দরিদ্র কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হবে


বিশেষ প্রতিনিধি , আপডেট করা হয়েছে : 20-05-2026

দরিদ্র কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হবে

দরিদ্র ও প্রান্তিক পারিবারিক কৃষকদের সবাই যেন সরকার ঘোষিত “কৃষক কার্ড” পায় তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। পারিবারিক কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয়কৃত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে মূল্য-সমর্থন সহায়তা দেওয়ার জন্য বাজেটে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি শস্য ক্রয়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে, এবং এজন্য সারাদেশব্যাপী গুদাম ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে। রাজধানীর দি ডেইলি স্টার কার্যালয়ের আজিমুর রহমান হলে ১৮ মে সোমবার জাতীয় বাজেটে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায্য বরাদ্দ, অংশিদারিত্ব এবং বাস্তবায়ন ও মনিটরিং বিষয়ক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এই আহ্বান জানান। 

এএলআরডি উদ্যোগে আয়োজিত এই গোলটেবিলে আলোচনায় সিআরডি’র গবেষণা টীমের প্রধান গাজী সারওয়ার্দী জাতীয় বাজেট বিষয় সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে, যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের মতই, জাতীয় বাজেটের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তবে দারিদ্র বিমোচন, বৈষম্য হ্রাস এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে-জনগোষ্ঠী-এলাকা- নৃতাত্ত্বিক পরিচয়- লৈঙ্গিক পরিচয়-শ্রেণি কাঠামোর ভিত্তিতে বাজেটের পূর্ণ সম্ভাবনা ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা- সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে এই জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবেই নিষ্পেষিত, বঞ্চিত, ফলত দুর্বল। তাই তাদের পক্ষে সচেতন, সংবেদনশীল এবং উচ্চকণ্ঠ হওয়া নাগরিক সমাজের নৈতিক এবং উন্নয়ন-দায়িত্ব। তাই প্রান্তজনের বঞ্চনা-চাহিদা-অধিকারের নিরিখে এএলআরডি বিগত বছরগুলোতে বাজেট পর্যালোচনা করেছে, নাগরিক পরিসরে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হাজির করেছে এবং নীতি-নির্ধারকদের জন্য প্রামাণ্য সুপারিশ প্রদান করেছে। তারই ধারবাহিকতায় এবছরেও গত বছরের জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ ও ব্যয়ের উপরে পর্যালোচনা এবং তার উপর ভিত্তি করে আসন্ন ২০২৬-২০২৭ সালের অর্থ বছরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাজট রবাদ্দের সুপারিশ প্রণীত হয়েছে যা আজ জনসমুখে উপস্থান করা হয়েছে।

সংস্থাটির উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত গোলটেবিল আলোচনায় প্যানেল আলোচক হিসেবে অংশ নেন বিশিষ্ট সাংবাদিক আবু সাইদ খান ও সোহরাব হাসান। তাছাড়া তৃণমূলের প্রতিনিধি হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন রাজশাহী থেকে আফজাল হোসেন, সাতক্ষীরা থেকে কৃষ্ণপদ মুন্ডা, চট্টগ্রাম থেকে এসএম নাজের হোসেন, বরিশাল থেকে শামসুল ইসলাম দিপু এবং হাওর অঞ্চল থেকে সেলেহীন চৌধুরী শুভ প্রমুখ।

সমীক্ষাপত্র উপস্থাপনকালে গবেষক বলেন, এই সমীক্ষটি আমরা ৬টি যেমন- পারিবারিক কৃষি, গ্রামীণ নারী, আদিবাসী, যুব জনগোষ্ঠী, নগর দরিদ্র ও ভূমি-জলা-কৃষি সংস্কার ভাগে বিভক্ত করে গত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ এবং মাথাপিচু বরাদ্দ তুলে ধরে ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের বাজেট কোন উপখাতে কত হওয়া প্রয়োজন তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তিনি সমীক্ষাতে যে সকল সুপারিশ উঠে এসেছে তা বিভাগ অনুযায়ি তুলে ধরেন। এর মধ্যে নিম্নলিখিত সুপারিশ গুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে উপস্থিত সকলে মতপ্রকাশ করেছেন।

পারিবারিক কৃষির ক্ষেত্রে আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে ৬ কোটি ৩০ লক্ষ পারিবারিক কৃষকের জন্য ১ লক্ষ নয় হাজার ৭০৩ কোটি টাকা বরাদের কথা উল্লেখ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পারিবারিক কৃষকদের সবাই যেন সরকার ঘোষিত “কৃষক কার্ড” পায় তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে; পারিবারিক কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয়কৃত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে মূল্য-সমর্থন সহায়তা দেওয়ার জন্য বাজেটে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে; কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি শস্য ক্রয়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে, এবং এজন্য সারাদেশব্যাপী গুদাম ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে; খাসজমি পাওয়া পারিবারিক কৃষি-খানাগুলো যেন জমি ধরে রাখতে ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে, সেজন্য টেকসই কৃষিভিত্তিক জীবিকা উন্নয়নে বিশেষ বাজেটিয় বরাদ্দ প্রয়োজন।

