জ্বালানি খাতে কৌশলগত সহযোগিতার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চুক্তি স্বাক্ষরের পর এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে কয়েক মাস আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুদেশের মধ্যে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি কিনতে বাংলাদেশ সম্মত হওয়ার পরে এখন আবার নতুন করে জ্বালানি খাতের সমঝোতা কেন এ নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
এমওইউ স্বাক্ষরের পর ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে ‘জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করা’ এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘বৃহত্তর জ্বালানি সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের’ বিষয়টি উঠে এসেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, এ সমঝোতা স্মারকের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে এলপিজি ও এলএনজির জন্য যুক্তরাষ্ট্র বড় একটি বিকল্প উৎস হতে পারে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বার্থে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আরো অনেক দেশের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা আছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও হলো। এটি দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুদেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষর হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর কর্মকাণ্ড আরো বিস্তৃত হবে এবং বাংলাদেশের জন্যও জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস তৈরি হবে, যা সংকটকালে জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা কমিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর, বিশেষ করে কাতার ও সৌদি আরবের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হলেও এবার ইরান যুদ্ধের পর তারা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে তেল ও এলএনজি সরবরাহ করেনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক তামিম বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ ও আমদানির আরো একটি জায়গা তৈরি হওয়া বাংলাদেশের জন্য ভালো। তিনি বলেন, এখন আমাদের প্রয়োজন হলো আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে পারবো। তবে চুক্তি বা সমঝোতার নামে বাংলাদেশকে যদি জ্বালানি কিনতে বাধ্য করা হয়, সেটি দেশের জন্য ভালো হবে না। সমঝোতার বিস্তারিত প্রকাশ হলেই কেবল এসব বিষয়ে বোঝা যাবে।
সমঝোতায় কী আছে?
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ওয়াশিংটনে স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার ওই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়। স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জ্বালানি পাওয়ার উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের যে প্রচেষ্টা বাংলাদেশের রয়েছে, তাতে ভূমিকা রাখবে এ সমঝোতা স্মারক। বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, সাশ্রয়ী মূল্য ও টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি এটা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বৃহত্তর জ্বালানি সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করবে। এতে আরো জানানো হয় যে, এ সমঝোতার আওতায় দুই দেশের মধ্যে তেল, গ্যাস, ভূতাপীয় ও জৈবশক্তি বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্ঞান ও দক্ষতাবিনিময় এবং গবেষণা সহজ হবে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে এলএনজি, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য বাংলাদেশের আমদানির ক্ষেত্রে এটা সহায়ক হবে।
এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিকল্প উৎস থাকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একক উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অধ্যাপক ম তামিম অবশ্য বলছেন, সমঝোতার বিস্তারিত সরকার প্রকাশ করলে তাতে জানা যাবে কোন কোন খাতে কী ধরনের সহযোগিতার অঙ্গীকার এতে করা হয়েছে। তিনি বলেন, আপাতদৃষ্টিতে জ্বালানি পাওয়ার উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশকে জ্বালানি আমদানি করতে হয়। সে কারণে যত বেশি উৎস থাকবে ততই ভালো। আমদানির বিকল্প জায়গা থাকাটা আমাদের জন্য ভালো, যাতে করে প্রয়োজন হলে আমরা সেখান থেকেও আমদানি করতে পারি।
চুক্তির পরেও সমঝোতা কেন
চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করে অনেকের সমালোচনা মুখে পড়েছিল, সেই চুক্তিতে আগামী ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনার কথা বলা আছে। এছাড়াও বাংলাদেশের গ্যাস খাতে মার্কিন কোম্পানির আগে থেকেই আধিপত্য রয়েছে। পাশাপাশি গভীর সমুদ্রের সবগুলো ব্লকেই তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে মার্কিন কয়েকটি কোম্পানি।
যদিও গভীর সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় স্থবির হয়ে আছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা গভীর সমুদ্রের ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রের ১১টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসির একজন কর্মকর্তা জানান, চলতি বছর এপ্রিলে যে পরিমাণ এলপিজি আমদানি করেছে বাংলাদেশ, তার ৪০ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানির চুক্তি করেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় ওই চুক্তি করতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছিল বলেও আলোচনা আছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে।
জ্বালানি বিষয়ক সাময়িকী এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রই বড় খেলোয়াড় এবং সামনে তারা নিজেদের অবস্থান আরো সংহত করতে চাইছে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ যে গ্যাসফিল্ডগুলো থেকে গ্যাস আহরণ করে তার ৪০ ভাগই মার্কিন কোম্পানি শেভরন পরিচালনা করে। এলএনজির একটি টার্মিনাল পরিচালনা করছে একটি মার্কিন কোম্পানি। আমেরিকান আরেকটি কোম্পানি গভীর সাগরে সবগুলো ব্লকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কাজের প্রস্তাব দিয়েছে। এলপিজি সরবরাহে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।