নিউইয়র্ক সিটিতে অপরাধ কমেছে, বেড়েছে মুসলিম বিদ্বেষমূলক হামলা


দেশ ডেস্ক , আপডেট করা হয়েছে : 08-07-2026

নিউইয়র্ক সিটিতে অপরাধ কমেছে, বেড়েছে মুসলিম বিদ্বেষমূলক হামলা

নিউইয়র্ক সিটিতে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে হত্যা ও বন্দুক হামলার ঘটনা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত শহরে হত্যাকাণ্ড, গুলির ঘটনা এবং গুলিবিদ্ধের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। তবে এ ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি উদ্বেগের বিষয় হলো মুসলিম, ইহুদি এবং এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপরাধ বেড়েছে। একই সঙ্গে ধর্ষণের অভিযোগও আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত ১ জুলাই ম্যানহাটনের ওয়ান পুলিশ প্লাজায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিউইয়র্ক সিটির পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ এবং মেয়র জোহরান মামদানি চলতি বছরের প্রথমার্ধের অপরাধ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেন। কর্মকর্তারা জানান, ১৯৯৪ সালে কম্পস্ট্যাট পদ্ধতিতে অপরাধের তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে বছরের প্রথম ছয় মাসে এতো কম হত্যা ও গুলির ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি।

এনওয়াইপিডির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পুরো নিউইয়র্ক সিটিতে মোট ১২২টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এটি আগের সর্বনিম্ন রেকর্ড ২০১৭ সালের প্রথম ছয় মাসে সংঘটিত ১৩৬টি হত্যাকাণ্ডের তুলনায় ১৪টি কম। একই সঙ্গে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় হত্যাকাণ্ড কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ।

একই সময়ে শহরজুড়ে ৩২২টি গুলির ঘটনা তদন্ত করেছে পুলিশ। এর আগে বছরের প্রথম ছয় মাসে সর্বনিম্ন গুলির ঘটনার রেকর্ড ছিল ২০১৮ সালে, যখন ৩৩৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। চলতি বছরের সংখ্যা সেই রেকর্ডকেও অতিক্রম করেছে।পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, শুধু হত্যাকাণ্ড বা গুলির ঘটনাই নয়, গুলিবিদ্ধের সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সামগ্রিকভাবে নিউইয়র্ক সিটির প্রধান অপরাধের হারও কমেছে ৬ শতাংশ।

পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ বলেন, এ সাফল্য আকস্মিক নয়। এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ও তথ্যভিত্তিক পুলিশি কৌশল, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ধারাবাহিক অভিযান, সহিংস গ্যাং দমনে বিশেষ উদ্যোগ এবং বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি টহলের ফল।তার ভাষায়, পুলিশ সদস্যরা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার, সহিংস অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্ত মামলা গঠন, গ্রেফতার অভিযান এবং পায়ে হেঁটে টহল কার্যক্রম আরো জোরদার করেছেন। এর ফলেই নিউইয়র্ক ইতিহাসের সবচেয়ে নিরাপদ প্রথম ছয় মাস পার করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত মেয়র জোহরান মামদানি এ অর্জনকে নিউইয়র্ক সিটির জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন।তিনি বলেন, এটি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। প্রতিটি কমে যাওয়া হত্যাকাণ্ড বা গুলির ঘটনার অর্থ হলো একটি জীবন সহিংসতা থেকে রক্ষা পেয়েছে, একটি পরিবার তাদের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনটি দেখার হাত থেকে বেঁচে গেছে। মেয়র জানান, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে নিউইয়র্কের রাস্তাঘাট থেকে প্রায় আড়াই হাজার অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে এনওয়াইপিডি। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এই অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।

ব্রঙ্কসে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি

নিউইয়র্কের পাঁচটি বরোর মধ্যে অপরাধ কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে ব্রনক্সে -এ।পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় ব্রঙ্কসে প্রধান অপরাধ কমেছে ১২ শতাংশ। চলতি বছরের জুনের শেষ পর্যন্ত ব্রঙ্কসে মোট ১৩ হাজার ৪৩৪টি প্রধান অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ২০৮টি। ঐতিহাসিকভাবে নিউইয়র্ক সিটির মোট হত্যা ও গুলির ঘটনার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্রঙ্কসে সংঘটিত হয়। ফলে এ বরোতে অপরাধ কমে যাওয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।

জেসিকা টিশ বলেন, ব্রঙ্কসের জন্য এটি সত্যিই একটি ঐতিহাসিক অর্জন। তিনি জানান, সম্প্রতি ব্রঙ্কসে অতিরিক্ত ২০০ জন পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরো বরোটিকে দুটি পৃথক টহল কমান্ডে ভাগ করা হয়েছে, যাতে দ্রুত পুলিশি সাড়া, অধিক জনবল এবং আরো কার্যকর অপরাধ দমন সম্ভব হয়।

