গানের কোনো সংখ্যা নেই তার খাতায়, নেই জনপ্রিয় বা কালজয়ী হওয়ার সস্তা কোনো প্রতিযোগিতা। ষাটের দশক থেকে শুরু করে আজ অবধি শুধু নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে সুরের সাধনা করে গেছেন তিনি। তিনি বাংলা গানের জীবন্ত কিংবদন্তি সৈয়দ আব্দুল হাদী। গত ১ জুলাই পূর্ণ করলেন জীবনের ৮৬টি বছর। জন্মদিন পেরিয়ে আসার পর এই গুণী শিল্পীর মুখোমুখি হওয়া, যেখানে উঠে এসেছে তার জীবনবোধ, জন্মদিনের অনুভূতি, সংগীতের বর্তমান ব্যস্ততা। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত পাঠকপ্রিয় দেশ পত্রিকাকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আলমগীর কবির
প্রশ্ন: গত ১ জুলাই আপনার ৮৬তম জন্মদিন কাটল। জীবনের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর, আপনার দৃষ্টিতে জীবনের প্রকৃত অর্থ কী?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: জীবন আমার কাছে কী, তা আমার আত্মজীবনীমূলক বই ‘জীবনের গান’ লিখতে গিয়ে শেক্সপিয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তিটি দিয়ে উল্লেখ করেছিলাম ‘লাইফ ইজ আ টেল টোল্ড বাই অ্যান ইডিয়ট, ফুল অব সাউন্ড অ্যান্ড ফিউরি, সিগনিফাইয়িং নাথিং’ (জীবন এক বোকার বলা গল্প, যা চিৎকার আর উন্মাদনায় ভরা, কিন্তু আদতে যার কোনো অর্থ নেই)। এতগুলো বছর পার করে এসে আজ আমারও মনে হয়, এটাই জীবনের আসল রূপ।
প্রশ্ন: এবার জন্মদিনের ঠিক পরপরই আপনার জীবন নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘গল্প আছে এখানে...’ মুক্তি পাচ্ছে। এটি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কেমন?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: এর আগে আমার জীবন নিয়ে এক ঘণ্টার বেশি দৈর্ঘ্যের একটা সুন্দর তথ্যচিত্র বানিয়েছিল ‘বাংলা ঢোল’। তরুণ লেখক সাদাত হোসাইন এটি তৈরি করেছিল। লেখক মানুষ হওয়ায় তার নির্মাণে একটা দারুণ সৃজনশীলতা ও চমৎকার উপস্থাপন ছিল, যা আমার খুব ভালো লেগেছে। আর এবারের তথ্যচিত্রটি যিনি করেছেন, সেই শাইখ সিরাজ তো দীর্ঘ সময়ের কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন টেলিভিশনের মানুষ। আমি এখনো এটি দেখার সুযোগ পাইনি, তবে শুটিংয়ের সময়ের অভিজ্ঞতা বেশ ভালো ছিল। আশা করছি কাজটি ভালোই হবে।
প্রশ্ন: এত দীর্ঘ এক বর্ণিল জীবন, এখন পেছন ফিরে পর্দায় নিজের যাপিত জীবন দেখলে কোন স্মৃতিগুলো আপনাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: এ ধরনের আয়োজনে বা তথ্যচিত্রে যখনই পিতা-মাতার কথা আসে, আমি ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। এছাড়া আমার শৈশবের দিনগুলো, বিশেষ করে আগরতলার দিনগুলোর কথা মনে পড়লে মনটা নরম হয়ে যায়। সংগীতজীবনেরও অনেক ঘটনা আছে এবং আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি যে এমন সব সুন্দর অভিজ্ঞতা আমার জীবনে ঘটেছে। তবে সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুত করে মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, শুধু ভালোবাসা যথেষ্ট নয়; ভালোবাসার সঙ্গে শ্রদ্ধা থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি। যে ভালোবাসায় শ্রদ্ধা নেই, তার কোনো অর্থ আমার কাছে নেই।
প্রশ্ন: আপনার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গানের সংখ্যা নিয়ে এক ধরনের রহস্য বা অস্পষ্টতা আছে। আসলে একজীবনে কতগুলো গানে কণ্ঠ দিয়েছেন আপনি?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: এই প্রশ্নের উত্তর আমি কখনোই দিই না। অনেকেই দেখি অনায়াসে বলে দেন ১০ হাজার, ১২ হাজার বা ২০ হাজারের বেশি গান গেয়েছেন। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক গান গাওয়া চাট্টিখানি কথা না। আমি নিজেকে এতটা ভাগ্যবান বা অতিমানব মনে করি না। নিজেকে বলি, আমার গান পাঁচ শ-ও হতে পারে, আবার পাঁচ হাজারও হতে পারে। বড় কথা হলো, গান গাইবার সময় আমি কখনো হিসাব কষিনি বা ভাবিনি গানটা কতটা জনপ্রিয় বা কালজয়ী হবে। আমার লক্ষ্য ছিল শুধু নিজের সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ শিল্পসম্মতভাবে গানটা গাওয়ার চেষ্টা করা।
