পাথরের দুর্গে এক বিকেল


হাবিব রহমান , আপডেট করা হয়েছে : 20-08-2026

পাথরের দুর্গে এক বিকেল

জেএফকের চার নম্বর টার্মিনালে ভোর ৫টায় খুব একটা আলো থাকে না। শুধু হলুদ বাতি, আর কাচের ওপারে অন্ধকার। রানওয়েতে সারি সারি লাল-নীল বিন্দু। কফির কাপ হাতে আমি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর মনে মনে একটা নাম আওড়াচ্ছিলাম বারবার-সিটাডেল লাফেরিয়ের।

নামটা আমি প্রথম পড়েছিলাম বছর পনেরো আগে, এক পুরোনো বইয়ে। এক কালো রাজা, যিনি নিজেকে রাজা ঘোষণা করেছিলেন এমন এক দেশে যে দেশ সদ্য পৃথিবীর প্রথম সফল দাস-বিদ্রোহ শেষ করে উঠেছে। আর যিনি পাহাড়ের চূড়ায় বানিয়েছিলেন আমেরিকা মহাদেশের বৃহত্তম দুর্গ-এই ভয়ে যে ফরাসিরা আবার ফিরে আসবে শিকল হাতে। বইটা বন্ধ করে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম সেদিন। তারপর পনেরো বছর কেটে গেছে। আজ যাচ্ছি সেই দেশটিতে, যার মাটিতে একদিন দাসেরা অস্ত্র হাতে নিয়েছিল স্বাধীনতার জন্য। যে দেশ পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়-দাসদের বিদ্রোহ থেকে জন্ম নেওয়া স্বাধীন রাষ্ট্র। দেশটির নাম হাইতি।

উড়োজাহাজ যখন আটলান্টিক ছেড়ে ক্যারিবিয়ানের ওপর নামতে শুরু করল, নিচে জল হঠাৎ রং বদলাল- গাঢ় নীল থেকে ফিরোজা, ফিরোজা থেকে সবুজাভ। তারপর পাহাড়। হাইতির পাহাড় কেমন, তা এক হাইতিয়ান প্রবাদেই সবচেয়ে ভালো বলা আছে: ফবু সড়হ মবহ সড়হ-পাহাড়ের পেছনে আরো পাহাড়। কাপ-হাইটিয়েন বিমানবন্দরটি ছোট। এতো ছোট যে, ল্যান্ডিংয়ের পর প্লেন থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গরম পিচের ওপর দিয়ে হেঁটেই টার্মিনালে যেতে হয়। প্রথম যে জিনিসটা গায়ে লাগে তাহলো বাতাস-ভারী, নোনা আর লবঙ্গ মেশানো রোদের মতো গন্ধভরা।

বিমানবন্দরের দরজা দিয়ে বাইরে বের হতেই দেখি, একটি মেয়ে হাতে আমার নাম লেখা ছোট্ট একটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে সানগ্লাস। কাঁধ ছুঁয়ে নামা চুল। পরনে হালকা নীল পোশাক, মুখে হাসি। আমি কাছে যেতেই সে বললো, মিস্টার হাবিব? আমি বললাম, হ্যাঁ। আর তুমি? নাইকা, সে বললো-হাত বাড়িয়ে। N-A-i-K-A.

আমি হেসে ফেললাম। বললাম, আমার দেশের ভাষায় ওই শব্দটার মানে নায়িকা। যে গল্পের কেন্দ্রে থাকে। সে ভুরু নাচাল, তাহলে তো আজকের গল্পটা আমারই। বলে ব্যাগটা আমার হাত থেকে নিয়ে নিলো, যেন সেটা নিয়ে তর্ক করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

নাইকার বয়স ২৪-২৫ হবে, কানে দুটো সরু সোনার রিং আর হাঁটার মধ্যে এমন একটা তাড়া যেন পৃথিবীটা একটু ধীরগতিতে চলছে বলে তার সামান্য বিরক্তি আছে। কথা বলে তিনটি ভাষায়, প্রায়ই একই বাক্যের ভেতরে-ক্রেওল, ফরাসি, ইংরেজি। আমি বুঝলাম, আগামী দুদিন আমার কানকে খুব পরিশ্রম করতে হবে।

