৫ আগস্টের একক কৃতিত্ব দাবীদারদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ


সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ , আপডেট করা হয়েছে : 08-07-2026

৫ আগস্টের একক কৃতিত্ব দাবীদারদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ

জুলাই আন্দোলনে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন শহীদ হয়েছেন তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন। তাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৫ আগস্ট যে অর্জন আমরা করেছি তা একক কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। দেশের প্রতিটি গণতন্ত্রকামী মানুষের অর্জন। জনতার সম্মিলিত ত্যাগের ফসল। গত ৪ জুলাই শনিবার সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কথাগুলি বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর মুখে কেনো একথা

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেনো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এখনো বলতে হচ্ছে ৫ আগস্ট জনতার সম্মিলিত ত্যাগের ফসল? কারো কারো মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে একটি রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র সংগঠন দাবি করতে থাকে যে জুলাই বিপ্লবে তারা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। তারাই ওই আন্দোলনের প্রকৃত মাস্টামাইন্ড। দলটির পক্ষ তাদের নেতাকর্মীরা এধরনের বক্তব্যের পর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের বিভাজন আসতে শুরু করেছে। এরা আগেও এ-ই দলটি একক কৃতিত্ব জাহির করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকারকে ওই সময়ে বিভক্তিটি খুব কৌশলে কাজে লাগিয়েছে। তারা রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি প্রশাসন, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তাদের আদর্শের ভাবধারায় বিশ্বাসীদের ওইসব সেক্টরে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। আর এভাবে কৌশলে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রক্তমাখা ইমেজকে পুজি করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকারকে প্রায় পুরোপুরি কব্জা করে ফেলে। আর অন্যদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন জুলাই বিপ্লবীদের রক্তমাখা আন্দোলনের ব্যাপারে বেশ দুর্বল। কারো কারো মতে, এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকারকে চরমভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে নেয় ওই রাজনৈতিক দলটি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সেই সময়ে কোমলমতি ইমেজকে কাছে লাগিয়ে একটি রাজনৈতিক দল উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন করার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যায়। অন্যদিকে দীর্ঘ দেড়যুগ ধরে আওযামী লীগের নেতৃত্বাধীন গুম-খুন-ফ্যসিবাদি শাসনের অবসান করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকারের ধারে কাছেও বিএনপি কেউ ভিড়তেই পারেনি। বলা যায় ওই সময়ে আসলে বিএনপি রাজনৈতিক অঙ্গনে বলা চলে পুরো কোনঠাসা হয়ে পড়ে। এমন কি একপর্যায়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, দেখা দিয়েছিল নানান ধরনের জটিলতা। কখনো জটিলতা তৈরি করা হয় জুলাই সনদের নামে। কখনো চেষ্টা করা হয় জুলাই বিপ্লবীদের বিএনপির বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর মধ্য দিয়ে। কখনো ছাত্রদের ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে জাতীয় সরকার গঠনের আওয়াজ তুলে। এখনো জুলাই বিপ্লবীদের ইমেজকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি সরকারের ওপর একধরনের ছড়ি ঘোরাতে তারা নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। চেষ্টা করে যাচ্ছে মাঠ ঘোলা করতে। আর এসব কারণে প্রধানমন্ত্রী মুখ খুলেছেন এই বলে যে, ৫ আগস্ট জনতার সম্মিলিত ত্যাগের ফসল। একক কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়..। 

এতে লাভ ও ক্ষতি কার?

প্রশ্ন হচ্ছে জুলাই বিপ্লবীদের দলীয়করণ বা কোনো দলের একক কৃতিত্ব জাহির করলে আসলে কারা লাভবান হবে? এমন প্রচারণা আসলে কার লাভ ও ক্ষতি- এ-প্রশ্ন এখন সর্বত্র ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে একক কৃতিত্বের দাবিদারদের প্রকৃত উদেশ্য..।

কারা প্রকৃত জুলাই বিপ্লবী?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই বিপ্লবীদের দলীয়করণ বা কোনো দলের একক কৃতিত্ব যারা জাহির করে যাচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য বা মতলব বোঝার কয়েকটি বিষয় ও পরিবেশ বোঝা দরকার। আগে জানা দরকার কারা কারা এই পুরো আন্দোলনে আসল দাবিদার হওয়ার যোগ্য? এব্যাপারে একুট পেছনে ফিরে তাকানো দরকার বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। তাহলে দেখা যাবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্র-জনতার যে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান গড়ে ওঠে, তা জুলাই বিপ্লব নামে পরিচিতি পায়। এই বিপ্লবের ফলে দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকুরিতে বিতর্কিত কোটা ব্যবস্থার প্রতিবাদে এই আন্দোলন শুরু হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-এর নেতৃত্বে সারা দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে।

