যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে হোয়াইট হাউসের বিভিন্ন কর্মসূচি ও ধর্মীয় বার্তা ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। নাগরিক অধিকার সংগঠন, ধর্মীয় গবেষক এবং বিভিন্ন সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে মূলত একটি খ্রিস্টান জাতি হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা যুক্তরাষ্টের বহুধর্মীয় ইতিহাস ও সংবিধানের ধর্মীয় স্বাধীনতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও ‘ঈশ্বরের অধীনে এক জাতি’ হিসেবে উৎসর্গ করব। তিনি আরো বলেন, আমি সবসময়ই বলে এসেছি, ধর্ম ছাড়া একটি মহান দেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদযাপন উপলক্ষে হোয়াইট হাউসের বিভিন্ন কর্মসূচিতে। মে মাসে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে অনুষ্ঠিত ‘রিডেডিকেট ২৫০’ নামের দিনব্যাপী প্রার্থনা সমাবেশে মূলত খ্রিস্টান ইভানজেলিক্যাল নেতাদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে একজন অর্থোডক্স ইহুদি রাব্বি এবং দুজন ক্যাথলিক বিশপ অংশ নিলেও মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ বা অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব ছিল না।
এছাড়া প্রশাসন দেশজুড়ে প্রতি সপ্তাহে এক ঘণ্টা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়ে একটি জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কিছু খ্রিস্টান প্রার্থনা ও একটি ইহুদি আশীর্বাদ নিয়ে একটি সরকারি নথিও প্রকাশ করেছে। সমালোচকদের মতে, এই উদ্যোগে দেশের ধর্মীয় বৈচিত্র্যের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি।
চার্চ ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের পক্ষে কাজ করা সংগঠন আমেরিকানস ইউনাইটেড ফর সেপারেশন অব চার্চ অ্যান্ড স্টেটের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা র্যাচেল লেজার বলেন, এ প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি তার ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদে নিহিত। ধর্মীয় ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা ফ্র্যাঙ্কলিন অ্যান্ড মার্শাল কলেজের অধ্যাপক ডেভিড ম্যাকমাহন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও এবারের উদযাপনে তাদের প্রায় সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। তার ভাষায়, উনিশ শতকে চীন ও ভারত থেকে আগত অভিবাসীরা ক্যালিফোর্নিয়ার স্বর্ণখনিতে কাজ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রেলপথ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পাশাপাশি যোগব্যায়াম, ধ্যান ও মাইন্ডফুলনেসের মতো অনুশীলন, যা হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত, বর্তমানে মার্কিন সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তার মতে, স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির মতো একটি ঐতিহাসিক মাইলফলকে এ বৈচিত্র্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরা উচিত ছিল।
মার্কিন মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও হোয়াইট হাউসের কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেয়ারের জাতীয় উপপরিচালক এডওয়ার্ড আহমেদ মিচেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মুসলিমদের অবদান বহু পুরোনো হলেও বর্তমান প্রশাসনের বার্তায় সেই ইতিহাসের যথাযথ প্রতিফলন নেই। তিনি উল্লেখ করেন, আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চল থেকে যেসব দাসকে জোরপূর্বক আমেরিকায় আনা হয়েছিল, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশই ছিলেন মুসলিম। দাসত্বের সময় তাদের অনেককে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয় অথবা গোপনে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখতে হয়েছে। তার মতে, এ ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় বৈচিত্রে্যর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মিচেল আরো বলেন, বর্তমানে মার্কিন মুসলিমরা রাজনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা, গণমাধ্যম, বিজ্ঞান ও খেলাধুলাসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তিনি বলেন, মুসলিমদের কোনো অনুষ্ঠান থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বা জাতীয় জীবন থেকে তাদের অবদান মুছে ফেলা সম্ভব নয়।
তিনি অভিযোগ করেন, চলতি বছরের শুরুতে হোয়াইট হাউসের ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী ফ্রিডম ট্রাকস-এ কিংবদন্তি বক্সার মুহাম্মদ আলী সম্পর্কে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। সেখানে দাবি করা হয়, তিনি জীবনের শেষ দিকে নিজের ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন। মিচেলের ভাষ্য, এ তথ্য ঐতিহাসিকভাবে ভুল এবং সংশোধনের অনুরোধ জানানো হলেও প্রশাসন এখনো তা সংশোধন করেনি।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউস এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রশাসনের মুখপাত্র টেইলর রজার্স এক বিবৃতিতে বলেন, রিডেডিকেট ২৫০ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল সংবিধানে নিশ্চিত করা ধর্মীয় স্বাধীনতার মূল্যবোধ উদযাপন করা এবং সব ধর্মবিশ্বাসী মানুষের জন্য স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরা। তার ভাষায়, ন্যাশনাল মলে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে ঈশ্বরের অধীনে এক জাতি হিসেবে পুনরায় অঙ্গীকার করার একটি ঐক্যের মুহূর্ত।
তবে সমালোচকদের মতে, বাস্তবে কর্মসূচির কাঠামো ও অংশগ্রহণকারীদের তালিকা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ধর্মীয় বৈচিত্রে্যর প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। র্যাচেল লেজার বলেন, স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তিতে এমন একটি উদযাপন হওয়া উচিত ছিল যেখানে সংবিধানপ্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সব ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো।
ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতিতেও চার্চ ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের ঐতিহ্য দুর্বল করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রশাসন ইতোমধ্যে একটি রিলিজিয়াস লিবার্টি কমিশন গঠন করেছে, যা ধর্মীয় স্বাধীনতা-সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। একই সময়ে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সরকারি স্কুলের শ্রেণিকক্ষে টেন কম্যান্ডমেন্টসপ্রদর্শন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং টেক্সাসে বাইবেলকে বাধ্যতামূলক পাঠ্যতালিকার অংশ করার সিদ্ধান্তও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২১ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, সরকারের কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা উচিত নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই জনমত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও সংবিধানে নিশ্চিত করা ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি জনগণের সমর্থনেরই প্রতিফলন।
স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদযাপনকে ঘিরে চলমান এ বিতর্ক আবারও সামনে নিয়ে এসেছে একটি পুরোনো প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্র কি কেবল একটি খ্রিস্টান ঐতিহ্যের রাষ্ট্র, নাকি এটি এমন একটি বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক দেশ, যার শক্তির মূল ভিত্তি ধর্মীয় স্বাধীনতা, বৈচিত্র্য এবং সব বিশ্বাসের মানুষের সমান সাংবিধানিক অধিকার।
স্বাধীনতা দিবসে নিউইয়র্কে গোলাগুলি, শিশুসহ আহত ৮
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের রাতে নিউইয়র্ক সিটির কোনি আইল্যান্ড এলাকায় গোলাগুলির ঘটনায় চার শিশুসহ অন্তত আটজন আহত হয়েছেন। রবিবার নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগের তথ্যের বরাতে এ খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার রাত প্রায় ১০টা ৩৭ মিনিটে ব্রুকলিনের ওয়েস্ট ৩১ নম্বর স্ট্রিটে গোলাগুলির খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। আহতদের মধ্যে রয়েছেন-দুজন পুরুষ, দুজন নারী এবং ৬, ৭, ১২ ও ১৪ বছর বয়সী চার শিশু। তাদের সবাইকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে ২১ বছর বয়সী এক নারীর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে অন্য সাতজনের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ ঘটনার কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।