আসামির গলা চেপে ধরায় এনওয়াইপিডি কর্মকর্তা ওমর হাবিব দোষী সাব্যস্ত


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 20-08-2026

আসামির গলা চেপে ধরায় এনওয়াইপিডি কর্মকর্তা ওমর হাবিব দোষী সাব্যস্ত

ব্রঙ্কসের একটি জুরি গত ১৩ আগস্ট নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) কর্মকর্তা ওমর হাবিবকে এক গ্রেফতারকৃত আসামিকে বেআইনিভাবে গলা চেপে ধরার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে। জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর নিউইয়র্ক সিটিতে পুলিশি গলা চেপে ধরার কৌশল নিষিদ্ধ করে আইন পাস হওয়ার পর এই প্রথম কোনো এনওয়াইপিডি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওই আইনে বিচার ও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটল।

ওমর হাবিবকে বেআইনি পদ্ধতিতে শারীরিকভাবে আটকে রাখার অভিযোগে একটি মিসডিমিনর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। একই মামলায় তিনি শ্বাসরোধের একটি গুরুতর অপরাধ বা ফেলোনিতেও দোষী সাব্যস্ত হন। এছাড়া মিসডিমিনর অ্যাসল্টের অভিযোগেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। শ্বাসরোধের ফেলোনি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় হাবিবের এনওয়াইপিডি চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে। ১৯ বছর ধরে পুলিশ বিভাগে কর্মরত এই কর্মকর্তা এখন সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন।

ঘটনাটি ঘটে ২০২৩ সালের ২৮ জুলাই। ব্রঙ্কসের ইস্টচেস্টার রোডের একটি ক্যাটারিং হলে বিশৃঙ্খলার অভিযোগে ৯১১ নম্বরে ফোন পাওয়ার পর সেখানে যান ওমর হাবিব। সেখানে মদ্যপ অবস্থায় থাকা লর্ড ন্যামাহকে গ্রেফতারের চেষ্টা করার সময় হাবিব নিষিদ্ধ শারীরিক কৌশল ব্যবহার করেন বলে প্রসিকিউশন অভিযোগ করে। মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে পুলিশ কর্মকর্তার শরীরে থাকা ক্যামেরার ভিডিও এবং ঘটনাস্থলের নজরদারি ক্যামেরার ভিডিও আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

ন্যামাহ আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, তাকে হাতকড়া পরিয়ে পেছনে হাত বাঁধা অবস্থায় হাবিব তার গলা চেপে ধরেছিলেন। তিনি বলেন, হাবিব তাকে গলা চেপে শ্বাসরোধ করেছিলেন। ঘটনার কয়েক মিনিট পর হাবিব তার কাছে ক্ষমা চাওয়ায় ন্যামাহ প্রথমে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ করতে চাননি। এমনকি তিনি কর্মকর্তাকে বলেছিলেন, তিনি কোনো অভিযোগ করবেন না এবং চান না যে হাবিব চাকরি হারান। কিন্তু পরে পুলিশ কর্মকর্তার শরীরে থাকা ক্যামেরার ভিডিও দেখার পর ন্যামাহ তার অবস্থান পরিবর্তন করেন। ভিডিওতে তিনি নিজেকে অচেতন হয়ে যেতে দেখেন বলে জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিও দেখার পর তিনি বুঝতে পারেন যে ঘটনাটি তার মনে থাকার চেয়েও গুরুতর ছিল।

মামলায় হাবিবের আইনজীবী জ্যাকব ওয়েইনস্টেইন অবশ্য দাবি করেন, ভিডিওতে ঘটনার পুরো চিত্র দেখা যায় না। তিনি যুক্তি দেন, ন্যামাহ কেন অচেতন হয়েছিলেন তার অন্য কারণও থাকতে পারে। এর মধ্যে আয়নায় ঘুষি মেরে রক্তক্ষরণ এবং মদ্যপানের আগে খুব বেশি খাবার না খাওয়ার বিষয় উল্লেখ করেন তিনি। হাবিবের আইনজীবী আরো তুলে ধরে যে ন্যামাহ গায়ানায় তরুণ বয়সে আধা-পেশাদার বক্সার ছিলেন এবং অতীতে শরীর ও মাথায় আঘাত পেয়ে কয়েকবার অচেতন হয়েছিলেন।

