নিউইয়র্কের কুইন্সের ফ্লাশিং এলাকায় একটি মসজিদে জুমার নামাজ চলাকালে অস্ত্রসদৃশ বস্তু নিয়ে প্রবেশ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করার অভিযোগে বাফেলোর শেখ হকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পরে তদন্তে জানা যায়, তার কাছে থাকা বস্তুটি আসল আগ্নেয়াস্ত্র নয়, বরং একটি পেলেট গান বা বিবি গান ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি ঘটে গত ৩ জুলাই দুপুরে ফ্লাশিংয়ের ১৩৭-৫৮ জেরানিয়াম অ্যাভিনিউয়ে মুসলিম সেন্টার অব নিউইয়র্কে। দুপুর প্রায় ১টা ৩০ মিনিটে মসজিদের ভেতরে অস্ত্র নিয়ে এক ব্যক্তি অবস্থান করছেন এমন জরুরি কল পেয়ে এনওয়াইপিডির ১০৯তম প্রিসিংকটের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুমার নামাজ চলাকালে ওই ব্যক্তি অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। তিনি মুখে মাস্ক পরে মসজিদে প্রবেশ করেন এবং তার কাছে অস্ত্রের মতো দেখতে একটি বস্তু দেখা যায়। পরিস্থিতি গুরুতর বুঝতে পেরে মসজিদের একজন মুসল্লি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে নিয়ন্ত্রণে আনেন। একই সময় আরেকজন মুসল্লি পুলিশকে খবর দেন।
পরে পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে, ওই ব্যক্তির কাছে থাকা বস্তুটি একটি নকল পিস্তল বা পেলেট গান, যা দেখতে আসল আগ্নেয়াস্ত্রের মতো হলেও এতে প্রাণঘাতী গুলি ছোড়ার সক্ষমতা নেই। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কেউ আহত হননি এবং অভিযুক্তকে কোনো ধরনের সংঘর্ষ ছাড়াই হেফাজতে নেওয়া হয়।
অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম শেখ হক। তিনি ৩৩ বছর বয়সী এবং নিউইয়র্কের বাফেলোর অ্যাশলে স্ট্রিটের বাসিন্দা। তাকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করে ১০৯তম প্রিসিঙ্কটে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, শেখ হকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ডিগ্রির ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং দ্বিতীয় ডিগ্রির হয়রানি অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মসজিদে প্রবেশের পর হক তার বেসবল ক্যাপ খুলে মাথায় কাপড় ও মাস্ক পরেন। এরপর তিনি নিজের টাকা গুনছিলেন এবং বলেন, কেউ আমার টাকায় হাত দিলে সমস্যা হবে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশকে জানান, তিনি হকের প্যান্টের বাম কোমরের কাছে বন্দুকের মতো একটি বস্তু দেখতে পান। পরে হক যখন ডান হাত দিয়ে সেটির দিকে এগিয়ে যান, তখন ওই মুসল্লি দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দেন। আরেকজন মুসল্লি তার কোমর থেকে বস্তুটি সরিয়ে নিরাপদ স্থানে রাখেন এবং পুলিশ আসা পর্যন্ত তা নিজের কাছে রাখেন। পুলিশ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয় যে বস্তুটি একটি পেলেট গান, যা দেখতে পিস্তলের মতো। এতে প্রকৃত গুলি রাখার কোনো ম্যাগাজিন ছিল না এবং এটি স্প্রিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ধাতব বা প্লাস্টিকের ছোট বল ছোড়ার জন্য তৈরি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় শেখ হকের বিরুদ্ধে ঘৃণাজনিত অপরাধ বা হেট ক্রাইমের অভিযোগ আনা হয়নি, কারণ তদন্তে ধর্মীয় বিদ্বেষ বা পক্ষপাতমূলক উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সূত্র আরো জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের মধ্যে পূর্ব পরিচয় ছিল।
শেখ হককে ৫ জুলাই কুইন্স ক্রিমিনাল কোর্টে হাজির করা হয়। তিনি বিচারকের সামনে অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। কুইন্স ক্রিমিনাল কোর্টের বিচারক থমাস জি রাইট তার জন্য ১ ডলার নগদ জামিন নির্ধারণ করেন এবং আগামী ২৩ জুলাই পুনরায় আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র আরো জানিয়েছে, পেনসিলভেনিয়ার একটি পৃথক মামলায় তার বিরুদ্ধে থাকা একটি ওয়ারেন্টের কারণে তাকে আটক রাখা হয়েছে। ঘটনার পর মুসলিম সেন্টার অব নিউইয়র্কের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও স্থানীয় কর্মকর্তারা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মুসল্লিদের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
নিউইয়র্ক সিটি মেয়র মামদানি এবং সিটি কর্মকর্তারা বলেন, ঘটনাস্থলে থাকা এক এমটিএ কর্মী, একজন ট্যাক্সি চালক এবং এক নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ কর্মকর্তা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বড় ধরনের বিপদ এড়াতে সহায়তা করেন। মেয়র বলেন, প্রতিটি নিউইয়র্কবাসীরই উচিত নিরাপদে নিজ ধর্ম পালন করতে পারা।
তিনি কী উদ্দেশ্যে ফ্লাশিংয়ে গিয়েছিলেন এবং কেন এ ঘটনা ঘটিয়েছেন তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদিও এখনো এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘৃণামূলক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি, তবে স্থানীয় রাজনীতিবিদরা এটিকে ইসলামোফোবিয়ার একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নিউইয়র্ক অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস বলেন, ধর্মীয় উপাসনালয়ে এমন ঘটনা ভয়াবহ এবং অগ্রহণযোগ্য।
সিনেটর চাক শুমার বলেন, ধর্মীয় স্থানে সম্ভাব্য সহিংসতার এ ঘটনা গভীরভাবে উদ্বেগজনক, তবে দ্রুত মুসল্লিদের হস্তক্ষেপে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে। তিনি ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য গ্রেস মেং বলেন, ফ্লাশিংয়ের মুসলিম সেন্টার অব নিউইয়র্কে জুমার নামাজের সময় মুখোশ পরা এক ব্যক্তি প্রাণঘাতী অস্ত্রের মতো দেখতে একটি বস্তু বের করেছিলেন, যা পরে বিবি গান হিসেবে শনাক্ত হয়। তিনি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এগিয়ে আসা সাহসী মুসল্লিদের প্রশংসা করেন। গ্রেস মেং বলেন, কেউ আহত না হওয়ায় তিনি স্বস্তি প্রকাশ করছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সহিংসতা, ভয় দেখানো বা আতঙ্ক সৃষ্টি করার কোনো ঘটনা সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়, বিশেষ করে কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে এ ধরনের ঘটনা কখনোই কাম্য নয়।
নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সিটিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক অপরাধের সংখ্যা বছরের প্রথমার্ধে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪ থেকে ২১-এ পৌঁছেছে।