নাইকা আবার বললো, I am your guide… and your storyteller for today. আমি বললাম, শুধু গাইড না, আজ তোমাকে ইতিহাসের শিক্ষকও হতে হবে। সে হেসে বললো, ডিল, তারপর গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বললো, ওয়েলকাম হাইতি। গাড়িতে ওঠার আগে সে ঘুরে দাঁড়ালো। বললো, একটা কথা বলে রাখি। বেশিরভাগ বিদেশি এখানে আসে একটা দুর্গের ছবি তুলতে। ছবি তুলে চলে যায়। তুমি যদি সেটাই চাও, আমি তোমাকে দুর্গে পৌঁছে দেবো, কোনো অসুবিধা নেই। এক মুহূর্ত থেমে আবার বললো, কিন্তু তুমি যদি শুনতে চাও, তাহলে আজ রাতে তোমার ঘুম একটু খারাপ হবে। আগে থেকে বলে দিলাম। আমি বললাম, আমি শুনতেই এসেছি। গাড়ি ছুটলো পাহাড়ের দিকে। কাপ-হাইটিয়েন থেকে মিলো গ্রাম পঁচিশ কিলোমিটারের মতো। রাস্তার দুপাশে কলাগাছ, আমগাছ আর মাটির রঙ পোড়া ইটের মতো লাল। মোটরসাইকেলে তিন-চারজন করে মানুষ যায়, শার্টের প্রান্ত হাওয়ায় পতাকার মতো ওড়ে। এক জায়গায় আমরা একটা পুরোনো স্মারকের পাশ দিয়ে গেলাম-ভের্তিয়ের। ১৮০৩ সালের নভেম্বরে এখানে নেপোলিয়নের পাঠানো সেনাবাহিনীর শেষ পরাজয় ঘটেছিল। যারা জিতেছিল, তারা আগের প্রজন্মে আখের খেতে শিকল পরা মানুষ ছিল।

তোমার দেশে ইতিহাস কোথায় থাকে? জাদুঘরে? নাইকা জিজ্ঞেস করলো। আমি বললাম, অনেকটা তাই। আমাদের এখানে ইতিহাস রাস্তার ওপর শুয়ে থাকে-সে বললো। গাড়ি চালাতে হয় তার গা ঘেঁষে। রাস্তার দুপাশে হাইতির জীবন। ছোট ছোট দোকান, রঙিন বাড়ি, পথের মানুষ, দূরে পাহাড়ের সবুজ ঢেউ। নাইকা বলতে শুরু করলো, হাইতির সবচেয়ে বড় গল্পটি কোনো রাজপ্রাসাদের গল্প নয়, এটি স্বাধীনতার গল্প। আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে বললাম, তাহলে আজ আমাকে সেই গল্পটাই শোনাও। নাইকা মৃদু হেসে বললো, আজ তুমি শুধু শুনবে না, ইতিহাসের ভেতর দিয়েও হাঁটবে। কিছুক্ষণ পর গাড়ি পাহাড়ি পথে উঠতে শুরু করলো।

সবুজ পাহাড় পেরিয়ে আমরা পৌঁছলাম সেই ঐতিহাসিক ভূখণ্ডে Citadelle Henry, যাকে অনেকে Citadelle Laferriere নামেও চেনেন। দূর থেকে দুর্গটিকে দেখে আমার মনে হলো পাহাড়ের মাথায় যেন কোনো বিশাল পাথরের জাহাজ নোঙর করে আছে। নাইকা বললো, ওই যে দেখছো, সেটিই Citadelআমি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। এটি শুধু একটি দুর্গ নয়। এটি যেন স্বাধীনতার পাথরে লেখা ঘোষণা।