পাবলিক হাউজিং কমপ্লেক্সগুলোতে অপরাধও কমেছে

নিউইয়র্ক সিটির সরকারি আবাসন এলাকাগুলোতেও অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শহরের পাবলিক হাউজিং কমপ্লেক্সগুলোতে প্রথম ছয় মাসে অপরাধ কমেছে ৯ শতাংশ।গত বছরের একই সময়ে যেখানে ২ হাজার ৯০৫টি বড় অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছিল, সেখানে চলতি বছর সেই সংখ্যা কমে ২ হাজার ৬৫৯টিতে নেমে এসেছে।এনওয়াইপিডি একে সরকারি আবাসন এলাকায় অপরাধের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিক নিম্নমুখী প্রবণতা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

সব এলাকায় সমানভাবে কমেনি বন্দুক হামলা

যদিও পুরো শহরে গুলির ঘটনা কমেছে, কিছু এলাকায় উল্টো সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উত্তর ম্যানহাটনে গুলির ঘটনা ৩০টি থেকে বেড়ে ৩৮টিতে পৌঁছেছে, যা প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি। সেন্ট্রাল পার্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় ম্যানহাটনে গুলির ঘটনা ৮টি থেকে ১০টিতে বেড়েছে, যা প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব কুইন্সেও গুলির ঘটনা ২২টি থেকে ২৪টিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এই বৃদ্ধিগুলো শহরের সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার মতো বড় নয়, তবুও সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নজরদারি আরো বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মুসলিম বিদ্বেষমূলক অপরাধ উদ্বেগজনক বৃদ্ধি

অপরাধের সামগ্রিক হার কমলেও বিদ্বেষমূলক অপরাধের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এনওয়াইপিডির তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত হওয়া মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষমূলক অপরাধ ৫০ শতাংশ বেড়েছে।গত বছরের প্রথম ছয় মাসে যেখানে এমন ঘটনার সংখ্যা ছিল ১৪টি, চলতি বছরে তা বেড়ে ২১টিতে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক বিভাজন এবং ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রভাব বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণাজনিত অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও হামলা বেড়েছে

প্রথম ছয় মাসে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নিশ্চিত হওয়া বিদ্বেষমূলক অপরাধও বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। গত বছরের ২১টি ঘটনার পরিবর্তে চলতি বছরে এ ধরনের ঘটনা দাঁড়িয়েছে ৩৩টিতে। অন্যদিকে ইহুদিবিরোধী বিদ্বেষমূলক অপরাধও সামান্য বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের ১৭৪টি ঘটনার তুলনায় চলতি বছরে সংখ্যা বেড়ে ১৭৮টিতে পৌঁছেছে। এনওয়াইপিডি জানিয়েছে, তদন্তাধীন বিদ্বেষমূলক অপরাধের মোট ঘটনার ৫৫ শতাংশই ইহুদিবিরোধী।

ধর্ষণের অভিযোগ বেড়েছে কেন

সামগ্রিক অপরাধ কমলেও ধর্ষণের অভিযোগ প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে পুলিশ বলছে, এর অর্থ নতুন করে যৌন সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। জেসিকা টিশ জানান, চলতি বছরে দায়ের হওয়া ধর্ষণের প্রায় ২৬ শতাংশ অভিযোগই আগের বছরগুলোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে। অর্থাৎ বহু ভুক্তভোগী দীর্ঘদিন পর সাহস করে অভিযোগ দায়ের করছেন।

এছাড়া নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে কার্যকর হওয়া ‘রেপ ইজ রেপ অ্যাক্ট’ আইনের ফলে ধর্ষণের আইনি সংজ্ঞা আরো বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর কার্যকর হওয়া এ আইনের আওতায় সম্মতি ছাড়া সংঘটিত আরো বিভিন্ন ধরনের যৌন নির্যাতন এখন ধর্ষণের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ধর্ষণের মোট অভিযোগের ২০ শতাংশ এই নতুন আইনি সংজ্ঞার আওতায় পড়েছে। টিশ বলেন, আরো বেশি ভুক্তভোগী সামনে এসে অভিযোগ করছেন, এটিকে তারা ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। পুলিশ প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে এবং ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

অপরাধ কমলেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নিউইয়র্ক সিটিতে হত্যা, বন্দুক হামলা এবং বড় ধরনের অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া অবশ্যই ইতিবাচক খবর। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ধারাবাহিক অভিযান, তথ্যনির্ভর পুলিশিং, নির্দিষ্ট অপরাধপ্রবণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক নিরাপত্তা উদ্যোগ এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে একই সঙ্গে মুসলিম, ইহুদি এবং এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপরাধের বৃদ্ধি নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মুসলিমবিরোধী হামলা ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া দেখায় যে জননিরাপত্তার উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহনশীলতা রক্ষায় আরো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান নিউইয়র্ক সিটির জন্য একদিকে যেমন আশাব্যঞ্জক, অন্যদিকে বিদ্বেষমূলক অপরাধ ও যৌন সহিংসতার অভিযোগের মতো বিষয়গুলো মনে করিয়ে দেয় যে নিরাপদ শহর গড়ার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। অপরাধ দমনের পাশাপাশি সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা, সমঅধিকার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)