. ভাসমান টার্মিনাল দুটি পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরে এলেও এখনো ঢাকার বাইরে শহরগুলো এবং গ্রাম অঞ্চলে কোথাও কোথাও ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। আর এ লোডশেডিং কবলে পরে জন জীবনে অস্বস্তি, শিল্পকারখানায় স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। সমস্যার ব্যাপ্তি এবং গভীরতা এতোটাই ব্যাপক এবং গভীর যে নতুন বিএনপি সরকার নানা ধরনের আপৎকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ করেও সংকট নিরসনের কূলকিনারা করতে হিমশিম খাচ্ছে। 

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ চেনের চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুৎ চাহিদা ১৫০০০-১৬০০০ মেগাওয়াট ওঠা নাম করে। মধ্য নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত বিদ্যুৎ চাহিদা কমে ১০ হাজার মেগাওয়াট নেমে আসে, বিপুল পরিমাণ রিজার্ভ মার্জিন থাকায় এবং ব্যক্তি খাতের অনেক কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদানের সংস্থান থাকায় সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে একক বিদ্যুৎ ক্রেতা বিপিডিবি। ভ্রষ্ট পরিকল্পনা এবং সিন্ডিকেট প্রভাবিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ চেনে ধস নামে। সংকটের মূল সংকট হিসেবে দীর্ঘদিন প্রধান প্রাথমিক জ্বালানি গ্যাস সরবরাহ সংকট চিহ্নিত হলেও সমস্যা বহুমুখী এবং বহুবিধ। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট থেকে মুক্তির জন্য সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলেও বাস্তবতা হলো তিন থেকে পাঁচ বছরেও সংকট থেকে মুক্তির কোনো সম্ভাবনা নেই।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি মিশ্রণ থেকেই সংকটের স্বরূপ প্রতীয়মান হয়। ফুয়েল মিক্স: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রে জানা আছে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি মিক্স হলো, গ্যাসভিত্তিক ১২.৪৭২ মেগাওয়াট (৪২.১৫%), কয়লা ৬৯২৭ মেগাওয়াট (২৩.৪১%), ফার্নেস অয়েল ৫৬৪১ মেগাওয়াট (১৯.০৬%), বিদ্যুৎ আমদানি ২৮৯৬ মেগাওয়াট ( ৯.১১%), নবায়ণযোগ্য জ্বালানি ৮৫৯ মেগাওয়াট (২.৫৯%), ডিজেল ৭৬৮ মেগাওয়াট (২.৬০%) জল বিদ্যুৎ ২৩০ মেগাওয়াট (০.৭৬%)। দেখা যায়, গ্যাস সরবরাহ সংকটে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন একসময় সর্ব নিম্ন ৩৫০০-৪০০০ মেগাওয়াট নেমে আসায় সৃষ্টি হয় মহাসংকট।

সংকট উত্তরণের পথনকশা : 

স্বল্পকালীন উদ্যোগ

আগেই লিখেছি মে থেকে অক্টোবর শেষ নাগাদ দেশ ব্যাপী সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা থাকে ১৭০০০-১৮০০০ মেগাওয়াট। গড় চাহিদা থাকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি শেষ পর্যন্ত চাহিদা থাকে ১০ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিতরণ চেইনের এ ব্যাপক ব্যবধানের কারণ বিদ্যুৎ চাহিদা এখনো মূলত লাইটিং এবং কুলিং লোড। স্বল্পকালীন ব্যবস্থা হিসেবে সরকারকে ডিমান্ড সাইড ব্যবস্থা নিতেই হবে। শপিংমল এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবহার সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত সীমিত করা সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। নিবিড়ভাবে মনিটরিং করে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অন্যান্য ক্ষেত্র হলো সিস্টেম লস নির্মূল করা এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি করে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক করা জরুরি। 

বিদ্যুৎ সংকটের অপর স্বল্পকালীন ব্যবস্থা হলো কয়লাভিত্তিক এবং তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার সুনিশ্চিত করে ক্ষয়িষ্ণু গ্যাস সঞ্চয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পে সরবরাহ। এ কার্যক্রমে রান্নার কাজে ব্যাবহৃত ১৩-১৫ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার ২০২৮-এর মধ্যে সম্পূর্ণ পরিহার করে এ কাজে বিকল্প জ্বালানি এলপিজি ব্যবহার সুলভ, নিরাপদ করা জরুরি।

সৌর বিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান দ্রুত বৃদ্ধি

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ অবদান বৃদ্ধির সম্ভাবনা অপরিসীম। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যক্তিখাতকে প্রণোদনার মাধ্যমে সম্পৃক্ত করা হলে ৫ বছরে ন্যূনতম ১০ হাজার মেগাওয়াট এবং ১০ বছরে ২০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন এবং ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এ বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযুক্তির বাইরেও ডিস্ট্রিবিউটেড জেনারেশন ( মিনি গ্রিড, মাইক্রো গ্রিড) সৃষ্টি করতে হবে, রুফ টপ সোলার, ভাসমান সোলার, হাইব্রিড সোলার, উপকূল এলাকায় এবং সাগরে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ কাজগুলো পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে স্রেডাকে চ্যাম্পিয়ন প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। স্রেডা নানা কারণে এখন আমলানির্ভর হয়ে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এ সময় স্রেডা দক্ষ এবং যোগ্য না হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব হবে না।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুততম সময়ে গ্রিডে সংযুক্ত করা

পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণ শেষে উৎপাদনে আসার শেষ ধাপে পৌঁছেছে। রূপপুর থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে সঞ্চালনের জন্যে অধিকাংশ সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বাকি আছে দুটি সঞ্চালন লাইনের নদী ক্রসিং কাজ। এ পর্যায়ে প্রথম ইউনিট থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালনে কোনো সমস্যা নেই, গ্রিড কারিগরিভাবে প্রস্তুত। কিন্তু সমস্যা হলো প্রাথমিক সময়ে স্পিনিং রিজার্ভ না থাকা। সরকার তেলভিত্তিক এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে ১৫০-২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ রাখলে এ সময়ে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০-৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযুক্ত হতে পারবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে পিজিসিবি এনএলডিসিতে সময় কাটিয়ে দেখেছি গ্রিডে পারমাণবিক বিদ্যুৎ বা নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সংযুক্তিতে কোনো সমস্যা নেই। এক্ষেত্রে সরকারকে অবিলম্বে মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং এ বিদ্যুৎ পিজিসিবি সঞ্চালন গ্রিড এবং বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির নেটওয়ার্ক ওপেন এক্সেস করে দিতে হবে।

আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড উন্মুক্ত করা

ভারত বাংলাদেশ নেপাল ভুটানের বিদ্যুৎ গ্রিড গড়ে তুলে এ অঞ্চলে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ ট্রেডিং সুবিধা উন্মুক্ত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে উপমা হতে পারে পূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড। এটি হলে বাংলাদেশের সিজনাল চাহিদার ব্যাবধান সমস্যার সমাধান হবে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ মূল্য বাজারনির্ভর করা

দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ মূল্য হয় কষ্ট অথবা বাজার নির্ভর করতে হবে. বিপুল ভর্তুকি দিয়ে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ সেক্টর স্বনির্ভর হতে পারবে না। প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রণোদনা দিয়ে অন্য গ্রাহকদের কাছে পর্যায়ক্রমে প্রকৃত মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে। এ কাজ সঠিকভাবে করতে হলে বার্কের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বাধীনভাবে কাজ নিশ্চিত করতে হবে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)