ঈদযাত্রায় বিড়ম্বনা এবং সুষম উন্নয়ন


সালেক সুফী , আপডেট করা হয়েছে : 03-06-2026

ঈদযাত্রায় বিড়ম্বনা এবং সুষম উন্নয়ন

ঢাকা থেকে বিস্তীর্ণ উত্তরাঞ্চল বৃহত্তর রাজশাহী, রংপুর আর বগুড়া অঞ্চলে ঈদযাত্রায় এবারেও বিড়ম্বনায় ভুগেছে অসংখ্য ঈদযাত্রী। রেল, সড়ক কোন পথেই যাত্রা নির্বিঘ্ন বা আরামদায়ক ছিলো না। লম্বা ছুটি স্বত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক যাত্রীর চাপে বৈধ যাত্রীরা অগ্রিম টিকেট কেটেও স্বস্তিতে রেখে গন্তব্যে যেতে পারেনি। ভিড়ে উপচে পড়া ট্রেনগুলোতে অনেককেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাদে যেতে দেখা গাছে। সড়ক পথে ঢাকা-রংপুর, ঢাকা রাজশাহীগামী যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অসহনীয় যানজটে বেহাল অবস্থায় পড়তে হয়েছে। ৭-৮ ঘণ্টার যাত্রায় সময় লেগেছে ২২-২৩ ঘণ্টা। ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর সড়কে বিপুল অর্থ বয়ে উড়াল সড়ক স্থাপিত হয়েছে, কিছু জায়গায় কাজ শেষ হবার পথে। 

যমুনা বহুমুখী সেতুর (চেক পয়েন্ট) সম্প্রসারিত হয়েছে, হাটিকুমরুল হাব উন্নয়ন হয়েছে। তথাপি মহাসড়ক ব্যবস্থাপনায় বিচ্যুতি, যান বাহন অপ্রতুলতা আর এক শ্রেণির অসাধু মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফা লাভের প্রবণতা যাত্রীদুর্ভোগের কারণ বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। যদি উত্তরবঙ্গ যাত্রার সঙ্গে দক্ষিণ বাংলায় ঈদযাত্রা তুলনা করা হয় দেখা যাবে ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, এমনকি সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এর মূল কারণ অবস্যই পদ্মা বহুমুখী সেতু এবং দক্ষিণবঙ্গ যাত্রায় জলযানে যাত্রার বাড়তি সুবিধা। 

এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র এখনো রাজধানী ঢাকায়। ভাগ্যের অন্নেষণে লাখো মানুষ থাকে ঢাকায়। ঈদ পার্বণে নাড়ির টানে ছুটে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বাংলাদেশের নগরায়নগুলো লাগসই পরিকল্পনার অধীনে সুসমন্বিত হয়নি। বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে সড়ক এবং রেল অবকাঠামো গড়ে তোলা হলেও যানবাহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং জন সচেতনার অভাব, দুর্নীতির কারণে কোন সরকারের পক্ষেই ঈদযাত্রায় স্বস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিত করে বাস্তবধর্মী ব্যবস্থা গ্রহণ।

এই যে অনেকে প্রেসিডেন্ট এরশাদ এবং শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার বলতে কৃতিত্ব মনে করে তাদের স্বীকার করতেই হবে দেশব্যাপী সড়কব্যবস্থা উন্নয়নে অধিকাংশ সফল প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, এ দুই সরকার প্রধানের দায়িত্ব সময়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সংগতি রেখে উন্নয়ন, শিল্পায়ন, নগরায়ণ দেশব্যাপী সম্প্রসারণ না হওয়ায় ঢাকায় মাইগ্রেশন হয়েছে ভীতিকর মাত্রায়। সর্বোচ্চ এক কোটি ধারণক্ষমতার ঢাকায় এখন আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করে। এর ফলে একদিকে যেমন অসহনীয় যানজট ঢাকার জীবনকে স্থবির করে রাখে অন্যদিকে ঢাকাকে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, সামান্য বৃষ্টিতে জলজটের কারণে বসবাসের জন্য দুনিয়ার অন্যতম শীর্ষ বাজে শহরে পরিণত করেছে। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে সরকারকে বিকেন্দ্রীকরণ করে সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষাকেন্দ্র, শিল্প-বাণিজ্যকেন্দ্র ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করে রিভার্স মাইগ্রেশনের ব্যবস্থা না করা হলে কোনোভাবেই ঈদযাত্রায় বিড়ম্বনার মতো অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলবে না। 

অন্যতম প্রধান সমাধান হতে পারে ঢাকার আশপাশ থেকে তৈরি পোশাক কারখানা, টেক্সটাইলসহ অন্যান্য শিল্পকারখানাগুলো পরিকল্পনা করে ঢাকার বাইরে স্থানান্তর। রেল সুবিধা সম্প্রসারণে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে রেল যোগাযোগে গতি আসেনি। এখানে দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতা আছে। সঠিক সহযোগী পরিকল্পনা করা হলে রেল সংযুক্ত পদ্মা বহুমুখী সেতু, যমুনা রেলসেতু হতে পারতো দেশব্যাপী অন্যতম প্রধান অবলম্বন। কিন্তু সেখানেও রেলবগি, ইঞ্জিনের অপ্রতুলতা সমস্যার সমাধানে কাক্সিক্ষত অবদান রাখতে পারছে না। পাশের দেশ ভারতেও রেল যোগাযোগ মূল ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ ছোট দেশ। ঢাকার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী শহরগুলো ফরিদপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিং, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর স্বল্প দূরত্বের। এ শহরগুলোতে যাতায়াতের জন্য দিনব্যাপী শাটল ট্রেন ব্যবস্থা থাকলে ঢাকার জনজট দূর করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।

আমি ঢাকায় বিডিআর সদর দফতর, ঢাকা কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় সচিবালয়, এমনকি ঢাকা সেনানিবাস থাকার যৌক্তিকতা দেখি না। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতে চিকিৎসাকেন্দ্র, শিক্ষাকেন্দ্র এবং শিল্পাঞ্চল স্থাপনের বিকল্প দেখি না। আজ থেকে ১৫-২০ বছরের জন্য পরিকল্পনা করে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা গৃহীত না হলে বাংলাদেশ কখনো উন্নত দেশ হতে পারবে বলে মনে হয় না। 

কেউ দীর্ঘ দিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা স্বল্প সময়ে দূর হবে এটি আশা করে না।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)