ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান। তার যাওয়ার পর পর বাংলাদেশের টালমাটাল অবস্থায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক ভিডিও বার্তা দেন। এতে তিনি দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি সবাইকে প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার পথ পরিহার করে শান্তভাবে বিজয় উদযাপনের এবং কারো হাতে আইন তুলে না নেওয়ার অনুরোধ করেন। ওই সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভিডিও বার্তাকে দলমত নির্বিশেষে দলটির প্রতি বড়ো ধরনের আস্থা তৈরি হয়। এর পাশাপাশি তারেক রহমানের অহিংস নীতি দেশে বিদেশে প্রশংসিত হয়।
ঘটনা-২
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের মানুষের, বিশেষত নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে গত মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করে জনগণের কাছে প্রসংশিত হন।
ঘটনা-৩
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য ধাপে ধাপে ইউনিফর্ম ও জুতা সরবরাহের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে একটি পাইলট (পরীক্ষামূলক) কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত পোশাক ও জুতা বিতরণের কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। সারাদেশে সরকারের এমন ঘোষণা বিএনপির প্রতি অনেক আস্থা তৈরি করেছে।
ঘটনা চার...বৈদেশিক ক্ষেত্রে..
বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি সাইপ্রাসের কূটনীতিক আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে হারিয়ে এই মর্যাদাপূর্ণ পদে জয়লাভ প্রক্ষান্তরে বাংলাদেশের পাশাপাশি বিএনপি সরকারের আন্তর্জাতিক ইমেজকে দেশে বিদেশের দরবারে অনেক উঁচু স্থান দিয়েছে।
এদিকে ২০২০ সালে ডিসেম্বরে তুরস্কের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত সাভাসগলু ঢাকা সফর করেছিলেন। এর ছয় বছরের মাথায় তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশে এলেন। তিন দিনের সফর শেষে ফিরে গেছেন তিনি। এটিও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অন্য মাত্রা দিচ্ছে। আবার দেখা গেলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তিন দিনের এক সরকারি সফরে রাশিয়া গেছেন। বলা হচ্ছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের মধ্যে মস্কোতে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হবে। এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়েও মতবিনিময় হবে।
এবার অন্যরকম খবরে সয়লাব বাংলাদেশ
উপরের এসব ইতিবাচক খবর ম্নান হয়ে যাচ্ছে দেশের ভেতরে বিভিন্ন ঘটনা..। এসব ক্ষেত্রে প্রথমেই নজরে আনতে হয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর প্রতিবেদন। এতে বলা হচ্ছে সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সারা দেশে ৬০৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি এবং একই সময়ে ১৯৫টি অপহরণ ও প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি নারী ও শিশু নির্যাতন বা সহিংসতার ঘটনাও রেকর্ড করা হয়েছে।
বেড়েছে মব
এদিকে দেশে সন্দেহ, গুজব ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা (মব ভায়োলেন্স বা মব জাস্টিস) বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে মব সহিংসতা বা গণপিটুনির ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যমতে, মে মাসে মব হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন, যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে ৬৬টি মব সহিংসতায় ৩১ জনের মৃত্যুএবং ৬৮ জন আহতের কথা বলা হয়েছে।
ছিনতাইয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ
এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এখন ছিনতাই-চাঁদাবাজ নিয়ে প্রতিনিয়ত খবর প্রকাশিত। ছিনতাইয়ে বাধা দিলেই গুলি-কোপ দেওয়া হচ্ছে বলে আশঙ্কাজনক খবরের পত্রিকার পাতা ভারি হচ্ছে। অথচ দাবি করা হয় যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে। বলা হচ্ছে সর্বশেষ বিশেষ অভিযানে ১ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত এক হাজার ১০৬ জন সন্ত্রাসী, দস্যু, ছিনতাইকারী ও ডাকাত গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। এর মধ্যে কিছু তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীও আছে। গণমাধ্যমের খবরেই বলা হচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক ছিনতাইয়ের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযানে অপরাধীরা গ্রেপ্তার হওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বলা হচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানিয়েছে, ডিএমপির হালনাগাদ তালিকায় রাজধানীতে এক হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারীর নাম এসেছে।
বাস্তবে কি
গণমাধ্যমে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে বলে প্রচার করা হচ্ছে আবার ১০০ দিনে ৬০৫ খুন: পরিসংখ্যান উপস্থাপনের ধরন নিয়ে যখন পুলিশের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, ঠিক তখন বাস্তবে অন্য দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। দেখা গেলো রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সম্প্রতি চাপাতির মুখে দুই বোনের লাগেজ ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। দেখা গেলো রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদমান সাকিব নামে এক শিক্ষার্থী ছিনতাইয়ের শিকার হন। ছিনতাইকারীরা তাঁকে শ্যামলী বাসস্ট্যান্ড থেকে পাশের গলিতে নিয়ে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। এরপর গলিতে আটকে রেখে তাঁর পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। আবার দেখা গেলো রাজধানীর রমনার মৌচাক এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে।
এখনো পুলিশ অসহায়?
