ইসলামবিদ্বেষী গ্রাফিতি ঘিরে মুসলিম কম্যুনিটিতে আতঙ্ক


দেশ রিপোর্ট , আপডেট করা হয়েছে : 28-05-2026

ইসলামবিদ্বেষী গ্রাফিতি ঘিরে মুসলিম কম্যুনিটিতে আতঙ্ক

সান ডিয়েগো মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ সেন্ট লুইস কাউন্টিতে ইসলামবিদ্বেষী গ্রাফিতি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছে মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে। স্থানীয় রাস্তাঘাট, কংক্রিট ব্লক ও দেওয়ালে মুসলিমবিরোধী ঘৃণামূলক বার্তা স্প্রে-পেইন্ট করার ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে সেন্ট লুইস কাউন্টি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই ধরনের ঘটনা শুধু ভাঙচুর নয়, বরং এটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয়ভীতি ও বিভাজনের পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা। 

পুলিশ জানায়, ২৩ মে সকাল প্রায় ৮টা ৫০ মিনিটে দক্ষিণ প্রিসিংকটের কর্মকর্তারা একটি অভিযোগ পেয়ে বেলেস অ্যাভিনিউয়ের ৩৬০০ ব্লকে যান। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা দেখতে পান দুটি কংক্রিট ব্লকে ইসলামবিরোধী অপমানজনক শব্দ ও ঘৃণামূলক বার্তা লেখা রয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বার্তাগুলো সরাসরি মুসলিম সম্প্রদায় ও অভিবাসীদের লক্ষ্য করে লেখা হয়েছিল। পরে একই এলাকায় লেমে ফেরি রোডের ৬০০ ব্লকের একটি ইটের দেওয়ালেও একই ধরনের বিদ্বেষমূলক লেখা পাওয়া যায়। কিছু বার্তা স্প্রে-পেইন্টের মাধ্যমে রাস্তার পাশে ও ফুটপাতের কাছেও লেখা হয়েছিল বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। 

পুলিশ বলেছে, ঘটনায় অন্য কোনো সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এবং কেউ আহতও হননি। তবে এ ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কারণ এটি ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বর্তমানে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি। তদন্তকারীরা আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছেন এবং এলাকাবাসীর কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ জনগণকে অনুরোধ করেছে, কেউ যদি সন্দেহজনক কোনো কার্যকলাপ দেখে থাকেন বা ঘটনার সময় তোলা ভিডিও ও ছবি থাকে, তাহলে তা তদন্তকারীদের হাতে তুলে দিতে। 

কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) এ ঘটনাকে স্পষ্ট ইসলামবিদ্বেষী হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে জানায়, মুসলিম ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক ভাষা এবং ভাঙচুর সমাজে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে এবং এটি শুধু একটি কমিউনিটিকে নয়, পুরো সমাজের নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির জন্য হুমকি। সংগঠনটির মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও হামলার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব জীবনের অপরাধকে উৎসাহিত করছে। কেয়ারের কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তারা মুসলিম কমিউনিটিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং যেকোনো ধরনের হুমকি বা হয়রানির ঘটনা রিপোর্ট করতে বলেছেন। 

স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের মধ্যে এই ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, তারা এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। এলাকায় বসবাসকারী এক মুসলিম অভিভাবক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আমার সন্তানরা প্রতিদিন স্কুলে যায়। দেওয়ালে এমন ঘৃণামূলক বার্তা দেখে তারা ভয় পেয়েছে। আমরা ভাবছি, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে কি না। আরেক বাসিন্দা বলেন, এটি শুধু দেওয়ালে লেখা কিছু শব্দ নয়। এটি আমাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো একটি ভয় দেখানোর বার্তা। অধিকারকর্মীদের মতে, এ ধরনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মিসৌরি এবং আশপাশের এলাকায় ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বেড়েছে। 

চলতি বছরের শুরুতে সেন্ট লুইস অঞ্চলের একটি চার্চে ইলেকট্রনিক সাইনবোর্ডে ইসলামকে ডিমনিক বা অশুভ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, যা পরে সমালোচনার মুখে সরিয়ে ফেলা হয়। সেই ঘটনাতেও মুসলিম সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। 

অধিকারকর্মীদের মতে, এ ধরনের প্রকাশ্য বিদ্বেষমূলক বার্তা সমাজে বিভাজন বাড়ায় এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। তারা মনে করছেন, ঘৃণামূলক অপরাধ প্রতিরোধে শুধু পুলিশি ব্যবস্থা নয়, সামাজিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুস্পষ্ট অবস্থানও জরুরি। মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের আইনে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। কোনো অপরাধ যদি ধর্ম, জাতিগত পরিচয় বা জাতীয়তার কারণে সংঘটিত হয়, তাহলে সেটিকে হেইট ক্রাইম হিসেবে গণ্য করা হতে পারে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়। 

এছাড়া ধর্মীয় উপাসনালয় বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি ভাঙচুরের ক্ষেত্রেও আলাদা আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। যদিও বর্তমান ঘটনায় মসজিদ বা ধর্মীয় স্থাপনা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, তবুও তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে সম্ভাব্য বিদ্বেষমূলক অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করছেন। পুলিশ জনগণকে সতর্ক করে বলেছে, সন্দেহভাজন কাউকে নিজেরা মোকাবিলা করার চেষ্টা না করতে। বরং যেকোনো তথ্য সরাসরি তদন্তকারীদের জানাতে বলা হয়েছে। তদন্তে সহায়তার জন্য একটি নন-ইমার্জেন্সি নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে। 

এদিকে বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংগঠন ও ধর্মীয় নেতারা কমিউনিটির মধ্যে সংহতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডের জবাব হতে হবে ঐক্য, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সম্মানের মাধ্যমে। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে মুসলিম কমিউনিটির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং দ্রুত দোষীদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। 

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষের ঘটনাও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ সেন্ট লুইস কাউন্টির এ ঘটনাটি তাই শুধু একটি ভাঙচুরের ঘটনা নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, সামাজিক সহাবস্থান এবং ঘৃণামূলক অপরাধ মোকাবিলার বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। 


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)