স্বাধীন দেশে আ.লীগের দুর্নীতিতে জনপ্রিয়তা হ্রাস পায় : সিপিবি


বিশেষ প্রতিনিধি , আপডেট করা হয়েছে : 19-08-2026

স্বাধীন দেশে আ.লীগের দুর্নীতিতে জনপ্রিয়তা হ্রাস পায় : সিপিবি

শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর দলের শ্রেণি অবস্থানের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করার সুযোগ কখনোই ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ের সেই মোহ ক্রমশ ক্ষয় হতে থাকে। সদ্য স্বাধীন দেশে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক রূপান্তর, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি এবং জনজীবনের নানা সমস্যার কারণে দলটির জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পায়। একারণে ইতিহাসকে কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সম্পত্তিতে পরিণত করা যাবে না। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের ৫১তম বার্ষিকী উপলক্ষে ১৫ আগস্ট শনিবার পুরানা পল্টনের মৈত্রী মিলনায়তনে এ আলোচনা সভায় এসব বক্তব্য উঠে আসে। সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক এম এম আকাশ, ডা. দিবালোক সিংহ, মঞ্জুর মঈন।

আলোচনা সভায় নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে ঐতিহাসিক ভূমিকা যেমন অস্বীকার করা যাবে না, তেমনি স্বাধীনতা পরবর্তী তাঁর শাসনামলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্র পরিচালনা ও গণতন্ত্রের সংকোচনের ঘটনাবলিরও নির্মোহ মূল্যায়ণ করতে হবে। ইতিহাসের প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকলেই অতীতের রাজনৈতিক ভুল ও বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর নৃশংস হত্যাকান্ড ও পটপরিবর্তন প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর আলোচনা সভায় নেতৃবৃন্দ বলেছেন, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের অবসান ঘটিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে। নেতৃবৃন্দ বলেন, তাঁর অবদান স্বীকার করেই স্বাধীনতা-পরবর্তী তাঁর শাসনামলের নির্মোহ ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ণ করা জরুরি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল নেতৃত্বের। পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে একটি ঐতিহাসিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে যে রাজনৈতিক শক্তিসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তাদের মধ্যে কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির দুটি ধারা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ছিল প্রধান শক্তি।

নেতৃবৃন্দ বলেন, জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জাতীয়তাবাদী ধারার প্রধান ও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান আবির্ভূত হন। ৬ দফা, পরবর্তীতে ১১ দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রোথিত হয়। যার প্রেক্ষিতে একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে। একজন সম্মোহনী জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। একই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টিসহ প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক শক্তিসমূহ যার যার অবস্থান থেকে সর্বাত্মক সংগ্রাম ও অসীম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর যে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন নীতিগত বিচ্যুতি, রাজনৈতিক সংকট এবং আওয়ামী লীগের একটি অংশের চরমপন্থী অবস্থানে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রগতির ধারা অঙ্কুরেই প্রতিবিপ্লবী প্রবণতার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচনের প্রবণতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

সভায় নেতৃবৃন্দ বলেন, সেই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যেই একটি প্রতিক্রিয়াশীল পটপরিবর্তনের লক্ষ্যে ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকান্ড ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস রাজনৈতিক হত্যাকান্ড। এ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ জানানো এবং নিহতদের স্মরণ করা ঐতিহাসিক কারণেই জরুরি। নেতৃবৃন্দ বলেন, সিপিবি সে সময়েও এই হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং আজও রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, সামরিক হস্তক্ষেপ ও অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের রাজনীতির বিরুদ্ধে তার অবস্থান অব্যাহত রেখেছে। সিপিবি নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, সামরিক হস্তক্ষেপ, স্বৈরতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের যে ধারার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি রাজনৈতিক হত্যাকান্ডে প্রকাশ্য ও নেপথ্যের শক্তিকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাই ১৯৭৫ ও ২০২৪-সহ সকল রাজনৈতিক হত্যাকান্ডে দায়ীদের বিচার এবং প্রকাশ্য ও নেপথ্যের সকল শক্তিকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে হবে।

নেতৃবৃন্দ ইতিহাসের বিকৃতি ও দলীয় রাজনৈতিক বয়ানের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীন বাংলাদেশে আজও অধরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের সংগ্রামে সকলকে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান। বক্তারা শাসকগোষ্ঠীর জুলুম, সাম্রাজ্যবাদ ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র ডানপন্থা, নারী বিদ্বেষ, মৌলবাদ এবং পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলার মাধ্যমে শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)