অন্যদিকে সহকারী ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মাইকেল নটন আদালতে বলেন, ভিডিওতে ঘটনাটি স্পষ্টভাবে দেখা যায় এবং হাবিব আইন প্রয়োগ করার পরিবর্তে নিজেই আইন ভঙ্গ করেছিলেন। প্রসিকিউশন পক্ষ ভিডিওর কিছু অংশ ধীরগতিতে ও স্থিরচিত্রের মাধ্যমে জুরির সামনে উপস্থাপন করে গলা চেপে ধরার ঘটনাটি দেখানোর চেষ্টা করে।

রায় ঘোষণার পর ব্রঙ্কস ক্রিমিনাল সুপ্রিম কোর্টের বিচারক সিনথিয়া ইসালেস হাবিবকে জামিন ছাড়াই রাইকার্স আইল্যান্ডে আটক রাখার নির্দেশ দেন। সাজা ঘোষণার আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই থাকবেন।

হাবিবের প্রতিনিধিত্বকারী পুলিশ ইউনিয়ন পুলিশ বেনেভোলেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিক হেনড্রি রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এই দণ্ডপ্রাপ্তি প্রমাণ করে যে একজন পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনের প্রতিটি মুহূর্তেই ফৌজদারি বিচারের ঝুঁকিতে থাকেন। হেনড্রি আরো অভিযোগ করেন, পুলিশবিরোধী প্রচারণার কারণে কর্মকর্তাদের ন্যায্য বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

হাবিব এর আগেও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে বিতর্কে জড়িয়েছেন। ২০১৭ সালে গ্রেফতার করা এক ব্যক্তিকে গলা চেপে ধরার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। ওই মামলায় নিউ ইয়র্ক শহর কর্তৃপক্ষ দুই বছর আগে ৭ লাখ ৪৪ হাজার ডলারে সমঝোতা করে। ওই ঘটনার পর হাবিব ৩০ দিনের বেতন হারান এবং এক বছরের জন্য বরখাস্তের প্রবেশনে রাখা হয়।

এছাড়া ২০০৯ সালে হাতকড়া পরানো এক বন্দির মুখে ঘুষি মারার অভিযোগে তিনি ৪০ দিনের বেতন হারিয়েছিলেন। ২০২০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আরো উঠে আসে, ব্রঙ্কসের একটি অস্ত্র মামলায় হাবিব প্রমাণাদি নিয়ে কারচুপির কথা স্বীকার করার পর একজন আসামি খালাস পান এবং আরো দুজন তাদের গুরুতর অপরাধের দোষ স্বীকারের আবেদন প্রত্যাহারের সুযোগ পান।

বর্তমান মামলায় গ্রেফতারের পর হাবিবকে ৩০ দিনের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে তাকে পরিবর্তিত দায়িত্বে রাখা হয়। সেই সময় তিনি বন্দুক ও পুলিশ ব্যাজ ছাড়া নিউইয়র্ক সিটি হাউজিং অথরিটির (এনওয়াইসিএইচএ) নজরদারি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণের কাজ করছিলেন।

এ মামলার গুরুত্ব আরো বেশি, কারণ জর্জ ফ্লয়েডকে ২০২০ সালে মিনিয়াপোলিস পুলিশের এক কর্মকর্তা হত্যা করার পর নিউইয়র্ক সিটিতে পুলিশি গলা চেপে ধরা এবং এমন শারীরিক নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করা হয়। ওই আইনে পুলিশ কর্মকর্তাদের এমন কোনো পদ্ধতি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা কোনো ব্যক্তির শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করতে পারে। পুলিশ ইউনিয়নগুলো আইনটি আদালতে চ্যালেঞ্জ করলেও ২০২৩ সালের শেষ দিকে নিউইয়র্ক স্টেটের সর্বোচ্চ আদালত আইনটির বৈধতা বহাল রাখে।

ফলে ওমর হাবিবের এই দণ্ড নিউইয়র্ক পুলিশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে পুলিশি বলপ্রয়োগ, কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং সন্দেহভাজনদের শারীরিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)