দিবসটি ছিল এবছরের ৫ আগস্ট। বাংলাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছিল। ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ঘটে। এর পাশাপাশি ১৫ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক শাসনের অবসান হয়। এজন্য ঠিক এই দিনে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ছিল নানান আয়োজন। কিন্তু সব আয়োজনেই বিপত্তি বাধায় ওইদিন বিকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অডিও সংবাদ সম্মেলন নিয়ে। নয়াদিল্লিতে প্রথমবার তিনি বেশ বীরদর্পে হাজির হন সেই সংবাদ সম্মেলনে। ভারতের ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (এফসিসি) এই ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরাসরি অডিও বক্তব্য তুলে ধরেন। আর এতে করেই বাংলাদেশের একটি নির্বাচিত সরকারের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে চলা ভারতের সাথে শীতল সম্পর্ক আরও শীতল হতে থাকে। কেননা সবাই ধরে নিয়েছিল বাংলাদেশে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ভারত একটি সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক চলমান রাখতে যা যা লাগে তা তারা করবে। ভারত সরকারের শীর্ষমহলের কথা বার্তায় ঢাকা তেমনটি-ই বুঝে নিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার সে-ই অডিও সংবাদ সম্মেলনের পরপরই ঢাকা শুধু উত্তপ্তই না অন্তরে নানান সন্দেহ দানা বেধেছে।
হাসিনাকে দাবার গুটি বানাচ্ছে না তো ভারত?
প্রথমেই যে সন্দেহ দেখা দেয় তা-হলো ভারত সরকার কি করে কোনো ধরনের বাধা বিপত্তি তদারকি ছাড়াই খোদ নয়াদিল্লিতে ৫ আগস্টই শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলন করতে দিয়েছে? অথচ ওই সংবাদ সম্মেলনের আগে শেখ হাসিনার অডি ভাষণের ব্যাপারে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালকে বেশ কয়েকবার দফায় দফায় ঢাকা-কে ইতিবাচকভআবে আশ্বস্ত করেছিল। ঢাকা বেশ আশাবাদী ছিল বিরাট পরিসরে ভারত শেখ হাসিনাকে এতো বড়ো সুযোগ তৈরি করে দেবে না। কিন্তু ঘটনা তা-ই ঘটে গেলো। এতে করে হাসিনা কার্ড’ খেললে বন্ধুত্বের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বলে সাফ সাফ নয়াদিল্লিকে ইঙ্গিত করে জানান দেয় ঢাকা। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের ভারত সফরে একধরনের অনিশ্চিয়তা-ও দেখা দেয়। যদিও সর্বশেষ পর্যন্ত খবরে বলা হচ্ছে যে, আগামী সপ্তাহেই ভারত সফরে যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এনিয়ে দুই দেশের মধ্যে কথাবার্তা মোটামুটি পাকা। তবে এখনো অনিশ্চয়তার পাল্লাও কম ভারি না।
কি সেই অনুকূল পরিবেশের দাবি ঢাকার?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের জন ঢাকা অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার কথা বলেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এ মন্তব্য করে বিস্তারিত বলেছেন। তিনি বলেন, ভারতের কাছে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীকে দ্রুত ফেরত পাঠাতে এবং শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।
তবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ঢাকা আসলে কি কি অনুকুল পরিবেশ দাবি করছে? এদিকে কূটনৈতিক পর্যায়ের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায় যে, ভারতের কাছে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়ে বরং জুলাই বিপ্লবীদের অন্যতম নেতা শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদের হস্তান্তরকেই ঢাকা জোর দিয়েছে। কেননা ইতোমেধ্যেই বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে সরকারের অব্যাহত দাবির প্রেক্ষাপটে ভারতের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারা তাদের দেশের ভেতরে কিছু জটিলতার কথা জানিয়েছেন। এতে তারা বলেছেন, এ ধরনের প্রত্যর্পণ অনুরোধ ভারতীয় বিচার বিভাগের সামনে উপস্থাপন করতে হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতই নেবে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে কোনো একক সিদ্ধান্ত হবে না। আর একারণে ঢাকার এ কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে সর্বশেষ অবস্থান জানাতে গিয়ে সূত্র জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঢালাওভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য বা অডিও বার্তার বিষয়ে দিল্লিকে সত্যিকারভাবেই গ্যারান্টি চেয়েছে ঢাকা। ঢাকা চাইছে শেখ হাসিনা আর কোনোভাবেই ভারতের মাটিতে বসে তারেক রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃতি বক্তৃতা না দেন। কিংবা কোনো সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন না করেন। দেশী বিদেশী গণমাধ্যমেও যেনো তিনি সাক্ষাৎকার না দেন...সে বিষয়ে সত্যিকারের পদক্ষেপ দেখতে চেয়েছে ঢাকা।
দিল্লিতে আ.লীগ বিক্ষোভের আশঙ্কা ঢাকার
এদিকে আরেকটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর চলাকালীন সময় বা এর আগে দিল্লি বা সেদেশটির কোনো স্থানেই আ.লীগ বিক্ষোভ করতে পারবে না। কেননা জুলাই বিপ্লবের পর থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কয়েক লাখ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী পালিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। এই বিশাল নেতাকর্মীদের একটি অংশকে কেউ কৌশলে তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সময় ব্যবহার করা যেনো না হয় তা-ও নিশ্চয়তাও চাওয়া হয়।
দিল্লিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের আগে বা পরে আ.লীগের কেউ যেনো তা-ও বিরুদ্ধে দেশটিতে বিক্ষোভ বা সমাবেশ কর্মসূচিতে ভারত কোনো পর্যায়ে যেন সায় না দেয়। এছাড়া কোনো ধরনের সংবাদ সম্মেলন করেও যে-নো শেখ হাসিনা তারেক রহমানের সফরের আগে পরে সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে না পারে- সে ব্যাপারে ভারত সরকারের কাছে গ্যারান্টি চেয়েছে। কেননা বাংলাদেশ সরকার যুক্তি দেখিয়ে বলেছে যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ডের রায় প্রদান করে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা ও সহিংসতার ঘটনায় তাকে এই সাজা দেওয়া হয়। জানা গেছে, এসব অনুকূল পরিবেশের নিশ্চয়তা চেয়েছে তারেক রহমানের সরকার। ঢাকা এসবের পাশাপাশি দিল্লিকে জানিয়ে দিয়েছে ভারত আর যেনো কোনো সরকারের নয়, বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। কেননা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এখনো বিশ্বাস যে ভারতের আস্কারা না পেলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এতোটা ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতো না।