কঠোর অভিবাসন নীতিতে বিপাকে মার্কিন নাগরিকদের বিদেশি স্বামী-স্ত্রী


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 08-07-2026

কঠোর অভিবাসন নীতিতে বিপাকে মার্কিন নাগরিকদের বিদেশি স্বামী-স্ত্রী

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় আনা একের পর এক কঠোর নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব এবার পড়েছে এমন একটি শ্রেণির মানুষের ওপর, যারা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন অভিবাসন আইনে বিশেষ সুরক্ষা ও অগ্রাধিকার পেয়ে আসছিলেন। মার্কিন নাগরিকদের বিদেশি স্বামী বা স্ত্রীদের জন্য গ্রিন কার্ড, নাগরিকত্ব এবং বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হওয়ার প্রক্রিয়া এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর, দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। অভিবাসন আইনজীবী, অধিকারকর্মী এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতির কারণে বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। অনেকেই গ্রেপ্তার, দীর্ঘমেয়াদি আটক কিংবা বহিষ্কারের আশঙ্কায় অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও ভয় পাচ্ছেন।

দীর্ঘদিনের বিশেষ সুবিধা এখন প্রশ্নের মুখে

মার্কিন অভিবাসন আইনে নাগরিকদের স্বামী বা স্ত্রীদের বরাবরই ইমিডিয়েট রিলেটিভ বা নিকটাত্মীয় হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এই শ্রেণির আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে বার্ষিক ভিসা কোটার সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বৈধ অভিবাসন মর্যাদা হারিয়ে ফেললেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকেই গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রশাসন এই দীর্ঘদিনের নীতিগত সুবিধাকে কার্যত গুরুত্বহীন করে ফেলেছে। এখন মার্কিন নাগরিকদের বিদেশি স্বামী বা স্ত্রীদেরও অন্যান্য অভিবাসীদের মতোই কঠোর নজরদারি, অতিরিক্ত তদন্ত এবং বহিষ্কারের ঝুঁকির মধ্যে রাখা হচ্ছে।

আমেরিকান ইমিগ্রেশন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন এর সিনিয়র ডিরেক্টর শারভারি দালাল ধেইনি বলেন, মার্কিন আইন বরাবরই নাগরিকদের স্বামী বা স্ত্রীদের একটি বিশেষ শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন তাদেরও অন্যান্য অভিবাসীদের মতোই দেখছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান

অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, এটি নতুন কোনো নীতি নয়; বরং বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থার মুখপাত্র জ্যাক কাহলার এক বিবৃতিতে বলেন, গ্রিন কার্ড বা নাগরিকত্বের মতো অভিবাসন সুবিধা দেওয়ার আগে আবেদনকারীদের পরিচয়, অতীত ইতিহাস এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে আরও গভীরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, একজন মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করা বা ফর্ম আই ওয়ান থ্রি জিরো (পিটিশন ফর এলিয়েন রিলেটিভ) অনুমোদিত হওয়া কোনো ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ অভিবাসন মর্যাদা দেয় না। যারা অনুমতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন অথবা অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করছেন, তারা আইন অনুযায়ী বহিষ্কারের আওতায় পড়তে পারেন।

বাড়ছে পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা

অভিবাসী পরিবারগুলোর পক্ষে কাজ করা সংগঠন আমেরিকান ফ্যামিলিজ ইউনাইটেড জানিয়েছে, গত এক বছরে তাদের কাছে সহায়তা চাওয়া পরিবারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক অ্যাশলি ডি আজেভেডো বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ এবং দেশের বাইরে আরও প্রায় ৩ লাখ মানুষ তাদের সহায়তা চাইছেন। অনেক পরিবার ভয়ে স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে গেছে। আবার অনেক মার্কিন নাগরিকের বিদেশি স্বামী বা স্ত্রীকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আটক করেছে, যা অতীতে খুব কম দেখা যেত।তার ভাষায়, অনেক মানুষ মনে করছেন, আবেদন করলেই হয়তো তারা আটক হবেন। ফলে তারা বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে ভয় পাচ্ছেন।

কঠোর হচ্ছে গ্রিন কার্ড সাক্ষাৎকার

আইনজীবীরা বলছেন, বর্তমানে অভিবাসন কর্মকর্তাদের আরও বেশি সংখ্যক সাক্ষাৎকার নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীদের অতীত ভ্রমণ, নিজ দেশে ফিরে আবেদন করেছেন কি না, নৈতিক চরিত্রের প্রমাণ, আর্থিক নথি এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন তথ্য আগের তুলনায় অনেক বেশি খুঁটিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের ব্যাংক হিসাবসহ আর্থিক তথ্যও আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।ক্যালিফোর্নিয়ার অভিবাসন আইনজীবী এরিক ওয়েলশ বলেন, অনেক মার্কিন নাগরিক মনে করেন, বিয়ে করলেই তাদের স্বামী বা স্ত্রী নিশ্চিতভাবে গ্রিন কার্ড পাবেন। বাস্তবে বিষয়টি কখনোই এত সহজ ছিল না। এখন প্রক্রিয়াটি আরও কঠিন হয়ে গেছে।

গ্রিন কার্ডের বড় অংশ আসে পারিবারিক স্পনসরশিপে

মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর প্রায় ৩ লাখ ৪৩ হাজার মানুষ স্বামী বা স্ত্রীর মাধ্যমে গ্রিন কার্ড পেয়েছেন। এটি মোট গ্রিন কার্ড অনুমোদনের প্রায় ২৫ শতাংশ। সন্তান ও বাবা মায়ের মাধ্যমে পাওয়া গ্রিন কার্ড যুক্ত করলে পারিবারিক স্পনসরশিপই যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসনের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পারিবারিক আবেদন নিষ্পত্তিতে গড়ে প্রায় ১৩ মাস এবং বাগদত্তা বা বাগদত্তার ভিসা আবেদন নিষ্পত্তিতে গড়ে ৭ মাস সময় লাগছে।২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪০১টি নিকটাত্মীয়ের আবেদন এবং ৮ হাজার ৬১২টি বাগদত্তা ভিসার আবেদন অনুমোদিত হয়েছে।

আবেদনকারীদের মধ্যে বাড়ছে ভয়

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত তদন্ত, দীর্ঘসূত্রতা এবং বহিষ্কারের আশঙ্কা অনেক পরিবারকে অভিবাসন আবেদন জমা দেওয়া বা প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া থেকে বিরত রাখছে। অ্যাশলি ডি আজেভেডো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার চেষ্টা করা পরিবারগুলোর মধ্যেও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেই হয়তো তারা আরও বড় ঝুঁকিতে পড়বেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতির লক্ষ্য শুধু অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং বৈধ অভিবাসনের পথও আরও কঠিন করে তোলা। এর ফলে মার্কিন নাগরিকদের বিদেশি স্বামী বা স্ত্রীদের জন্য দীর্ঘদিনের আইনি অগ্রাধিকার কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ পরিবারগুলো। অনেক দম্পতি অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে আলাদা বসবাস করছেন, আবার অনেকে আইনি জটিলতার ভয়ে অভিবাসন আবেদনই স্থগিত করে রেখেছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পারিবারিক পুনর্মিলনভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থা এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)