মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রাইমারিতে আবদুল এল সায়েদের জয়ের পরপরই তাকে লক্ষ্য করে সাধারণ নির্বাচনের প্রথম আক্রমণাত্মক প্রচারণা শুরু করেছে রিপাবলিকানরা। প্রচারণার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তার সংক্ষিপ্ত নাম ‘আবদুল এল সায়েদ’-এর পরিবর্তে এখন তার পূর্ণ নাম আবদুল রহমান মোহামেদ এল সায়েদ ব্যবহার করা হচ্ছে।
নভেম্বরে রিপাবলিকান দলের সাবেক কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্সের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগে ন্যাশনাল রিপাবলিকান সিনেটোরিয়াল কমিটি বা এনআরএসসি তাদের প্রথম সাধারণ নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে এল সায়েদকে আমেরিকার সবচেয়ে র্যাডিক্যাল সিনেট প্রার্থী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বিজ্ঞাপনে তাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের মিসরীয় শাখার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সম্প্রতি ওই শাখাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে বলে বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটিও এল সায়েদকে তার পূর্ণ নাম ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে চিত্রিত করেছে। এনআরএসসির ভাইস চেয়ার জিম ব্যাংকসও বলেছেন, মিশিগানের ট্রেড ইউনিয়নভিত্তিক ডেমোক্র্যাটরা আবদুর রহমান এল সায়েদের মতো একজনকে ভোট দিতে চাইবে না।
এল সায়েদ এসব আক্রমণকে তার নাম ও মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। গত ৫ আগস্ট বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, রিপাবলিকানদের হাতে এটিই একমাত্র রাজনৈতিক কৌশল-তার নামের দিকে ইঙ্গিত করে তাকে অন্যরকম হিসেবে তুলে ধরা। তিনি বলেন, তার নাম গ্যাসের দাম বাড়ায়নি, যুদ্ধ শুরু করেনি এবং মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণও নয়। এল সায়েদের ভাষায়, আমেরিকায় আবদুল হওয়ার জন্য এটাই বিশ্বের সেরা জায়গা।
ইসরায়েল ও গাজা ইস্যুও প্রচারণার কেন্দ্রে
রিপাবলিকানরা এল সায়েদের বিরুদ্ধে আক্রমণকে তার ইসরায়েল ও গাজা নীতি নিয়ে অবস্থানের সঙ্গেও যুক্ত করছে। এবারের মিশিগান নির্বাচনে গাজা যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। এনআরএসসির বিজ্ঞাপনে বামপন্থী অনলাইন স্ট্রিমার হাসান পাইকারের সঙ্গে এল সায়েদের যোগাযোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এল সায়েদ চলতি বছর পাইকারের সঙ্গে প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন।
এল সায়েদ অবশ্য বলেছেন, ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি-উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য সমান শান্তি, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকা উচিত। তিনি ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার প্রতিও তার অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, নিজের কন্যাদের নিরাপত্তার প্রতি যে অঙ্গীকার, ইহুদি জনগণের নিরাপত্তার প্রতিও তার একই অঙ্গীকার রয়েছে।
‘সন্ত্রাসী’, ‘র্যাডিক্যাল’ ও ‘কমিউনিস্ট’ তকমা
এল সায়েদকে লক্ষ্য করে রিপাবলিকান প্রচারণায় শুধু র্যাডিক্যাল নয়, তাকে সন্ত্রাসী, ‘কমিউনিস্ট ও চরমপন্থী হিসেবেও আখ্যায়িত করা হচ্ছে। সাবেক কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্স বুধবার এক বিবৃতিতে এল সায়েদকে ‘চরমপন্থী’ বলে অভিহিত করেন এবং তাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।
রজার্স আরো দাবি করেন, তিনি বহু বছর সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন এবং ওসামা বিন লাদেনকে বিচারের আওতায় আনার জন্য কাজ করেছেন। এরপর তিনি এল সায়েদের বিরুদ্ধে এমন একটি বক্তব্য আরোপ করেন, যা আসলে অনলাইন ব্যক্তিত্ব হাসান পাইকারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এল সায়েদ নিজে কখনো ওই বক্তব্য দেননি।
রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি এক বিবৃতিতে এল সায়েদের নাম নিয়ে শব্দের খেলাও করেছে এবং তাকে আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানকারী ও সন্ত্রাসী সমর্থক হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে।
ট্রাম্পের আক্রমণও তীব্র
এল সায়েদের প্রাইমারি বিজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাকে আক্রমণ করেছেন। ট্রাম্প এল সায়েদকে ইহুদি ও ইসরায়েলবিদ্বেষী হিসেবে অভিহিত করেন এবং তার বক্তব্যে কমিউনিজমের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন। বুধবার এক অর্থনৈতিক সমাবেশে ট্রাম্প এল সায়েদের নাম বারবার উচ্চারণ করে তাকে ‘ঘৃণাপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ৬ আগস্ট বৃহস্পতিবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এল সায়েদের পূর্ণ নাম উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মধ্য নাম ‘হুসেইন’ ব্যবহার করে অতীতে রাজনৈতিক আক্রমণের যে প্রবণতা দেখা গেছে, বর্তমান প্রচারণায় এল সায়েদের পূর্ণ নাম ব্যবহারের সঙ্গে সেটির তুলনাও টানা হচ্ছে। একইভাবে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এবং সাবেক মিনেসোটা কংগ্রেসম্যান কিথ এলিসনও তাদের মুসলিম পরিচয়ের কারণে রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন।
ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা বক্তব্য
ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন, যিনি প্রাইমারির আগে এল সায়েদকে সমর্থন করেছিলেন, এই ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণের সমালোচনা করেছেন। ওয়ারেন বলেন, নাম ধরে আক্রমণ করে রাজনৈতিক বিতর্ককে নীতিগত বিষয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, ভোটাররা শেষ পর্যন্ত এসব আক্রমণের পরিবর্তে প্রার্থীরা কীভাবে তাদের জীবনযাত্রার উন্নতি করবেন, সেই বিষয়েই জানতে চাইবেন।
মিশিগানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় মুসলিম ও আরব-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর বসবাস। তবে কায়ারের মিশিগান শাখার দাউদ ওয়ালিদের মতে, এল সায়েদের প্রাইমারি বিজয় দেখিয়েছে যে এসব সম্প্রদায়ের বাইরের বিপুল সংখ্যক ভোটারও তার ধর্মীয় পরিচয়কে ভোটের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখেননি।
এল সায়েদ নভেম্বরে জয়ী হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করবেন। ফলে মিশিগানের এই সিনেট নির্বাচন এখন শুধু দুই প্রার্থীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; মুসলিম পরিচয়, ধর্মীয় স্বাধীনতা, গাজা নীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রচারণায় ইসলামোফোবিয়ার ব্যবহার-এসব বিষয়ও নির্বাচনী বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।