UNESCO-এর World Heritage তালিকায় থাকা National History Park-Citadel, Sans-Souci, Ramiers-এর অংশ এ দুর্গ। ১৯৮২ সালে স্থানটি বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পায়। একটা প্রাসাদ, যার সিঁড়ি এখনো অক্ষত, যার সিঁড়ি উঠে গেছে বিশাল একটা মুখের দিকে, কিন্তু সে মুখের পেছনে কোনো ছাদ নেই, শুধু আকাশ। ইটের দেওয়ালের গা বেয়ে ঘাস, ভাঙা খিলানের ফাঁক দিয়ে রোদ আর ভেতরের উঠোনে এমন এক নিস্তব্ধতা যা শুধু বহু পুরোনো ধ্বংসাবশেষই ধরে রাখতে পারে। ‘সঁ সুসি’, নাইকা বললো, মানে-‘দুশ্চিন্তাহীন’। রাজা প্রথম অঁরি নিজের প্রাসাদের নাম রেখেছিলেন ‘দুশ্চিন্তাহীন’। সে হাসলো, কিন্তু হাসিটা চোখে পৌঁছলো না। এ লোকটা জীবনে এক মুহূর্তও দুশ্চিন্তাহীন ছিলেন না।

সে আমাকে দেওয়ালের একটা খাঁজ দেখালো, নিচ দিয়ে জলের নালা। পাহাড়ি ঝরনার ঠান্ডা জল প্রাসাদের মেঝের তলা দিয়ে বইতো, ঘর ঠান্ডা রাখার জন্য। ১৮১৩ সালে। ইউরোপের অতিথিরা এসে বিশ্বাস করতে পারতো না যে এমন একটা জায়গা ক্যারিবিয়ানে থাকতে পারে আর সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতে পারতো না যে এর মালিক একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ, যিনি জন্মেছিলেন দাস হিসেবে। তিনি চেয়েছিলেন সাদা মানুষেরা এসে দেখুক, নাইকা বললো, দেওয়ালে হাত রেখে। দেখুক, আমরা শুধু শিকল ভাঙতে পারি না। আমরা ভার্সাইও বানাতে পারি।

আমি সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়াই। অনেক দুর্গ দেখেছি। কিন্তু সিটাডেল দেখে মনে হল এটা শুধু দুর্গ নয়। একটা জাহাজ- একটা পাথরের রণতরী, যার তীক্ষ্ণ ত্রিকোণ গলুই পাহাড়ের কিনারা থেকে শূন্যের দিকে বেরিয়ে আছে, ৯০০ মিটার উপরে, যেন সে সমুদ্রে নয়, আকাশে যাত্রা করবে। দেওয়াল কোথাও ৪০ মিটার উঁচু, চার মিটার পুরু। ৩৬৫টি কামান-নাইকা বললো। ‘বছরের প্রতিটি দিনের জন্য একটা করে, লোকে বলে। ফরাসি, ব্রিটিশ, স্প্যানিশ-সব শত্রুর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া।’

ভেতরে ঢুকে দেখলাম গোলার স্তূপ। কামানের লোহার গোলা, পিরামিডের মতো সাজানো, হাজারে হাজারে, দুশো বছর ধরে অপেক্ষা করছে। একটা যুদ্ধের জন্য যা কোনোদিন হয়নি। ফরাসিরা আর ফেরেনি। আমি নাইকাকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা বানাতে কতগুলো শ্রমিক লেগেছিল। সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো না। কামানের নলে হাত রাখলো, তারপর বললো, কুড়ি হাজার মানুষ। পনেরো বছর। আর কত মরে ছিল, সেটার হিসাব কেউ রাখেনি। তারপর সে যে কথাটা বললো, সেটাই আমার সেই রাতের ঘুম নষ্ট করেছিল, ঠিক যেমন সে সকালেই বলে দিয়েছিল।

