যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনপ্রয়োগ কার্যক্রম নিয়ে নতুন একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ )। ‘এজেন্টস অব কেয়স অ্যান্ড ক্রুয়েলটি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে অভিবাসন এজেন্টদের অভিযানে ব্যাপক নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে সন্দেহ করা, মার্কিন নাগরিকদের হয়রানি, শিশুদের আটক এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার মতো বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
এসিএলইউ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের অভিবাসন প্রয়োগ কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আটটি স্টেট অ্যারিজোনা, ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, ফ্লোরিডা, ইলিনয়, লুইজিয়ানা, মেরিল্যান্ড ও নিউ মেক্সিকোর ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করেছে। এসবস্টেট নির্বাচন করা হয়েছে কারণ সেখানে ফেডারেল অভিবাসন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি, অভিযান ও কর্মী মোতায়েনের মাত্রা ভিন্ন ছিল। সংগঠনটি বলেছে, পর্যালোচনা করা ১ হাজার ২০০-এর বেশি অভিবাসন অভিযানের মধ্যে ৪০০-এরও বেশি ঘটনায় এজেন্টদের অসদাচরণ বা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় এসিএলইউ উল্লেখ করেছে, মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল এজেন্টদের অভিযানে মার্কিন নাগরিক অ্যালেক্স প্রেটি ও রেনি গুড নিহত হওয়ার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সংগঠনটির দাবি, দেশজুড়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জাতিগত প্রোফাইলিং ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি ধারাবাহিক চিত্র দেখা যাচ্ছে। এসিএলইউর নীতি ও সরকারি বিষয়ক পরিচালক এবং প্রতিবেদনের লেখক নওরিন শাহ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি জাতীয় নির্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা স্কুল, বাসস্টপ ও মুদি দোকানের মতো সাধারণ স্থানকেও অভিবাসন অভিযানের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। তার ভাষায়, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বৃহত্তর নীতিগত সমস্যার অংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসন এজেন্টরা অনেক ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এসিএলইউ ৪১৮টি ঘটনার তথ্য উল্লেখ করেছে, যেখানে মানুষকে ধাক্কা দেওয়া, মাটিতে ফেলে দেওয়া, চেপে ধরা বা জোরপূর্বক আটক করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ৩৬১টি ঘটনায় রাসায়নিক উত্তেজক পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩২টি ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে এসব পদার্থ ব্যবহার করা হয় এবং ৮১টি ঘটনায় এমন কৌশলের অভিযোগ রয়েছে, যা শ্বাসকষ্ট তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে শিশুদের নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসিএলইউ জানিয়েছে, ২১৪ জন শিশুর ঘটনা তারা শনাক্ত করেছে, যারা হয় আটক হয়েছে, অভিবাসন অভিযানের লক্ষ্য হয়েছে অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসদাচরণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ জন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক শিশু।
এছাড়া প্রতিবেদনে ১৫৫ জন মার্কিন নাগরিকের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা অভিবাসন অভিযানে আটক, লক্ষ্যবস্তু বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার আচরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসিএলইউর দাবি, অভিবাসন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব সবসময় সুরক্ষা দিতে পারেনি।জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগও প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসিএলইউ বলেছে, ফেডারেল, রাজ্য ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ৪৩৭টি সম্ভাব্য জাতিগত প্রোফাইলিংয়ের ঘটনা তারা নথিভুক্ত করেছে। সংগঠনটির মতে, চেহারা, ভাষা বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে সন্দেহ করার প্রবণতা দেখা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসন অভিযান অনেক সময় তথাকথিত সংবেদনশীল স্থানের কাছাকাছিও পরিচালিত হয়েছে। এসিএলইউ ৪৯টি স্কুলের আশপাশে এমন অভিযানের ঘটনা উল্লেখ করেছে, যার মধ্যে ৪০টি স্কুলে নিরাপত্তাজনিত কারণে লকডাউন বা জরুরি ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল।শুধু অভিবাসীরাই নয়, সাংবাদিক, প্রতিবাদকারী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং কমিউনিটি পর্যবেক্ষকরাও এসব অভিযানের প্রভাবে পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এসিএলইউ জানিয়েছে, এসব গোষ্ঠীর ৭৮২ জন ব্যক্তি আটক, নজরদারি বা অসদাচরণের শিকার হয়েছেন।
প্রতিবেদনে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসিএলইউ অভিযোগ করেছে, অনেক এজেন্ট মুখ ঢেকে, চিহ্নবিহীন গাড়ি ব্যবহার করে এবং পরিচয় স্পষ্ট নয় এমন পোশাকে অভিযান পরিচালনা করেছেন। এর ফলে অনেক মানুষ বুঝতে পারেননি তারা সরকারি কর্মকর্তার মুখোমুখি হয়েছেন, নাকি কোনো অপরাধের শিকার হচ্ছেন।
সংগঠনটি আরো অভিযোগ করেছে, কংগ্রেস অভিবাসন সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা বাড়ানোর সুযোগ পেলেও সাম্প্রতিক অর্থায়ন আলোচনায় পর্যাপ্ত সংস্কার ছাড়াই অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। এসিএলইউ তাদের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির সুপারিশের মধ্যে রয়েছে লাখো অভিবাসীর জন্য নাগরিকত্বের পথ তৈরি করা, বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তে পরিবারকে একত্র রাখা ও শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম নতুন অভিবাসন কাঠামো গঠন করা, আইসের ২৮৭ (জি) কর্মসূচি বাতিল করা এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা।
এসিএলইউ বলেছে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তারা অভিবাসন নীতির প্রভাব নিয়ে আরো ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। সংগঠনটির লক্ষ্য হলো আইনপ্রণেতাদের সামনে এমন একটি অভিবাসন ব্যবস্থার প্রস্তাব তুলে ধরা, যা তাদের ভাষায় মানবাধিকার, পরিবার ও আইনি অভিবাসনের পথকে গুরুত্ব দেবে।