অভিবাসন অভিযান ঘিরে বাড়ছে আতঙ্ক ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 19-08-2026

অভিবাসন অভিযান ঘিরে বাড়ছে আতঙ্ক ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব

ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক অভিবাসনবিরোধী অভিযান, বিমানবন্দরে গ্রেফতার বৃদ্ধি, রেকর্ডসংখ্যক আটক, বহিষ্কার এবং কিছু অভিবাসী গোষ্ঠীর আইনি সুরক্ষা হারানোর কারণে অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এসব নীতির প্রভাব শুধু যাদের সরাসরি আটক বা বহিষ্কার করা হচ্ছে তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অভিবাসী পরিবার, মিশ্র অভিবাসন মর্যাদার পরিবার, কর্মক্ষেত্র, স্কুল এবং পুরো কমিউনিটির ওপর এর সামাজিক ও মানসিক প্রভাব পড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসির অভিযান আরো জোরদার হয়েছে। বিমানবন্দরেও অভিবাসন আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের তৎপরতা বেড়েছে। একই সময়ে আইসির হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা, ব্যাপক আটক এবং বহিষ্কারের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। টেম্পোরারি প্রটেক্টেড স্ট্যাটাস বা টিপিএসের মতো আইনি সুরক্ষা হারানো কিছু অভিবাসীও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে হাইতি থেকে আসা অনেক অভিবাসীর জন্য এ পরিস্থিতি পরিবার, চাকরি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অভিবাসন অভিযান নিয়ে আতঙ্কের কারণে অনেক মানুষ এখন জনসমাগমস্থল এড়িয়ে চলছেন। কেউ সামাজিক অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না, কেউ সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন, আবার কেউ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন না। অনেক পরিবার সরকারি সেবা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা গ্রহণ থেকেও দূরে থাকছে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং মানসিক আঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে কয়েকটি অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকার ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি নেওয়ার চেষ্টা করছে। ইলিনয়ে অভিবাসন অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি সহায়তা নেটওয়ার্কে অর্থায়নের প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে অভিবাসন অভিযানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়েও আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বোস্টনে অভিবাসীদের সহায়তার জন্য ৪৪ লাখ ডলারের একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটিতেও অভিবাসী কমিউনিটির মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, দেশজুড়ে আনুমানিক ২ লাখ ৫ হাজার শিশু ইতোমধ্যে বাবা অথবা মাকে আটক হতে দেখেছে। কিছু শিশু নিজেরাও আটক হয়েছে। পরিবারের একজন সদস্যকে হঠাৎ হারানোর অভিজ্ঞতা শিশুদের নিরাপত্তাবোধ ও স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি তাদের পড়াশোনা, স্কুলে উপস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন স্কুল জেলায় অভিবাসন অভিযান নিয়ে আতঙ্কের কারণে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি এবং ভর্তি কমে যাওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

অভিবাসন অভিযানের কারণে পরিবারগুলো শুধু বিচ্ছিন্নই হচ্ছে না, তাদের আর্থিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও নষ্ট হচ্ছে। ২০২৬ অর্থবছরে আইসির হেফাজতে নেওয়া প্রায় ১৭ হাজার ৯০০ ব্যক্তি জানিয়েছেন যে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সন্তান রয়েছে। এ সংখ্যা ২০২৪ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। কোনো পরিবারের উপার্জনক্ষম একজন সদস্য আটক হলে হঠাৎ আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া পরিশোধ, খাদ্য, শিশুর দেখাশোনা এবং শিক্ষার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একটি পরিবারের ওপর অভিযান চালানোর প্রভাব দ্রুত আশপাশের কর্মক্ষেত্র, স্কুল এবং পুরো কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ে।

অভিবাসী মালিকানাধীন ব্যবসাগুলোও এর প্রভাব থেকে বাদ যাচ্ছে না। লস অ্যাঞ্জেলেসে গবেষকেরা জানিয়েছেন, অভিবাসন অভিযান বেড়ে যাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ব্যবসাগুলোতে কয়েক মিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। অনেক কর্মী ভয়ে কাজে যাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীরা কর্মী সংকটে পড়ছেন এবং স্থানীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। মিনিয়াপোলিসের স্থানীয় কর্মকর্তারাও অভিবাসন অভিযানকে কেন্দ্র করে কমিউনিটিতে ভয়, বিভ্রান্তি ও অস্থিতিশীলতা বাড়ার কথা জানিয়েছেন।

অভিবাসন অভিযানের প্রভাব সরাসরি অভিযানের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা, চাকরি করা এবং পরিবার গড়ে তোলা অনেক মানুষ হঠাৎ আটক হওয়ায় তাদের প্রতিবেশী, সহকর্মী ও বন্ধুদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযানে মুখোশধারী কর্মকর্তা, সাদা পোশাকের এজেন্ট এবং চিহ্নহীন গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ থাকায় পরিস্থিতি আরো বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠছে। কোথাও কোথাও এসব অভিযানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে, যা স্থানীয় কমিউনিটিতে আরো গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে।

এর পাশাপাশি ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তন অভিবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগও সংকুচিত করছে। ২০২৫ সালের ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিলের মাধ্যমে পাস হওয়া বিভিন্ন কাটছাঁট এবং অভিবাসীদের জন্য প্রযোজ্য অন্যান্য নীতিগত পরিবর্তনের কারণে কিছু যোগ্য অভিবাসী পরিবার স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা থেকে দূরে সরে যেতে পারে। নতুন পাবলিক চার্জ নীতির কারণে আইনগতভাবে যেসব সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে, সেগুলো গ্রহণ করতেও অনেক পরিবার ভয় পেতে পারে। ফলে যে সময়ে পরিবারগুলোর মানসিক ও আর্থিক সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই তাদের সামনে সহায়তার পথ আরো সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন আইন প্রয়োগ এবং একটি কার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সরকারের দায়িত্ব। তবে আইন প্রয়োগের পদ্ধতি যদি ব্যাপক ভয়, বিভ্রান্তি এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করে, তাহলে এর প্রভাব শুধু অভিবাসীদের ওপর পড়ে না। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেখা দিতে পারে।

অভিবাসন অভিযান শেষ হওয়ার পরও এর মানসিক ক্ষত দ্রুত মুছে যায় না। পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়, আটক হওয়ার আশঙ্কা, চাকরি হারানোর অনিশ্চয়তা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাস দীর্ঘদিন মানুষের মধ্যে থেকে যেতে পারে। এর ফলে চিকিৎসা নেওয়া, সন্তানকে স্কুলে পাঠানো, কাজে যাওয়া এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এ পরিস্থিতি শুধু অভিবাসী পরিবারগুলোর জীবনকেই নয়, পুরো কমিউনিটির সামাজিক আস্থা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)