এটাই আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন জায়গা। এ দুর্গটা স্বাধীনতা রক্ষার জন্য বানানো। আর বানানো হয়েছিল প্রায় সেই একই পদ্ধতিতে, যা থেকে মানুষ সদ্য মুক্তি পেয়েছিল। সে কাঁধ ঝাঁকাল, কিন্তু হালকাভাবে নয়। আমরা এটা নিয়ে গর্ব করি। আমাদের গর্ব করা উচিতও। কিন্তু আমি পর্যটকদের বলি না যে এটা শুধু একটা বীরত্বের গল্প। এটা একটা মানুষের গল্প, যে ভয় পেয়েছিল এবং সেই ভয় থেকে এমন কিছু বানিয়েছিল যা সুন্দর এবং ভয়ংকর, দুটোই। উঠোনের এক কোণে একটা সাদা পাথরের সমাধিফলক। ১৮২০ সালের অক্টোবরে, পক্ষাঘাতে অচল ও বিদ্রোহের মুখে ঘেরাও হয়ে, রাজা প্রথম অঁরি নিজেই নিজের জীবন শেষ করেন; তাঁর দেহ শত্রুর হাত থেকে বাঁচাতে তাড়াহুড়ো করে এ উঠোনেই চুনের মধ্যে সমাধিস্থ করা হয়। পাথরে তার বাণী খোদাই করা- Je renais de mes cendres আমি আমার নিজের ছাই থেকে আবার জন্ম নিই।

পিছন দিকের শিরদাঁড়া-সরু পথ ধরে আমরা রামিয়ের গেলাম। রামিয়ে হলো সিটাডেলের পেছনের ছোট চারটে দুর্গ-চৌকি, আরো উঁচুতে, আরো নির্জন, শেষ আশ্রয়। ওখানে কোনো ভিড় নেই, কোনো গাইডের দল নেই, শুধু ঘাস আর বাতাস আর নিচে গোটা উত্তর হাইতি মেঘের ফাঁকে ফাঁকে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে। আমরা দুজন অনেকক্ষণ কিছু বললাম না। বলার মতো কিছু ছিলও না। নাইকা বললো, হাইতির স্বাধীনতার পর রাজা Henri Christophe এই দুর্গ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। উদ্দেশ্য ছিল নতুন স্বাধীন দেশকে বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। আমি বললাম, দুর্গের চেয়েও বড় মনে হচ্ছে এর ইতিহাস। নাইকা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কারণ এ দুর্গের দেওয়ালে শুধু পাথর নেই, আছে মানুষের স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন। কথাটা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।

পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে নিচের বিশাল ভূ-দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, মানুষ স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য কত কিছু করতে পারে! দুপুরে মিলোতে ফিরে একটা ছোট রেস্তোরাঁয় বসলাম। নীল রঙ করা কাঠের দেওয়াল, ছাদে টিন আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা তেলে রসুন পড়ার শব্দ। নাইকা মেনু দেখলো না। কেবল বললো, ‘আমি অর্ডার করছি। তুমি তর্ক করো না। যা এল, তা এরকম: griot-কমলালেবুর রসে জারানো ভেড়ার মাংস, ভেজে বাদামি করা, বাইরে খাস্তা ভেতরে নরম; সঙ্গে pikliz, বাঁধাকপি, গাজর, স্কচবনেট লঙ্কার ভিনিগারে ভেজানো আচার, যা প্রথম কামড়ে চোখে জল এনে দেয় এবং তৃতীয় কামড়ে আসক্তি ধরিয়ে দেয়। bannann peze-কলা থেঁতো করে ভাজা। আর সবচেয়ে যেটা মনে থেকে গেছে: diri ak djon djon উত্তর হাইতির নিজস্ব কালো মাশরুমে রান্না ভাত, যার রঙ প্রায় কালচে ধূসর আর স্বাদ মাটির গভীর থেকে তুলে আনা কিছুর মতো। নাইকা বললো, নতুন বছরের প্রথম দিনে সারা দেশ soup joumou খায়-কুমড়োর স্যুপ। ঔপনিবেশিক আমলে এ স্যুপ শুধু প্রভুদের জন্য ছিল, দাসেদের খাওয়া নিষেধ ছিল। ১৮০৪-এর ১ জানুয়ারি স্বাধীনতার দিনে মানুষ সেটা রেঁধে খেয়েছিল। এখনো প্রতি বছর খায়।