এদিকে গণমাধ্যমের খবরে দেখা যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে অনেকটা গতি ফিরলেও অভিযানে গিয়ে একের পর এক হামলার শিকার হওয়ায় ঘটছে ছন্দপতন। এমনকি অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানের মধ্যেও থেমে নেই আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। চলতি মাসে এ পর্যন্ত ঢাকাসহ ৯ জেলায় অন্তত ১৩টি স্থানে হামলা হয়েছে। এতে আহত হন পুলিশ ও র্যাবের অন্তত ৩২ সদস্য। এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম চার মাসে আরও ২১৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। পৃথক ঘটনায় সিলেট ও চট্টগ্রামে মারাও গেছেন পুলিশ ও র্যাবের দুই সদস্য।
প্রশ্ন এসবের নেপথ্যে কারা?
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে সারাদেশে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে পট পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় ‘মব’ ও হামলার শিকার হতে থাকলে পুলিশের মনোবল ভেঙে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এখনো কেনো তা অব্যাহত আছে। সিলেটে এক মাদক কারবারির ছুরিকাঘাতে ইমন আচার্য্য নামের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব-৯) একজন সদস্য নিহত হন। চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়ায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনাকে কে›ন্দ্র করে পুলিশকে ছয় ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। কয়েকটি জায়গায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছে পুলিশ। কারো কারো মতে, পুলিশ সদস্য মামলা, সংযুক্তি, প্রত্যাহার ও চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন মনে করে তারা আতঙ্কে রয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে এখন-কো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থদের সে-ই তেজ বা ইমেজও নেই। তাহলে কারা এখন পুলিশকে তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা দিচ্ছে? এখন কেনো অপরাধীরা আগের মতো সুযোগ নিচ্ছেন। তারা এখনে কেনো কিভাবে নানান অজুহাতে পুলিশকে দোষারোপ করে একটি রাজনৈতিক দলের লেবাস লাগিয়ে দিয়ে তাদেরকে অসহায় অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে? অনেকে এর পেছনে ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণীর হাই ব্রিপ নেতাকর্মীদের দোষারোপ করছে। কেননা গণমাধ্যমের খবের দেখা গেছে এক চাদাবাজকে ধরতে গেলেই কিভাবে ক্ষমতাসীন দলের দাপট দেখানো হয়। কাউকে আটক করলেই থানা ঘেরাও করে ফেলে। কারো কারো মতে, রাজনৈতিক দলের এমন আচরণে বর্তমানেও সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ করা নিয়ে তাদের মধ্যে দোদুল্যমানতা দেখা দিচ্ছে। অপরাধী এখন মনে করতে শুরু করেছে যে, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করা হলে অপকর্মে জড়ালে শক্ত ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে না।
বাড়ছে ঝটিকা মিছিল.. ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে..
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত। পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আসামি শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনায় আইনমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পাশাপাশি দেশবাসীও সন্তুষ্ঠ হয়েছেন। কিন্তু প্রতিদিন যেভাবে দেশের ভেতরে নেতিবাচক খবরে জনগণ আতঙ্কিত হয়ে উঠছেন কারো কারো মতে, পরিস্থিতি অন্যদিকে টার্ন নিতে বেশি সময় লাগবে না। এর কিছু কিছ নমুনা দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। গাজীপুর সদরের ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের রুদ্রপুর এলাকায় ঘটে গেছে এমন একটি ঘটনা। সেখানে ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে যুবদলের এক নেতাকে পুলিশে সোপর্দ করেছেন স্থানীয়রা। এর আগে তাঁকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। গাজীপুর সদরের ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের রুদ্রপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত সাব্বির আহমেদ শামীম ইউনিয়ন যুবদলের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাংগঠনিক সম্পাদক। কারো কারো মতে, সরকার আইন শৃংখলা রক্ষার পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের মাথাচারাভাব কিংবা তাদের বেপারোয়া ভাব রুখে দিতে পারলে পরিস্থিতি অন্যদিকে রূপ নিতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে গাজীপুর সদরের ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের রুদ্রপুরে মতো ঘটনা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে রাজনীতির মোড় ঘুড়িয়ে দিতে পারে। কেননা ইতোমধ্যে দেশজুড়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রাজনীেিত সক্রিয় বিএনপির একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাজনৈতিক দলগুািলও বসে নেই। তা-ই কারো কারো মতে দেশের ভেতরে বাইরে ইতিবাচক সব ঘটনা ম্লান করে দেবে। আইন শৃংখলা রক্ষার পাশাপাশি চাদাবাজি দিতে না পারলে সব কিছু উলটপালট করে দিতে পারে।