আমাদের মধ্যে প্রেম ছিল, কিন্তু কোনো কমিটমেন্ট ছিল না


আলমগীর কবির , আপডেট করা হয়েছে : 05-08-2026

আমাদের মধ্যে প্রেম ছিল, কিন্তু কোনো কমিটমেন্ট ছিল না

ঢাকাই চলচ্চিত্রের রূপালী জগতের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় জুটি জাফর ইকবাল ও ববিতা। রূপালী পর্দার সেই রসায়ন গড়িয়েছিল বাস্তব জীবনের প্রেমেও। আশির দশকের সবচেয়ে স্টাইলিশ ও সুদর্শন নায়ক জাফর ইকবালের সাথে নিজের সম্পর্ক, উপহার দেওয়া স্মৃতি ও জীবনের নানা অজানা কথা নিয়ে খোলামেলা আড্ডা দিলেন বরেণ্য অভিনেত্রী ববিতা। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আলমগীর কবির

প্রশ্ন: জহির রায়হানের মতো বিখ্যাত পরিচালকের হাত ধরে আপনাদের দুজনেরই চলচ্চিত্রে আসা। সহশিল্পী হিসেবে একাধিক নায়কের সাথে কাজ করলেও জাফর ইকবালের বিষয়টি আপনার কাছে আলাদা কেন ছিল?

ববিতা: অল্প বয়সে আমরা একসঙ্গে ছবিতে অভিনয় শুরু করি। একটানা প্রায় ৪০টি চলচ্চিত্রে আমরা জুটি বেঁধেছিলাম। তখন আমার বয়স ১৫ কি ১৬ বছর-ওই বয়সে যা দেখি সবই ভালো লাগে। তবে ইকবাল ছিল সত্যিকারের হিরো এবং ‘কমপ্লিট প্যাকেজ’। ও খুব হ্যান্ডসাম, মারাত্মক স্টাইলিশ, গিটার বাজাত, গান গাইত এবং মানুষ হিসেবে ভীষণ ভদ্র ছিল। ওর সাথে কাজ করতে এবং সময় কাটাতে ভীষণ ভালো লাগত। সেখান থেকে সহকর্মী থেকে বন্ধুত্ব, আর বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

প্রশ্ন: অনেকেই বলেন ‘সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী’ গানটি নাকি আপনার সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর আপনাকে ভেবেই গেয়েছিলেন জাফর ইকবাল। ঘটনাটি কতটুকু সত্যি?

ববিতা: (হাসি) গানটা প্রকাশের পর সুপারহিট হওয়ার পর অনেকে এমনটা ভেবেছিল বটে। এমনকি আমিও ইকবালকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘সত্যি করে বলুন তো, এই গানটা কি আমাকে ভেবে গেয়েছেন?’ ইকবাল তখন বলেছিল, ‘বিশ্বাস করেন, মনিরুজ্জামান মনির ভাইয়ের লেখা গানটি সুর করার পর আলাউদ্দিন আলী ভাই আমাকে বলেছিলেন তোমাকে দিয়ে গাওয়ালে মানুষ মনে করবে এটা ববিতার জন্য গাইছ।’ মূলত এটি ছিল একটি ব্যবসায়িক কৌশল, আমাকে ভেবে গাওয়া নয়।

প্রশ্ন: কাজের বাইরে শুটিংয়ের অবসরে দু’জন কীভাবে সময় কাটাতেন? আপনাদের মধ্যে যোগাযোগের ধরন কেমন ছিল?

ববিতা: শুটিংয়ের অবসরে অন্যরা আড্ডা দিলেও আমরা গান নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। ইকবালের গাড়িতে সব সময় একটা গিটার থাকত। ও এলভিস প্রিসলির ভক্ত ছিল। আউটডোর শুটিংয়ে আমাকে বলত, ‘আপনি গান গাইতে থাকেন, আমি বাজাই।’ এভাবে বাজাতে বাজাতে আমাকে ও একটি ইংরেজি গান পুরোপুরি শিখিয়েছিল। এমনকি আমরা বিভিন্ন স্টেজ শোতেও একসঙ্গে গাইতাম। আর সম্বোধনের ক্ষেত্রে-সবার সামনে তাকে ‘আপনি’ বললেও একা থাকলে ‘তুমি’ করে বলতাম।

প্রশ্ন: একটা সময়ে গিয়ে আপনাদের সম্পর্কটি ভেঙে যায়। সম্পর্ক ভাঙার মূল কারণ কী ছিল এবং আপনাদের মধ্যে বিয়ের বিষয়ে কোনো কথা হয়েছিল কি?

ববিতা: আমাদের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা ছিল ঠিকই, তবে আমরা কোনো দিন বিয়েশাদি করব এমন চিন্তা বা কোনো ধরনের ‘কমিটমেন্ট’ ছিল না। একটা সময় কাজের ব্যস্ততা ও ছোটখাটো ভুল-বোঝাবুঝি থেকে কিছুটা অভিমান তৈরি হয়। ফলে ও ওর মতো অন্য নায়িকাদের সঙ্গে এবং আমি রাজ্জাক ভাই, ফারুক ভাইসহ অন্যদের সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমাদের প্রেম ভেঙেছে বলেই যে জীবন শেষ-বিষয়টা তেমন নয়। রাজ কাপুর-নার্গিস কিংবা অমিতাভ-রেখার মতো সম্পর্কেরও তো পরিণতি বিয়ে হয়নি, তাই না? ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাটা সবসময় ছিল।

প্রশ্ন: অনেকে দাবি করেন, আপনার সাথে বিচ্ছেদের কারণেই নাকি জাফর ইকবালের পারিবারিক জীবন ও ব্যক্তিগত জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

ববিতা: এটা একেবারে ভুল কথা। আমরা কমিটমেন্টে থাকলে তো বিয়েই করতাম। আমরা কখনো বিয়ে নিয়ে ভাবিনি। ইকবালের পরে বিয়ে হলো, সন্তান হলো। তবে ওদের স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হয় এবং পারিবারিক অশান্তি ছিল। আমারও পরে বিয়ে হয় এবং নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সম্পর্ক না থাকলেও ও আমাকে সবসময় ভীষণ শ্রদ্ধা করত।

প্রশ্ন: জাফর ইকবালের সাথে আপনার একদম শেষ স্মৃতি বা শেষ দেখা কীভাবে হয়েছিল?

ববিতা: শেষের দিকে ইকবাল জীবন নিয়ে খুব খামখেয়ালি ও উদাসীন হয়ে পড়েছিল। শুটিংয়ে দেরি করে আসত। বাদল খন্দকারের একটি ছবিতে আমাদের শেষ কাজ হয়, যেখানে দৃশ্যটি ছিল সে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে আর আমি চিকিৎসক। সেদিন তাকে খুব অসুস্থ ও অগোছালো লাগছিল। পরে জানতে পারি তার ক্যানসার হয়েছে। এরপর সে হাসপাতালে ভর্তি হলো। আমি দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম, কিন্তু তার আগেই খবর পেলাম সে মারা গেছে। এফডিসিতে যখন তার নিথর দেহ শেষবারের মতো আনা হয়, সেখানেই আমাদের প্রথম দেখার মতো শেষ দেখাও হয়েছিল।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)