সফল হয় যখন সবাই আন্দোলনে অংশ নেয়

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক দাবি, এবং নির্মম গণহত্যার প্রতিবাদে আপামর জনসাধারণের একাত্মতার ফলেই সফল হয়। শিক্ষার্থীদের অদম্য সাহস এবং সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এই গণ-অভ্যুত্থান ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের মাধ্যমে চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করে। আন্দোলনটি কোটা সংস্কারের মতো একটি অত্যন্ত যৌক্তিক দাবির ভিত্তিতে শুরু হয়েছিল, যা সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের স্বার্থের সাথে সরাসরি জড়িত ছিল। আর এমন আন্দোলনে যখন ছাত্র-জনতার ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণ ও হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে শুধু শিক্ষার্থী নয়, বরং অভিভাবক, পেশাজীবী, শ্রমিকসহ সর্বন্তরের সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। কেননা আন্দোলন পরিচালনায় একটি সমন্বিত ও বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব গড়ে ওঠেছিল। একারণে পরবর্তীতে কোটা সংস্কারের গন্ডি পেরিয়ে ’এক দফা’ দাবি-অর্থাৎ সরকার পতনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, যা আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ রাখে। এক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাককআউট এবং কঠোর বলপ্রয়োগ করা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছেড়ে যাননি বরং শহীদদের আত্মত্যাগের ফলে আন্দোলন আরও তীব্র রূপ নেয়। আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে সারা দেশে কারফিউ ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করা হয়, যা বিশ্ব থেকে বাংলাদেশকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সহিংস দমন-পীড়ন ও সহস্রাধিক প্রাণহানির পর, আন্দোলন এক দফার রূপ নেয়। আর এমন আন্দোলননে একপর্যায়ে এতে দলমত নির্বিশেষে পুরো সর্বস্তরের জনগণ নেমে পড়ে। শেষমেষ ২০২৪-এর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এর মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। ফলে দেখা যায় পুরো আন্দোলনে ছাত্রদেরকে কোনো দল বা মতের অধিকারী না মনে করে একে সর্বদলীয় মঞ্চ মনে করেই সকলে এতে অংশ নেয়। এসব বিষয়গুলো বিশ্লেষন করলে দেখা যাবে জুলাই বিপ্লবে কোনো একক নির্দিষ্ট আদর্শ বা দলের অনুসারী নয়, বরং বৈষম্য, দুর্নীতি, দুঃশাসন ও কর্তৃত্ববাদের অবসানের সর্বজনীন আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছিল। 

জুলাই বিপ্লবীরা বিতর্কিত হবে, বৃথা যাবে তাদের আত্মত্যাগ

কিন্তু কেউ যদি সেই ধরনের একটি আন্দোলনকে নিজ দলের পকেটে নিয়ে ক্যাশ করে নিতে চায় তাহলে তা পদে পদে প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে অনেকে মনে করেন। পুরো আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থী যারা শ্রেফ নেমেছিল তাদের নিজস্ব দাবিতে সেটা মারাত্মভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। সে-টা হবে এই বয়ানে যে, জুলাই বিপ্লবীরা আসলে কোনো উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কৌশল কাজ করেছে। এমন আন্দোলনকে কেউ ওই দলের সম্পত্তি মনে করলে আসলে উগ্রপন্থী বা কোনো স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায়নে করা হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। এতে করে জুলাই বিপ্লবে শহীদ হওয়া সন্তান কিংবা যারা অংশ নিয়েছে সবাইকে উগ্রপন্থী বা কোনো স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত বলে নতুন বির্তক দেখা দিবে। যা তাদের যা ভবিষ্যতের যাত্রা পথকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একারণেই দেখা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইমেজকে পুঁজি করে গঠন করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে যাওযার সিদ্ধান্ত নেয় তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ নেতাদের অনেকেই দলের এই অবস্থানকে ’আত্মঘাতী’ অ্যাখ্যা দিয়ে পদত্যাগ করেছেন এবং এই পদক্ষেপ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন। কেননা তারা বুঝতে পেরেছেন যে ‘জুলাই আন্দোলন’ ছিলো সর্বস্তনের জনগণের সেন্টিমেন্টকে ধারণ করেই হয়েছিল। কেননা ফ্যাসিবাদি শাসনামলের সাধারণ নির্বাচনে তরুণদের একটি বিরাট অংশ ওইসব নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি..পারেনি প্রাণখুলে মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশে কথা বলতে। তা-ই জুলাই বিপ্লবীদের সে-ই অনুভুতিকে এখন কেউ তা নিজেদের সম্পত্তি মনে করলে আসলে ভবিষ্যত জাতিকে চরম মাসুল দিতে হবে। সেক্ষেত্রে পুরো আন্দোলন যা-তে সবদলমতের সাধারণ শিক্ষার্থী ও তাদের সাথে যোগ দেওয়া সর্বস্তরের শ্রেণী প্রেশার মানুষের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ বিতর্কিত হয়ে যেতে পারে। একারণে ভবিষ্যত প্রজন্মকে উগ্রবাদী হিসাবে পরিচিতির কালিমা থেকে রেহাই দিতে ‘৫ আগস্ট’ জনতার সম্মিলিত ত্যাগের ফসল বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেছেন কি-না তা সময় বলে দেবে। 

একই আশঙ্কা মাহফুজ আলম

এদিকে সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তাঁর একটি ফেসবুক পোস্টেও একিই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এতে তিনি উগ্র ডানপন্থী ’ফার-রাইট' গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। এতে তিনি চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে একটি সর্বজনীন আন্দোলনের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট ’ইসলামি’ বা ’পুনর্জাগরণবাদী’ বিপ্লব হিসেবে প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। এর ফলে ধর্মনিরপেক্ষ ও মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী মধ্যবিত্ত শ্রেণির মনে জুলাই আন্দোলন নিয়ে এক ধরনের বীতশ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে বলে দাবি তার।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)