কিছুক্ষণ আটকে রেখে কিংবা মুচলেকা দিয়ে চাঁদাবাজ ছেড়ে দেওয়া নিয়ে দেশে নানান ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি চাঁদাবাজ ধরা হলে তার সাথে আসলে কি ধরনের আচরণ করা হবে তা নিয়ে-ও আইন শূংখলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যরাও বিপাকে। এসব তথ্য জানা গেছে মাঠ পর্যায় থেকে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের একটি ঘটনায় সেখানে একজন সংসদ সদস্যের ছেলেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক করার পর জিজ্ঞাসাবাদ করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এমন পদ্ধতিকে অনেকে চাঁদাবাজদের পক্ষ থেকে সরকারকে এধরনের খয়রাত নেওয়া বলে অভিহিত করছেন।
এর কয়েকদিন আগে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটকের পর সাড়ে ১২ ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ৩ মে দুপুরে নগরীর শাসনগাছা এলাকা থেকে পুলিশ ও ডিবির একটি দল তাকে আটক করে। পরে তার কর্মী-সমর্থকদের বিক্ষোভ ও থানা ঘেরাওয়ের মুখে রাত ১২টার দিকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কোতোয়ালি থানা পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছিল। আর স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা-৫ আসনের এক সংসদ সদস্যের গাড়িবহর চলাকালে অটোরিকশাচালকরা চাঁদা আদায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন। এ সংক্রান্ত্র একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তার আটকের বিষয়টি ঘটে। কুমিল্লায় বিএনপি নেতাকে আটকে পর ছেড়ে দেওয়া প্রসঙ্গে এ বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার গণমাধ্যমে বলেন, রাত ১২টার দিকে বিএনপি নেতা রেজাউল কাইয়ুমকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমরা এসব বিষয় খতিয়ে দেখব।
মুচলেকা কি?
এখন দেখা যাক মুচলেকা কি এটা কিভাবে ব্যবহৃত হয়। মুচলেকা হলো একটি লিখিত আইনি অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে স্বীকার করেন যে, তিনি ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কোনো অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়াবেন না বা কোনো বিশেষ শর্ত ভঙ্গ করবেন না। কোনো ছোটখাটো অপরাধ, সন্দেহজনক কার্যকলাপ, বা জামিনযোগ্য মামলায় পুলিশ বা আদালত অনেক সময় অভিযুক্তকে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার শর্তে মুচলেকা নিয়ে মুক্তি দিয়ে থাকেন।
সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে জনমণে প্রশ্ন
তবে সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় মুচলেকা বা আটকের পর কিছুক্ষণ রেখে ছেড়ে দেওয়াকে চাঁদাবাজদের গ্রেফতার করে শক্ত শান্তি না দিয়ে আপ্যায়ন বা জামাই আদর বলে মনে করছেন অনেকে। কারো কারো মতে, বোঝাই যাচ্ছে এসব চাঁদাবাজরা উচ্চ পর্যায়ের। অথচ মাত্র কয়েকমাস আগে পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলমের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার এতে যুক্ত ছিলেন। এ সময় অপরাধ দমনে পুলিশকে আরও কঠোর হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয় চাঁদাবাজি, বেআইনি কর্মকান্ড, মবসহ বিশৃঙ্খল বিভিন্ন তৎপরতায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে ঊর্ধ্বতন কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হবে না। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা আইন মেনে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করবেন।
প্রশ্ন হচ্ছে এমন সিদ্ধান্তটি আসলে কোন শ্রেণীর চাঁদাবাজদের বেলায় নেওয়া হয়েছে? এটা কি সরকার দলীয় চাঁদাবাজদের বেলায় প্রয়োজ্য না? তা না হলে সম্প্রতি কয়েকটি আলোচিত ব্যক্তিদের বেলায় এর ব্যতয় হলো কেনো? তারা কি সব কিছুর উর্ধে? কারো মতে, এধরণের ঘটনায় কি আগামীতে অপরাধমূলক কর্মকান্ড, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির মূল হোতাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে কেউ সাহস পাবে?
সম্প্রতি মাঠ পর্যায়ের বিভিন্্ন তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে গণমাধ্যমে। এতে দেখা যায় সারা দেশে অপরাধমূলক কর্মকান্ড, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির মূল হোতারা প্রায়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। মূলত খুচরা অপরাধী ও কর্মীরা গ্রেপ্তার হলেও, নির্দেশদাতা ও গডফাদাররা অধরা থাকে। অপরাধের শিকার হয়েও স্থানীয়রা ভয়ে মুখ খুলতে সাহস করে না এবং সন্ত্রাসীরা জনবহুল এলাকায়ও প্রকাশ্যে হামলা চালিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
শেষ কথা..
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আটকের পর থানায় কিছুক্ষণ জামাই আদর কিংবা মুচলেকার নামে কতৃপক্ষতে কিছু খয়রাত দিয়ে পার পাওয়া চালু হলে কার লাভ? এতে করে তো জনগণ বিএনপি সরকারের ব্যপারে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করবে। এর পাশাপাশি এধরনের হালকা পদক্ষেপ নেওয়া হলো তো কেউ আর থানায় গিয়ে অপরাধমূলক কর্মকান্ড, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কেউ আর অভিযোগ করতে ভরসা পাবে না।
তবে কারো কারো মতে, এধরনের পরিস্থিতি চলমান থাকলে যেকোনো সময় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি একে ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দিতে পারে। তাই আগে ভাগে কঠোর হওয়া দরকার বলে অনেকে মনে করেন। অন্যদিকে মুচলেকা বা খয়রাত দিয়ে অপরাধমূলক কর্মকান্ড, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির মূল হোতাদের এভাবে দমনের চেষ্টা কোনোভাবেই জেনারেশন জেড বা সংক্ষেপে জেন জি প্রজন্ম মানবে না--এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকরা।