ইরানি আশ্রয়প্রার্থীদের গোপন তথ্য ইরানের কাছে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 08-07-2026

ইরানি আশ্রয়প্রার্থীদের গোপন তথ্য ইরানের কাছে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে এক বিস্ফোরক মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাওয়া ইরানি নাগরিকদের অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য অবৈধভাবে ইরান সরকারের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন ও আশ্রয়প্রার্থীদের গোপনীয়তা সংক্রান্ত ফেডারেল বিধিমালা লঙ্ঘিত হয়েছে এবং বহু ইরানির জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

৭ জুলাই মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউ এস ডিষ্ট্রিক্ট কোর্ট অফ ডিসির আদালতে দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন অভিবাসন সংস্থা এবং ইরান সরকারের মধ্যে সমন্বিতভাবে এমন একটি প্রক্রিয়া চালু করা হয়, যার মাধ্যমে অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) হেফাজতে থাকা ইরানি নাগরিকদের শনাক্ত করে তাদের ইরানে ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। কয়েক দশক ধরে দুই দেশের বৈরী সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই সহযোগিতা অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলাটি করেছে ইরানিয়ান আমেরিকান লিগ্যাল ডিফেন্স ফান্ড এবং পাবলিক সিটিজেন লিটিগেশন গ্রুপ। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর পাকিস্তানের দূতাবাসকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করে প্রতি মাসে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজন করত। এসব বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র এমন সব ইরানি অভিবাসীর বিস্তারিত ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করত, যাদের দেশটিতে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল।

মামলায় বলা হয়েছে, এসব তথ্যের মধ্যে আশ্রয়ের আবেদনপত্রে দেওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্যও ছিল। অনেক আবেদনকারী দাবি করেছিলেন, খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ, যৌন পরিচয় অথবা ২০২২ সালের নারী, জীবন, স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তারা ইরান সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব তথ্য ইরানের হাতে পৌঁছে যাওয়ায় আবেদনকারীদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আইসিই হেফাজতে থাকা বহু ইরানি আশ্রয়প্রার্থীকে জোর করে ইরানি সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বাধ্য করা হয়। ওই কর্মকর্তাদের কাছে আবেদনকারীদের আশ্রয় মামলার বিস্তারিত তথ্য আগে থেকেই ছিল। এমনকি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের সময়ও এই তথ্য আদান প্রদান অব্যাহত ছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ করা যেতে পারে। তবে ১৯৯০ এর দশকের শেষ দিকে প্রণীত ফেডারেল বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি আশ্রয়ের আবেদন করেছেন এমন তথ্য কিংবা তার আবেদন সংক্রান্ত তথ্য বিদেশি সরকারের কাছে প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ইরানিয়ান আমেরিকান লিগ্যাল ডিফেন্স ফান্ডের অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাহী পরিচালক আলি রাহনামা বলেন, কংগ্রেস বাধ্যতামূলকভাবে এই গোপনীয়তার সুরক্ষা দিয়েছে, কারণ মানুষের জীবন এর ওপর নির্ভর করে। কোনো প্রশাসন বা সরকারি সংস্থা এই আইন উপেক্ষা করতে পারে না। পাবলিক সিটিজেন লিটিগেশন গ্রুপের আইনজীবী মাইকেল কার্কপ্যাট্রিক বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলার মধ্যেও প্রশাসন মানুষের জীবন রক্ষার চেয়ে গণহারে বহিষ্কার কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

মামলায় ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, পররাষ্ট্র দপ্তর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব মার্কওয়েন মুলিনকে বিবাদী করা হয়েছে। জনস্বার্থভিত্তিক সংস্থা ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিল এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ৬০০ ইরানি নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। গত জুনে আটক ইরানিদের মধ্যে এক নারীকে আরও কয়েকজন অভিবাসীর সঙ্গে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে বহিষ্কার করা হয়, যা দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী, রাজনৈতিক নির্বাসিত ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের আশ্রয় দিয়ে আসছিল।

মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছিলেন যে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে হওয়া এক সমঝোতার আওতায় প্রায় ৪০০ ইরানি নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হতে পারে। একই বছরের সেপ্টেম্বর, ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিন দফায় বহিষ্কার ফ্লাইটে বহু ইরানিকে ফেরত পাঠানো হয়। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস সে সময় জানিয়েছিল, বহিষ্কৃতদের মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীও ছিলেন।

বাদীপক্ষ আদালতের কাছে আবেদন করেছে, ইরানি আশ্রয়প্রার্থীদের তথ্য ইরান সরকারের সঙ্গে ভাগাভাগি অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হোক এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে একজন স্বাধীন তদারকি কর্মকর্তা নিয়োগ করা হোক।এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ৬ লাখের বেশি অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং আরও প্রায় ১৯ লাখ অভিবাসী স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেছেন।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)