তোমরা স্বাধীনতাকে স্যুপ বানিয়ে খেয়ে ফেলেছো?-আমি বললাম। সে চামচ নামিয়ে রেখে হাসলো, এবার সত্যিকারের হাসি, চোখ পর্যন্ত। ‘হ্যাঁ আর প্রতিবার আবার খিদে পায়।’ বিকালে আমরা কাপ হাইটিয়ানে ফিরলাম। শহরটা ফরাসি ঔপনিবেশিক ছকে বানানো-সরু রাস্তা, নম্বর দেওয়া, দোতলা বাড়ির লোহার ঝুলবারান্দা, দেওয়ালের রঙ গোলাপি-হলুদ-ফিরোজা, সব রঙ রোদে খেয়ে যাওয়া। সমুদ্রের ধারে একটা ক্যাফেতে বসলাম, দোতলায়, খোলা বারান্দায়। হাইতিয়ান কফি এল ছোট কাপে, আর আমার জন্য নাইকা এক কাপ চা-ও আনালো-আদা, লেবুঘাস আর অসম্ভব বেশি চিনি। te jenjanm. সে বললো, এই চা তারা তখন খায় যখন কেউ ভিজে যায় বা কেউ শোকে থাকে, বা কেউ চলে যাচ্ছে। আজ তিনটের মধ্যে কোনটা? আমি জিজ্ঞেস করলাম। এখনো ঠিক করিনি-নাইকা বললো। রোদ পড়ে আসছিল। নিচে রাস্তায় একটা ছেলে ঠেলাগাড়িতে আখ নিয়ে যাচ্ছিল, আর কোথাও একটা রেডিওতে কনপা বাজছিল, সেই দুলুনি ধরা তাল যা শুনলে পা নিজের ইচ্ছেয় নড়ে।

আমরা তখন আর দুর্গের কথা বলছিলাম না। সে বললো তার ছোটবেলার কথা-মিলোর কাছেই এক গ্রামে বড় হওয়া, দুর্গটাকে জানালা দিয়ে রোজ দেখা এবং বারো বছর বয়সে প্রথমবার ওখানে ওঠা এবং কেঁদে ফেলা। বললো, তার এক দিদি মায়ামিতে থাকে, আর প্রতিবার ফোনে বলে, ‘তুই চলে আয়।’ বললো, সে যায়নি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

নাইকা কাপটা দুহাতে ধরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললো, কারণ আমি এমন একটা দেশে জন্মেছি যেটার নাম শুনলে বাইরের লোকে প্রথমে দুঃখ পায়। ভূমিকম্প, দারিদ্র্য, খবরের কাগজ। আমি চাই দুয়েকজন লোক অন্তত এমন থাকুক, যে অন্য কথাটা বলতে পারে। সে আমার দিকে ফিরলো। আজ আমি একজনকে বলেছি। আগামীকাল আরেকজনকে বলবে। এভাবেই চলতে থাকবে।

আমি বললাম, আমি ভুলবো না। সবাই তাই বলে, সে বলল এবং তারপর একটু নরম গলায়, ‘তবে সবাই মিথ্যে বলে না।’ আমাদের হাত টেবিলের ওপর কাছাকাছি ছিল। আমি সেটা সরাইনি, সে-ও না। বাকি বিকালটা এভাবেই কাটলো, খুব সাধারণ কথা, খুব ধীরে, যেন প্রত্যেকটা বাক্যের শেষে অনেকটা করে ফাঁকা জায়গা রাখলে সময়টা লম্বা হয়ে যাবে। সন্ধ্যায় সে আমাকে বাটিমার দিকের রাস্তায় নিয়ে গেল, যেখান থেকে সূর্য উপসাগরের জলে নামে। ঠিক তখন, দূরে, দক্ষিণের পাহাড়ের মাথায় শেষ আলোটুকু এসে পড়লো এমন এক জায়গায় যেটা এখান থেকে কেবল একটা খুদে খাঁজের মতো দেখায়।