প্রশ্ন: এখন তো আগের মতো রেকর্ডিং বা স্টুডিওর ব্যস্ততা নেই। সংগীতের এই প্রাত্যহিক ব্যস্ততাহীন সময়টা কীভাবে কাটছে?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: এখন আমি পেশাগত গানের জগৎ থেকে একেবারে দূরে। তবে মজার ব্যাপার হলো, পেশাদারভাবে গাই না বলেই এখন আমি প্রতিদিন গান গাই! ভেতরে যে গানের তৃষ্ণা, সেটা তো এই জীবনে শেষ হওয়ার নয়। শৈশব থেকেই গানের সঙ্গে আমার প্রেম। পেশাদার গান কেন ছেড়েছি, সেই ব্যাখ্যায় না যাই; তবে ভেতরে ভেতরে সারাক্ষণই গুনগুন করতে থাকি। প্রতিনিয়ত মনের ভেতর নতুন নতুন সুরের তোলপাড় হয়, যা হয়তো মুখে উচ্চারিত হয় না। কেউ খুব খেয়াল করলে বুঝবেন, আওয়াজ বের না হলেও আমি ভেতরে গান গেয়ে চলেছি।
প্রশ্ন: মনের ভেতর যে নতুন নতুন সুরের তোলপাড় চলে, এগুলোকে ধরে রাখা বা রেকর্ড করার তাগিদ অনুভব করেন না?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: আমি কিন্তু একসময় প্রচুর গানের সুর করেছি, অনেক জনপ্রিয় গানও আমার সুরে হয়েছে। তবে ওইসব গানও কোনো পূর্বপরিকল্পনা করে করা হয়নি, করেছি স্রেফ মনের আনন্দে। সুরকার হিসেবে নাম কামাতে হবে- এমন ভেবে কখনো বসিনি। মন যখন সায় দিয়েছে, সুর করেছি। ইদানীং যেমন কয়েকদিন ধরে বনি এম-এর ‘রাসপুটিন’ গানটা মাথায় ঘুরছে, সেটাই গুনগুন করছি। আবার হয়তো কাল অন্য কোনো সুর মাথায় ঢুকবে, তখন সেটা নিয়েই মগ্ন থাকব। রেকর্ডিংয়ের চেয়ে এই মনের ভেতরের আনন্দটাই এখন আমার কাছে বড়।
প্রশ্ন: জীবনসংগ্রামের সেই শুরুর দিনগুলো থেকে আজকের এই অবস্থানে আসার পথে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় উপলব্ধি বা শিক্ষা কী?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: যখন রেডিওতে কাজ শুরু করি, বয়স চব্বিশ-পঁচিশ হবে, তখন বিখ্যাত শিল্পী আব্দুল লতিফ ভাই আমাকে একটা কথা বলেছিলেন ‘দেখ, কোনো দিন খ্যাতির পেছনে ছুটবি না, একদিন দেখবি খ্যাতিই তোর পেছনে ছুটবে।’ কথাটা তখনই আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল। আমি জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই পরিকল্পনা করে বা ‘এটা আমাকে পেতেই হবে’ এমন অন্ধ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চলিনি। স্বাভাবিক নিয়মে যা এসেছে, সাদরে গ্রহণ করেছি। শিল্পী হিসেবে শুধু নিজের সাধ্যমতো সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে গেছি।
প্রশ্ন: আজ যদি আপনি ২৫ বছরের তরুণ সেই সৈয়দ আব্দুল হাদীর মুখোমুখি দাঁড়ানোর সুযোগ পেতেন, তাকে কী পরামর্শ দিতেন?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: ওই যে বললাম, আমার জীবনে কোনো পরিকল্পনা ছিল না, কোনো কিছু পাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগিনি। এখন জীবনের এই প্রান্তে এসে মনে হয়, এটা হয়তো এক ধরনের ভুল ছিল। মানুষের জীবনে আকাঙ্ক্ষা বা লক্ষ্য থাকতে হয়, আকাঙ্ক্ষা ছাড়া বড় অর্জন সম্ভব নয়। তাই তরুণ নিজেকে পেলে বলতাম, জীবনের ভুলগুলো যেন সংশোধন করে নেয়।
প্রশ্ন: এই যে পরিকল্পনাহীনতার কথা বললেন, এটা নিয়ে মনে কোনো আফসোস বা অনুশোচনা কাজ করে?
সৈয়দ আব্দুল হাদী: ভুলত্রুটি তো সব মানুষের জীবনেই থাকে। কেউ সেটা বোঝে, কেউ বোঝে না। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গানটার মতো করেই আমি ভাবি ‘ওগো, যা পেয়েছি / সেইটুকুতেই খুশি আমার মন / কেন একলা বসে হিসেবে কষে / নিজেরে আর কাঁদাই অকারণ।’ যা পেয়েছি, জীবনে সেটাই বা কম কী! তাই আফসোসের কোনো জায়গা নেই।