গ্রামীণ নারীর ক্ষেত্রে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৬ কোটির ওপর গ্রামীণ নারীর জন্য কমপক্ষে ১ লক্ষ ৪ হাজার ৪৫১ কোটি টাকার বরাদ্দ চাই। দরিদ্র ও প্রান্তিক গ্রামীণ নারীদের সকলেই যেন “ফ্যামিলি কার্ড” পায় তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে; গ্রামীণ নারী কৃষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেটে পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, কৃষি বীমার জন্য বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে; গ্রামীণ ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং ই-কমার্স ও ডিজিটাল মার্কেটিং সহায়তার জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে; বিধবা, পরিতাক্ত ও নারীপ্রধান খানার সদস্যদের আইনি সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গঠনে বাজেট বরাদ্দ করতে হবে; নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে সুরক্ষা কেন্দ্র ও মনোসামাজিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখতে হবে।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৫২ লক্ষের ওপর আদিবাসী মানুষের জন্য কমপক্ষে ৯ হাজার ১১৫ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখতে হবে। সেই সাথে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট, হালনাগাদ ও গোষ্ঠীভিত্তিক পরিসংখ্যান প্রস্তুতের জন্য বিশেষ আদিবাসি জনশুমারি পরিচালনার জন্য বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে; সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন ও তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে পাঁচ বছর মেয়াদি বাজেট থাকতে হবে; পার্বত্য এলাকার ইচ্ছুক সেটেলার বাঙ্গালীদের সমতলে পুনর্বাসন উদ্যোগের জন্য নুনতম ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হবে।

যুবজনোগোষ্ঠীর জন্য আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের এক-পঞ্চমাংস যুব জনগোষ্ঠীর জন্য কমপক্ষে ৬১ হাজার ৮০৫ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখতে হবে। তাছাড়া মানবসম্পদ উন্নয়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, জীবনদক্ষতা উন্নয়ন, কর্মমুখী শিক্ষা, ডিজিটাল সক্ষমতা ও ই-কমার্স, মানসিক স্বাস্থ্য-সুরক্ষা, ইংরেজিসহ অন্য ভাষা শিক্ষা এবং সুরক্ষিত অভিবাসন- এই খাতগুলোকে অগ্রাধিকার প্রদান করে যুব জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেট বরাদ্দ বিন্যাস করতে হবে; উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে আগ্রহী যুবদের সহযোগিতার লক্ষে (উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ঋণপ্রাপ্তি, বাজার সংযোগ,ব্যবসায়ীক রেজিস্ট্রেশান সহায়তা ইত্যাদি) বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ দিতে হবে।

নগরদরিদ্রদের জন্য আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের এক কোটি ৩৩ লক্ষের বেশি নগর দরিদ্রের জন্য কমপক্ষে ২৩ হাজার ১৭৭ কোটি টাকার বরাদ্দ চাই। নগরের অকৃষি খাসজমি ব্যবহার করে নগর দরিদ্রদের আবাসন সমস্যা দূরীকরণ ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দিতে হবে; নগর দরিদ্রদের জন্য স্বল্পসুদের গৃহঋণ তহবিল/প্রকল্প চালু করতে বাজেট দিতে হবে; নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সৃজন ও বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে।

ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রে আলাদা করে বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়। এক্ষেত্রে আসন্ন আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশের প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ভূমি সংস্কার-সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য কমপক্ষে ২ লক্ষ ১৬ হাজার ৩১৮ কোটি টাকার বরাদ্দ চাই। সেই সাখে একটি স্থায়ী জাতীয় ভূমি ও কৃষি সংস্কার এবং পরিবেশ সুরক্ষা কমিশন গঠনের জন্য বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে; ভূমি সংস্কার, জলাশয় রক্ষা ও কৃষি ন্যায্যতার বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি কার্যকর মনিটরিং এবং অডিট সেল গঠন করতে হবে, সেল পরিচালনার জন্য বাজেটে আলাদা বরাদ্দ থাকতে হবে; এবং সরকারি খাসজমি ও জলাশয় সিএস (ঈঝ) রেকর্ড অনুযায়ী সঠিকভাবে উদ্ধার ও সংরক্ষণ করার জন্য বাজেটে বরাদ্দ দিতে হবে। বলা হচ্ছে ভূমি-কৃষি-জলার সংস্কার না হলে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোগ্যের পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, রাষ্ট্রের সিংহভাগ মানুষ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কিন্ত তাদের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য হারে নেই। অন্যদিকে সবার কাছ থেকে অর্থ আয় করা হলেও সবার জন্য ব্যয় করা হয় না। সুতরাং বাজেট যতটুকু হোকনা কেন তা ন্যায্যতার ভিত্তিতে বন্টন করতে হবে।

অন্যদিকে আর এক সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণকেন্দ্রি হতে হবে। উন্নয়নের মুল ভিত্তি হলো প্রকল্প। যার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ কিন্তু বাস্তবিক অর্থে প্রকল্পের জন্য মানুষ। তৃণমূলের মানুষের অর্থই রাষ্ট্রের অর্থ। ফলে বাজেট বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রিকরন করা প্রয়োজন। সংসদের সদস্যরা প্রান্তিকের বা অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করবেন তাহলেই বাজেটের ন্যায্যতা ফিরেবে। বর্তমান সরকার কৃষি নিয়ে অনেক কথা বলছেন কিন্ত কূমিও কৃষি সংস্কার না করলে বাজট বরাদ্দ ফলপ্রসু হবে না।


প্রকাশক: মঞ্জুর হোসেন

সম্পাদক: মিজানুর রহমান

House : 29, Road : 01 Sector : 02, Block :F Aftabnagar, Dhaka:1212 (Opposite China Building) E-mail : deshusdhaka@gmail.com (Advertising & News For Bangladesh)