ওটা, সে বললো আঙুল তুলে। ‘ওটাই।’ আমি সারাদিন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেটা এখান থেকে এক চিমটে পাথর। পরদিন সকালে আমরা পুরোনো শহরটা হাঁটলাম, ক্যাথেড্রালের সামনের চত্বরে বসে থাকলাম, আর বাজারে সে আমাকে জোর করে এক গ্লাস kremas খাওয়ালো-নারকেল, দুধ, দারুচিনি আর মিষ্টি পানীয় যা বিপজ্জনকভাবে সহজে গলা দিয়ে নামে। আমি একটা ছোট কাঠের ঘোড়া কিনলাম, বাজে জিনিস, দাম বেশি দিলাম, নাইকা দোকানদারের দিকে তাকিয়ে ক্রেওলে কী একটা বলল যাতে দোকানদার হেসে ফেলে আমাকে একটা চাবির রিং ফ্রি দিয়ে দিল। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা।

গাড়ি ছুটলো বিমানবন্দরের দিকে। রাস্তার দুপাশে আলো জ্বলেছে। বিমানবন্দরের সামনে গাড়ি থামলো। নাইকা আমার ব্যাগ নামিয়ে দিলো। আমি বললাম-তাহলে বিদায়, নাইকা। সে বললো, বিদায় নয়। আমি অবাক হয়ে তাকালাম। তাহলে?

সে মৃদু হেসে বললো, Say… until we meet again.

আমি হাসলাম। নাইকা হাত বাড়িয়ে দিলো। আমি তার হাত ধরলাম। সে মুহূর্তে মনে হলো, কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য, অথচ তারা স্মৃতিতে থেকে যায় অনেক বছর। আমি ভেতরে ঢোকার আগে শেষবারের মতো ফিরে তাকালাম। নাইকা তখনও দাঁড়িয়ে। আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে। তারপর সে ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠল। গাড়িটি চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। কাচের দরজার ওপারে মিলিয়ে যেতে লাগলো হাইতির বিকাল। মনে হলো, কিছু ভ্রমণ শেষ হয় বিমানবন্দরে, কিছু ভ্রমণ শেষ হয় বাড়ি ফিরে, আর কিছু ভ্রমণ শেষ হয় না কখনো। কারণ সেগুলো জায়গার ভেতর নয়, মানুষের ভেতর বেঁচে থাকে। হাইতির সেই পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে দেখা স্বাধীনতার দুর্গ, Sans-Souci-এর ধ্বংসস্তূপ, বিকেলের এক কাপ চা এবং নাইকার সেই শেষ হাসি-হয়তো আমার ভ্রমণজীবনের স্মৃতির পাতায় অনেকদিন ধরে নীরবে জ্বলতে থাকবে। হাইতি আমাকে বিদায় দিয়েছে। কিন্তু হাইতির গল্প আমাকে বিদায় জানায়নি। প্লেন উঠলো। জানালা দিয়ে দেখলাম উপসাগর ছোট হয়ে যাচ্ছে, তারপর পাহাড়, তারপর মেঘ। আমার পকেটে একটা কাঠের ঘোড়া আর একটা ফ্রি চাবির রিং। আর মাথার ভেতরে সেই একটা লাইন, চুনের নিচে শুয়ে থাকা এক রাজার পাথরে খোদাই করা, যা আসলে ওই রাজার নয়, ওই গোটা দ্বীপের:

আমি আমার নিজের ছাই থেকে আবার জন্ম নিই। জেএফকেতে নামলাম রাত ১১টায়। ঠান্ডা, কড়া আলো, ট্যাক্সির লাইন। আমি ফোন বের করে একটা মেসেজ লিখলাম, তিনটে শব্দের। Mwen sonje w. আমি তোমাকে মনে রেখেছি।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)